
অরূপ চন্দ, চট্টগ্রাম :
চট্টগ্রামের দেওয়ানহাটের ঐতিহ্যবাহী শ্রীশ্রী দেওয়ানেশ্বরী সার্বজনীন কালী মন্দির, দেওয়ানেশ্বরী কালীবাড়ি নামে পরিচিত এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের সনাতন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। কালীপূজা, শ্যামাপূজা, দীপাবলি ও বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজনে প্রতিবছর এখানে ভক্তদের সমাগম ঘটে। কিন্তু সেই ঐতিহ্যবাহী মন্দিরের পরিচালনা, কমিটি গঠন, দান অনুদান, মূল্যবান স্বর্ণালংকার এবং আয় ব্যয়ের হিসাব নিয়ে বর্তমানে উঠেছে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন। স্থানীয় সনাতনী ভক্তদের একাংশের অভিযোগ, মন্দিরের গঠনতন্ত্র যথাযথভাবে অনুসরণ না করে পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ভক্তদের দান করা প্রায় ২০ ভরি স্বর্ণালংকারের হিসাব ও বর্তমান অবস্থান নিয়েও স্বচ্ছতা নেই বলে অভিযোগ তাদের। উন্নয়ন ও অন্যান্য কার্যক্রমের নামে অর্থ সংগ্রহের রসিদ বই ও হিসাব নিকাশ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
অভিযোগকারীদের কেউ কেউ বিপুল অর্থের অনিয়মের আশঙ্কার কথাও বলছেন। তবে এসব অভিযোগের কোনোটিকেই তদন্ত ছাড়া চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না। তাই স্থানীয়দের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্ত, হিসাব নিরীক্ষা এবং নথিপত্র জনসমক্ষে প্রকাশের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা হোক। ২০ ভরি স্বর্ণের হিসাবের খাতা কোথায়? অভিযোগের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় মন্দিরের স্বর্ণালংকার। স্থানীয় ভক্তদের দাবি, দীর্ঘদিনে মন্দিরে ভক্তদের পক্ষ থেকে প্রায় ২০ ভরি স্বর্ণালংকার দান করা হয়েছে। কিন্তু এসব স্বর্ণের পূর্ণাঙ্গ তালিকা, ওজন, দাতার তথ্য, সংরক্ষণস্থল, ব্যবহারের ইতিহাস এবং বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে সাধারণ ভক্তদের সামনে পরিষ্কার কোনো হিসাব উপস্থাপন করা হয়নি বলে অভিযোগ। বিষয়টি নিয়ে মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি ধীরেন্দ্র দাস গুপ্তের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছাড়া মন্দিরের স্বর্ণালংকার দেখাতে পারবেন না।
জবাবদিহির বিষয়ে তার বক্তব্যের সারমর্ম ছিল, পরিচালনা কমিটিই বিষয়টি দেখভাল করে এবং কাউকে কৈফিয়ত দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এই বক্তব্যের সত্যতা ও পূর্ণ প্রেক্ষাপট অবশ্যই সংশ্লিষ্ট নথি ও মন্দিরের গঠনতন্ত্রের আলোকে যাচাই করা প্রয়োজন।
তবে এমন বক্তব্যের পর স্থানীয় ভক্তদের মধ্যে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। সার্বজনীন মন্দিরের মূল্যবান সম্পদের হিসাব কি শুধু পরিচালনা কমিটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? সাধারণ সম্পাদক বললেন, এ ব্যাপারে আমি কিছু জানি না, মন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অমল কর্মকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না এবং সভাপতির সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। মন্দিরের গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবান সম্পদ সম্পর্কে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্যে যে ধরনের অস্পষ্টতা দেখা যাচ্ছে, তা স্থানীয় ভক্তদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
তবে এ বিষয়ে মন্দিরের লিখিত হিসাব, সম্পদ নিবন্ধন ও কমিটির সভার কার্যবিবরণী পর্যালোচনা করা গেলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। ‘এগুলো আমাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার’ সহ সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য মন্দির পরিচালনা কমিটির সহ সাধারণ সম্পাদক বিষ্ণুদে অভির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের এসব বিষয় নিয়ে মাথা না ঘামানোর কথা বলেন।
তিনি বিষয়গুলোকে তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার হিসেবেও উল্লেখ করেন। এ বক্তব্যকে ঘিরেও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, সার্বজনীন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ভক্তদের দান করা সম্পদ, অনুদান ও অর্থ ব্যবস্থাপনা কতটা ব্যক্তিগত বিষয়, এ প্রশ্নের উত্তর গঠনতন্ত্র, প্রচলিত আইন এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হওয়া উচিত।
গঠনতন্ত্রে ৩৫, কমিটি ৪১ কেন? মন্দির পরিচালনার কাঠামো নিয়েও উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ।
স্থানীয় ভক্তদের দাবি, ২০১৯ সালে সংশোধিত গঠনতন্ত্র অনুসরণ না করেই বর্তমান কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তাদের অভিযোগ, গঠনতন্ত্রের একাধিক মৌলিক ধারা লঙ্ঘিত হয়েছে। এর মধ্যে তারা উল্লেখ করেছেন ধারা ৬ গ, ১১ ক, ১২ চ, ১৭ জ, ২৫ খ, ২৬ ঙ, ২৭ গ, ২৮ ছ এর দ্বিতীয় অংশ, ২৯ গ, ৩১ খ এবং ৩৩ ক ও খ।
বিশেষ করে ধারা ১১ ক এর কার্যনির্বাহী কমিটির কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা। অভিযোগ অনুযায়ী, গঠনতন্ত্রে কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য সংখ্যা ৩৫ জন থাকার কথা থাকলেও বর্তমান কমিটি করা হয়েছে ৪১ সদস্যের। প্রশ্ন উঠেছে, গঠনতন্ত্রে পরিবর্তন আনা হলে তা কীভাবে এবং কখন করা হয়েছে? সাধারণ সভায় তা অনুমোদিত হয়েছে কি না? ৪১ সদস্যের কমিটির বৈধতার ভিত্তি কী? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে গঠনতন্ত্র, সাধারণ সভার কার্যবিবরণী, অনুমোদনপত্র এবং কমিটি গঠনের সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ভক্তরা।
ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দে ভক্তদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, মন্দিরের দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও সম্মানিত ভক্তদের যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করে ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের ভিত্তিতে কমিটি গঠনের চেষ্টা করা হয়েছে। তাদের দাবি, এর ফলে মন্দির পরিচালনায় দীর্ঘদিনের পারস্পরিক আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ভক্তসমাজের মধ্যে বিভাজন তৈরি হয়েছে। তবে এ অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কারা বাদ পড়েছেন, কী প্রক্রিয়ায় কমিটি গঠিত হয়েছে এবং গঠনতন্ত্রে কী বলা আছে, এসব নথি বিশ্লেষণ করলেই প্রকৃত সত্য সামনে আসবে।
রসিদ বই, দান চাঁদা ও অর্থের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন
মন্দিরের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে নানা অভিযোগ। স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, উন্নয়ন ও অন্যান্য কার্যক্রমের নামে অর্থ সংগ্রহ করা হলেও সব অর্থের যথাযথ হিসাব প্রকাশ করা হয়নি। রসিদ বইয়ের ব্যবহার, সংরক্ষণ ও হিসাব মেলানো নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
কেউ কেউ কোটি টাকা পর্যন্ত আর্থিক অনিয়মের আশঙ্কার কথা বললেও এ মুহূর্তে এমন অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত প্রমাণ প্রকাশ্যে নেই।
তাই প্রকৃত সত্য জানতে প্রয়োজন রসিদ বই পরীক্ষা, ব্যাংক হিসাব যাচাই, নগদ লেনদেনের বিবরণ, ব্যয়ের ভাউচার, দাতা তালিকা, উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় এবং পূর্ববর্তী অডিট রিপোর্ট পর্যালোচনা। এসব নথির স্বাধীন অডিট হলে অর্থ ব্যবস্থাপনায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা অনেকটাই পরিষ্কার হতে পারে। মন্দির দখলে কিশোর গ্যাং ব্যবহারের অভিযোগ তদন্ত চায় স্থানীয়রা
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগগুলোর একটি হলো, মন্দিরের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে কিশোরদের ব্যবহার করার চেষ্টা। স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব ও বিভিন্ন অনিয়ম আড়াল করার উদ্দেশ্যে মন্দিরকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাববলয় তৈরি এবং কিশোর গ্যাং ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়েছিল।তবে এ অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর হওয়ায় প্রমাণ ছাড়া কাউকে দায়ী করা সমীচীন নয়।
স্থানীয়দের দাবি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি তদন্ত করে দেখুক। মন্দিরকে কেন্দ্র করে কোনো সংঘবদ্ধ তরুণ বা কিশোর গোষ্ঠী ব্যবহার করা হয়েছে কি না, কারা তাদের পেছনে রয়েছে এবং কোনো দখল বা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসুক। সার্বজনীন মন্দির কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়
স্থানীয় সনাতনী সম্প্রদায়ের বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট।
দেওয়ানেশ্বরী কালী মন্দির কোনো ব্যক্তি, পরিবার, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক শক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি একটি সার্বজনীন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। এখানে ভক্তদের দান, দেবোত্তর সম্পদ, স্বর্ণালংকার, জমি ও অন্যান্য সম্পদ থাকলে সেসবের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকা অপরিহার্য। কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তদন্ত করতে হবে। কোনো অভিযোগ মিথ্যা হলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করতে হবে। কারও বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে আগেভাগে রায় নয়। প্রয়োজন নথি, প্রমাণ ও নিরপেক্ষ তদন্ত। স্থানীয় ভক্তদের ছয় দফা দাবি দেওয়ানেশ্বরী কালী মন্দিরকে ঘিরে চলমান বিতর্কের অবসানে স্থানীয় ভক্তদের পক্ষ থেকে যে দাবিগুলো উঠেছে। ১। গত কয়েক বছরের পূর্ণাঙ্গ আয় ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ।
২। প্রায় ২০ ভরি স্বর্ণালংকারের তালিকা, ওজন, উৎস ও বর্তমান অবস্থান যাচাই। ৩। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ অডিটের ব্যবস্থা। ৪। ২০১৯ সালের সংশোধিত গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কমিটি গঠনের বৈধতা যাচাই। ৫। মন্দিরের সম্পত্তি, দান ও ধর্মীয় পরিবেশকে কেন্দ্র করে দখল, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি বা কিশোর গ্যাং ব্যবহারের অভিযোগ তদন্ত।
৬। মন্দিরের নিরাপত্তা ও ধর্মীয় পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা। জেলা প্রশাসক ও মেয়রের জরুরি হস্তক্ষেপ চান সনাতনী ভক্তরা উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্থানীয় সনাতনী সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, প্রশাসন কোনো পক্ষের হয়ে নয়, বরং সত্য উদঘাটনের স্বার্থে মন্দিরের নথিপত্র, সম্পদ, আর্থিক হিসাব ও কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া যাচাই করবে।
অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের দায়মুক্তি, দুই ক্ষেত্রেই একটি স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। শেষ প্রশ্ন, হিসাব চাইলে এত আপত্তি কেন? দেওয়ানেশ্বরী কালী মন্দিরকে ঘিরে স্থানীয় ভক্তদের প্রশ্নগুলো হয়তো শেষ পর্যন্ত তদন্তেই নিষ্পত্তি হবে। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার।
অভিযোগের জবাব অভিযোগ দিয়ে নয়, নথি দিয়ে দিতে হবে। ২০ ভরি স্বর্ণের হিসাব থাকলে তা যাচাই হোক।
আয় ব্যয়ের হিসাব থাকলে অডিট হোক। কমিটি গঠনের বৈধতা থাকলে গঠনতন্ত্র ও নথিতে তার প্রমাণ থাকুক।
আর কোনো অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে তদন্তের মাধ্যমেই তা প্রমাণিত হোক। কারণ মন্দিরের পবিত্রতা শুধু পূজার প্রদীপে নয়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাতেও। দেওয়ানেশ্বরী কালী মন্দিরকে ঘিরে বিরোধ কোনোভাবেই যেন সাম্প্রদায়িক বিভাজন, সংঘাত কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কারণ না হয়, এটাই স্থানীয় সচেতন মহলের প্রত্যাশা। তাদের দাবি একটাই।
‘দেওয়ানেশ্বরী কালীবাড়ি থাকুক স্বচ্ছ, নিরাপদ ও সবার। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়।’