শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে হামলা ও গ্রেফতার : শহীদ রঈস উদ্দিন হত্যার বিচার দাবিতে ছাত্রসেনার জোরালো হুঁশিয়ারিসুফীবাদী নেতাকর্মীদের রক্তাক্ত কর্মসূচি, হেলমেটধারীদের রহস্যজনক তাণ্ডব, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

4 Min Read

মোহাম্মদ ইব্রাহিমঃ
চট্টগ্রাম, ৫ মে ২০২৫:
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনা, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের যৌথ ডাকে কেন্দ্রীয় সাবেক নেতা মাওলানা রঈস উদ্দিন কাদরীর নির্মম হত্যার প্রতিবাদে আজ দেশব্যাপী আয়োজিত শান্তিপূর্ণ অবরোধ কর্মসূচি এক রক্তাক্ত ঘটনায় রূপ নেয়। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচিতে পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও অজ্ঞাত হেলমেটধারী সশস্ত্র গোষ্ঠীর আক্রমণে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন এবং অন্তত ৩২ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নারায়ণগঞ্জ, রায়পুরা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে সমন্বিতভাবে পালিত হয় এই কর্মসূচি। ভিডিও লাইভে সম্প্রচারিত কর্মসূচির শান্তিপূর্ণ অবস্থান ও মাইকবিহীন মানববন্ধনের দৃশ্যপটের মধ্যেই আচমকা আক্রমণ শুরু হয়। বিশেষ করে চট্টগ্রামের মুরাদপুর এলাকায় পুলিশ ও হেলমেটধারী একটি সংঘবদ্ধ বাহিনীর সম্মিলিত হামলা এই আন্দোলনকে সংঘাতময় করে তোলে।
পুলিশি অভিযান ও গ্রেফতার:
চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় ১৪ জন, চান্দগাঁও থানায় ১৩ জনসহ মোট ২৭ জন নেতাকর্মীকে পুলিশ আটক করে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আটক করা হয় আরও ৫ জনকে। রায়পুরার কর্মসূচির পরে নিখোঁজ হন ছাত্রসেনার কর্মী ইব্রাহীম আশেকী। পরিবার ও সহকর্মীরা এখনো তার কোনো সন্ধান পাননি, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
ছাত্রসেনার দাবি ও প্রতিক্রিয়া:
প্রেস ব্রিফিংয়ে ছাত্রসেনার কেন্দ্রীয় ও জেলা নেতারা জানান, “আমরা সুফীবাদে বিশ্বাসী। কোনো ধরনের জ্বালাও-পোড়াও, যানবাহন ভাঙচুর বা উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আমাদের আদর্শ সাংঘর্ষিক।” তারা আরও জানান, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির সকল মুহূর্ত ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। এই ভিডিও প্রমাণ সত্ত্বেও হামলা ও গণগ্রেফতার গণতান্ত্রিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন বলেও দাবি করেন তারা।
নেতারা প্রশ্ন তুলেছেন— “হেলমেটধারী মুখোশপরা সেই দুর্বৃত্তেরা কারা? তারা কাদের আশ্রয়ে পুলিশের সামনে হামলা চালালো? তাদের উদ্দেশ্য কী? আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কি কেবল দর্শকের ভূমিকায় থাকবে?”
রঈস উদ্দিন কাদরীর হত্যাকাণ্ড:
ছাত্রসেনার ভাষ্য অনুযায়ী, পুবাইল মসজিদের সম্মানিত ইমাম মাওলানা রঈস উদ্দিন কাদরীকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগে জনতার হাতে তুলে দিয়ে পরিকল্পিতভাবে বর্বর নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়। ভিডিও ফুটেজে তার প্রাণভিক্ষার আবেদন, রক্তাক্ত অবস্থা ও জনতার হিংস্র উল্লাস মানবাধিকারের ঘোরতর লঙ্ঘন হিসেবেই চিহ্নিত হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত অপরাধীরা এখনো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকায় নেতারা প্রশাসনের সদিচ্ছা নিয়ে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
প্রশাসনের সঙ্গে সংলাপ ও পরবর্তী কর্মসূচি:
ছাত্রসেনার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আজ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং গ্রেফতার নেতাকর্মীদের মুক্তির আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এ আশ্বাস বাস্তবায়িত না হলে আন্দোলনের তীব্রতা আরও বাড়ানো হবে।
৬ মে ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি জেলায় কালো পতাকা মিছিল কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দাবি আদায় না হলে সারা দেশে একযোগে ধর্মীয় সমাবেশ, মসজিদভিত্তিক মানববন্ধন এবং সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।
ছাত্রসেনার চার দফা দাবি:
১. শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে গ্রেফতারকৃত নিরপরাধ নেতাকর্মীদের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি
২. শহীদ মাওলানা রঈস উদ্দিন কাদরীর হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচারের আওতায় আনা
৩. হেলমেটধারী ও মুখোশপরা হামলাকারীদের সনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান
৪. সুফীবাদী নেতৃবৃন্দ আলহাজ্ব সুফী মুহাম্মদ মিজান ও আল্লামা হুসামুদ্দিন চৌধুরী ফুলতুলী সাহেবের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত ষড়যন্ত্রমূলক মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার
উপসংহার:
এ ঘটনা কেবল একটি সংগঠনের আন্দোলনের দমন নয়—এটি নাগরিকের মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সাংবিধানিক অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত। হেলমেটধারীদের উপস্থিতি ও পুলিশের মদদ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে জনমনে। নিরপরাধের ওপর হামলা চালিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার এই প্রবণতা যদি চলতেই থাকে, তবে তা শুধু একটি দলের নয়—গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্যই বড় হুমকি হয়ে উঠবে।

Share This Article
Leave a Comment