— মোঃ কামাল উদ্দিনঃ
৭ই জুন ১৯৬৬—বাংলা জাতির ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণের দিন। এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচি, যা ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শোষিত জনগণের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির স্পষ্ট রূপরেখা। এ দাবি ছিল শুধু একটি দল বা নেতা নয়—একটি জাতির আত্মপরিচয়ের আহ্বান। পরবর্তীতে এ ছয় দফাই হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের বীজতলা।
চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি মাঠে, এই একই দিনে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ছয় দফা প্রথম জনসমক্ষে উপস্থাপন করেন এক অকুতোভয় সংগ্রামী নেতা, এম. এ. আজিজ। এই মঞ্চ থেকেই বাংলার মুক্তির বাণী ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। এ ইতিহাস শুধু গৌরব নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে শিক্ষা ও প্রেরণার উৎস।
২০১৭ সালের ৭ই জুন, আমি এক নিবন্ধের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রস্তাব করেছিলাম—এই লালদীঘির মাঠেই একটি স্থায়ী ‘ছয় দফা চেতনার মঞ্চ’ গড়ে তোলা হোক, যা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও এম. এ. আজিজের নামে উৎসর্গ করা হবে। ছয় দফা যে মাটিতে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে উচ্চারিত হয়েছিল, সেই মাটিতেই ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি হয়ে একটি মঞ্চ নির্মাণ—এ যেন ইতিহাসের ঋণ শোধ করার সামান্য প্রচেষ্টা।
আমার এই আহ্বানের প্রেক্ষিতে ২০১৯ সালের দিকে লালদীঘি মাঠের উন্নয়ন কাজ শুরু হয়। আজকের লালদীঘি শুধু একটি মাঠ নয়, এটি ইতিহাসের নিঃশব্দ সাক্ষী। এটি এখন এমন এক পরিসর, যেখানে তরুণ প্রজন্ম হাঁটতে হাঁটতে ইতিহাসকে অনুভব করতে পারে, শুনতে পারে পূর্বপুরুষদের সংগ্রামের প্রতিধ্বনি।
আমার প্রস্তাব ছিল—এই ময়দানে ছয় দফার প্রতিটি দফা, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির মূলভাব, এম. এ. আজিজের আপসহীন নেতৃত্ব এবং ৭ই জুনের প্রেক্ষাপটকে স্থায়ীভাবে চিত্রায়িত করা হোক। এটি কেবল একটি স্থাপনা হবে না, হবে জাতির আত্মপরিচয়ের এক জীবন্ত প্রতীক। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এখানে এসে জানবে—স্বাধীনতা কেবল উপহার নয়, এটি সংগ্রামের ফসল।
ছয় দফা ছিল বাঙালির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির দাবি। এই দফাগুলোর মাধ্যমেই পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয় আত্মনিয়ন্ত্রণের স্বপ্ন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ছয় দফাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব প্রস্তুতি—যা একটি জাতিকে স্বাধীনতার দিকে ধাবিত করেছিল।
আজ যখন বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে উন্নয়নের পথে, তখন অতীতের শিকড় আরও দৃঢ়ভাবে ধরার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ সরকার যাবে, সরকার আসবে—কিন্তু ইতিহাস তার নিজস্ব সত্য নিয়ে টিকে থাকবে। সেই সত্য সংরক্ষণের দায়িত্ব আমাদের সবার। আমরা যদি ইতিহাসকে যথাযথ সম্মান না দিই, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কীভাবে শিখবে নিজেদের আত্মপরিচয়?
তাই আমার বিশ্বাস—চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে বঙ্গবন্ধু ও এম. এ. আজিজের নামে একটি স্থায়ী ‘ছয় দফা চেতনার মঞ্চ’ গড়ে তোলা আজ সময়ের দাবি। এটি শুধু একটি শহরের জন্য নয়, বরং সমগ্র জাতির জন্য এক গর্বের নিদর্শন হয়ে থাকবে।
এই মঞ্চ হোক ইতিহাস জানার পাঠশালা, রাজনৈতিক চেতনার আলোচিত্র, ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য এক স্পর্শযোগ্য উত্তরাধিকার।