নদী ডাকাতির রাজপুত্র, চোলাই মদের সম্রাট, অবৈধ অস্ত্রের ভাণ্ডারী: বোয়ালখালীর ভয়ঙ্কর ওয়াসীমঃ বিশেষ প্রতিবেদকঃ

4 Min Read

বোয়ালখালীর নাম শুনলেই আজ অনেকে প্রথমেই যে নামটি স্মরণ করেন, তা হলো—ওয়াসীম। তবে কোনো সম্মান কিংবা গৌরবের জন্য নয়—একজন চিহ্নিত নদী ডাকাত, চোলাই মদের সম্রাট এবং অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের রক্তাক্ত ফেরিওয়ালার জন্য।
ওয়াসীমের যাত্রা শুরু হয়েছিল নোংরা জলপথে—কর্ণফুলী নদীতে ডাকাতি করে। ১৯৯৭ সালে কর্ণফুলীর বুক চিরে বয়ে যাওয়া সেই ভয়াল রাতের কথা আজো অনেকে ভুলতে পারেনি। সেদিন পুলিশ যখন জলদস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়, ওয়াসীম জীবন বাঁচাতে কাধুরখীলের দিকে পালিয়ে যায়। ভাগ্যক্রমে জনতার হাতে পড়ে গণপিটুনির শিকার হয়, মাথা ফেটে যায়। পুলিশ যদিও তাকে ধরতে ব্যর্থ হয়, উদ্ধার করে তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র—যার একাংশ আজও তার অপরাধ সাম্রাজ্যের প্রাণশক্তি হয়ে আছে।
চোলাই মদের রাজনীতিতেও ওয়াসীমের উত্থান কম রক্তাক্ত নয়। রাঙ্গুনিয়ার সিরিয়া ফরেস্ট ঘাট থেকে সংগ্রহ করে সে যেভাবে মদের এক সুবিস্তৃত সরবরাহ লাইন গড়ে তুলেছে, তা যেন পুরো বোয়ালখালীকে একটি বিষাক্ত নেশার গর্তে পরিণত করেছে। বড়খোলার চাকমাপাড়ায় স্থায়ী মদ তৈরির কারখানা চালিয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন, প্রশাসনের চোখের সামনে, যেন সরকারি অনুমোদিত কোনো ‘মদ শিল্প’!
শুধু চোলাই মদেই থেমে থাকেনি ওয়াসীম। কর্ণফুলী নদীতে তার সশস্ত্র বাহিনী ‘ডিউটি’ দেয় নির্দিষ্ট চোলাই বোট পাহারা দিতে। নির্ধারিত বোট ছাড়া যদি কেউ নদী পথে মদ আনে, তারা চেপে ধরে অস্ত্র ঠেকিয়ে চাঁদা আদায় করে। মদবাহী নৌকাগুলো যেন ওয়াসীমের ব্যক্তিগত ট্যাক্সি—কেউ বিনা টোল দিলে রক্ষা নেই।
অস্ত্রের প্রতি তার টান যেন কোনো মধ্যযুগীয় দস্যুর গল্পকেও হার মানায়। আগ্নেয়াস্ত্র তার কাছে শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অস্ত্র নয়, বরং আয়ের উৎস। পলাতক সন্ত্রাসী সাদ্দাম মেম্বার ও রিংকুর মতো কুখ্যাতদের কাছে সে অস্ত্র ভাড়া দেয়। তার জেঠা মোনাফ চেয়ারম্যানের পুরনো নির্বাচনী অস্ত্রগুলোও এখন ওয়াসীমের গোপন ভাণ্ডারে সংরক্ষিত। একেকটি অস্ত্র যেন একেকটি রক্তাক্ত ইতিহাসের নীরব সাক্ষী।
এই অপরাধ সাম্রাজ্যের জাল এতটাই বিস্তৃত যে সাহেরের ছেলে, জামাল, বাট্টো নুরুল আলম, ইসমাইল ও আলমগীরের মতো চোলাই সরবরাহকারীরা নিয়মিত মদ পাঠায় ওয়াসীমের আদেশে। পরে সেগুলো পৌঁছে যায় শহরের অলিগলি—শিখল বাহা, জাহাঙ্গীর চেয়ারম্যানের অঞ্চল পেরিয়ে সূর্য আলী আর মুছার বাবার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে চট্টগ্রাম শহর জুড়ে। বোয়ালখালীর চায়ের দোকান থেকে শুরু করে নদীঘাট—সবখানে ওয়াসীমের মদের ‘শিকড়’।
তবু প্রশাসন যেন দেখেও অন্ধ। পূর্বে ওসি রাজ্জাক এবং এসআই সাইফুল সাহস দেখিয়ে অভিযান চালানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় ওয়াসীম অক্ষত থাকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্লজ্জ নিষ্ক্রিয়তা আজ তাকে এক অবিনাশী অপরাধ সাম্রাজ্যের সম্রাটে পরিণত করেছে।
ওয়াসীম এখন বোয়ালখালীর অলিখিত রাজা। যেখানে অস্ত্রের ঝনঝনানি ছাড়া অন্য কোনো সুর শোনা যায় না। তার চোলাই মদের ঘ্রাণ বাতাসের সাথে মিশে গেছে। মদের নেশা আর অস্ত্রের শব্দে বোয়ালখালী আজ বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। উঠতি ছেলেরা এখন স্বপ্ন দেখে—ওয়াসীমের মতো হতে, অস্ত্র হাতে টোল তুলতে, নেশায় মাতাল সাম্রাজ্য গড়তে।
কিন্তু বোয়ালখালীর এই ভয়ঙ্কর বাস্তবতা নিয়ে যদি এখনই প্রশাসন কঠোর না হয়, যদি ওয়াসীমের অস্ত্রভাণ্ডার গুড়িয়ে না দেওয়া হয়, তাহলে চট্টগ্রামের বিশাল একটি অঞ্চল অপরাধ, চোলাই আর রক্তের স্রোতে ডুবে যাবে।
প্রতিবেদকের মন্তব্যঃ
ওয়াসীম—নামের আড়ালে লুকানো এক ভয়ঙ্কর বিকৃত প্রতিভা। মানুষ নয়, যেন নদী ডাকাতির এক জীবন্ত মূর্তি, যার অস্ত্রের ঝনঝনানি আর চোলাই মদের নেশা যেন গোটা বোয়ালখালীকে গ্রাস করে নিচ্ছে। সে হাঁটে ধুলোর উপর, কিন্তু তার পেছনে ছড়িয়ে পড়ে অপরাধের ধোঁয়া, রক্তের গন্ধ, আর ভয়ার্ত কান্না। ওয়াসীম—একটি নাম নয়, এক ভয়ঙ্কর ট্র্যাজেডি, যার ছায়া থেকে বোয়ালখালী কখনো মুক্তি পাবে কিনা, তা এখন সময়ের হাতে।

Share This Article
Leave a Comment