
মো. কামাল উদ্দিন এ রম্য নিবন্ধটির বিষয় শব্দদূষণ। এরকম একটি গুরুতর বিষয়কে প্রথমেই হাল্কা করে নিলাম মহামহিম সুকুমার রায়ের সাহায্যে নামকরণ করে।
সুকুমার রায় এক কাল্পনিক শব্দদূষণ এর জগৎ তৈরি করেছিলেন। ঠাস্ ঠাস্ দ্রুম দ্রাম শুনে লাখ্যে ঘটকা ফুল ফুটে? তাই বল আমি ভাবি পটকা! সেই ফুল তো ঠাস্ ঠাস্ দ্রুম দ্রাম করে ফুটল।
তারপর সে ফুলেল গন্ধ সাঁই সাঁই পন্ পন্ করে ছুটতে লাগল। হুড়মুড় ধুপধাপ করে হিম পড়তে লাগল। অবশেষে ঝুপঝুপ ঝপাস গব্ গব্ গবাস চাঁদ ডুবে গেল। আসল শব্দদূষণ এর ব্যাপারটা অবশ্য এত মজার নয়। দূষণ নানা রকম আছে। বায়ু হল একটি রাক্ষস। রামায়ণ মহাকাব্য আরণ্যকা-ে তার কথা আছে। হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য অনূদিত বাল্মীকি রামায়ণের ওই আরণ্যকা-ে একবিংশ থেকে ষড়বিংশ স্বর্গ দ্রষ্ট্রব্য। দূষণ ছিলো রাবণ রাজার মাসতুতো ভাই। বলতে গেলে রাম-রাবণের যুদ্ধ এবং লঙ্কাকা-ের সূত্রপাত হয়েছিল দূষণ এবং অন্য ভাই খর রাক্ষসের দ্বারা। এই খর এবং দূষণ পঞ্চবটি বনে তাদের বোন শূপর্ণকার কারণে রাম-লক্ষণকে আক্রমণ করে এবং সদলবলে নিহত হয়। আদি দূষণকে রাম-লক্ষণ নিহত করেছিলেন কিন্তু একালেল দূষণগুলোকে নির্মূল করার ক্ষমতা বোধহয় কোনও রাম-লক্ষণের নেই। অন্য দূষণ এর কথা থাক শব্দদূষণের কথাই বলি। প্রথমে আবার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি। চট্টগ্রাম বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল এলাকায় আমি এক যুগেরও বেশি কাল অতিবাহিত করেছি। রাস্তার পাশে একটি ছোট ঘরে থাকতাম। আমি পরে অবশ্য নির্জন পল্লীতে চলে গেছি। বহদ্দারহাট এলাকার চেহারা বদলাতে লাগল। পুরো রাস্তা মোটর গ্যারেজ আর কারখানায় ভরে উঠল। সেসব কারখানার কোনটায় পুরনো চেঁচে রং করা হয় আবার কোনটায় ইঞ্জিন ওভারহলিং হয়। সবচেয়ে অসহ্য ও মর্মান্তিক ব্যাপার হল শেষের দিকে। এক ভদ্রলোক ঠিক আমাদের বাসার উল্টোদিকে হর্ন সারাইয়ের আস্তানা করলেন। এ ভদ্রলোকের অধিকাংশ খদ্দেরই ছিল ট্যাক্সিওয়ালা। ট্যাক্সিওয়ালারা গভীর রাতে নিজেদের ভাড়া খাটা শেষ করে ওখানেই হর্ন সারাতে আসত। আবার ওই সময়টা ভদ্রলোকের পক্ষেও সুবিধাজনক ছিল। ভদ্রলোক বোধহয় দিনের বেলায় কোথাও চাকরি-বাকরি করতেন। তিনি সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে এক ঘুম দিয়ে রাতের খাওয়া-দাওয়া সেরে কারখানায় গিয়ে কাজ শুরু করতেন। তারপর বুঝেনতো বাদ-বুদ বিকট বাজে শব্দের আওয়াজে কিভাবে শব্দদূষণ হত। শিবরাম চক্রবর্তী এক আলৌকিক গাড়ির কথা বলেছিলেন যে গাড়ির হর্ন সবই বাজে।
এখানে বাজে শব্দের দু’রকম মানেই ভদ্রলোকের কারখানায় আগত গাড়িগুলো সম্পর্কে প্রয়োগ করা যায়। সারারাত ধরে চলত হর্ন সারানোর কাজ। আমাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যেত। তখন প্রাণ ওষ্ঠাগত হত। প্রতি রাতে একটি জিনিস সহ্য করা অসম্ভব ছিলো। তবুও কানে তুলো দিয়ে রাত কাটাতাম। কিন্তু এ জিনিস সহ্য করতে হয়েছির একদিনে বা দু’দিন নয়, এক মাস দু’মাস নয়, বছরের পর বছর। অনেক চেষ্ঠা করে দেখেছি কিন্তু এলাকার প্রতিবেশীরা ঐসব প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা করতে কেউ রাজি হতো না। আমি কেন একা প্রতিবাদ করব? ঐসব গ্যারেজ মালিকরা সন্ত্রাসী হতে শুরু করে সকল ধর্ম কর্ম অনুষ্ঠানে নিয়মিত চাঁদা দিত। পুলিশদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা ছিল তাও কিন্তু নগদে। অবশ্য থানা পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারতাম। কিন্তু মনে কেমন যেন সন্দেহ হত তাতে তেমন কোনও ফলোদয় হত না। এদের মধ্যে থেকে একজন খারাপ শত্রু তৈরি হবে। ভারতের স্বর্গত নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় এর কথা মনে ছিল। সে সময় তিনি দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিক ‘সুন্দর জার্নাল লিখতেন।’ তখন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় হৃদরোগ আক্রান্ত হয়ে বাসায় বিছানায় শয্যাসঙ্গী। তখনকার জাতীয় পত্রিকায় খবরে প্রকাশ। তখন নাকি তার শোয়ার ঘরের জানালার সামনে মাইকে হিন্দি গান বাজাচ্ছে। উচ্চঃস্বরে। এদিকেও রাতে গাড়ির হর্নের আওয়াজের সাথে পাল্লা দিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাইক বিশেষ করে রাজনৈতিক জনসভা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ ধর্মীয় বাদ্যবাজনা মাইক বিশেষ করে রাজনৈতিক জনসভা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ ধর্মীয় বাদ্যবাজনা বাজত যা অবিশ্বাস্য হলেও সত্য শব্দদূষণ রোধকল্পে আবেদন নিবেদন করে কোন লাভ হয়নি। মাইক দিনের পর দিন বেজেই চলেছে এবং এ অত্যাচারেই তিনি (নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়) শেষ পর্যন্ত মারা যান এবং সেটাই যে তার পরিণতি হবে শেষ কিস্তি সুন্দর জার্নাল। সেটা তিনি আগাম জানিয়ে দিয়েছিলেন। আমি তার নিয়মিত লেখাগুলো পড়তাম। বিশেষ করে পরিবেশ শব্দ এবং সমাজ দূষণের শব্দের একটি মোহ আছে। পুরাণে ঋষিরা বলেছেন, ‘শব্দব্রহ্মা’। আপনি কখনও ক্যানেস্তারা বাজিয়ে দেখেছেন? দেখবেন কিছুক্ষণ বাজানোর পর মন বেশ মজে পড়ে। মনে হয় আরও জোরে সোরে বাজাই । বাদ্যযন্ত্র বাজনোর এবং সঙ্গীতের ব্যাপারে কথিত আছে যে, শিক্ষানবিশদের এ ব্যাপারে সুরের দেবতার আশীর্বাদ আছে। যাতে তারা নিজেরা বেসুর বাজালে বা বেসুর গাইলেও তাদের নিজের কানে ধরা না পড়ে বরং মধুর শোনায়। তা না হলে নতুন আনাড়ি শিক্ষার্থীরা কখনও গান শিখতে বা বাজনা বাজানো শিখতে চাইতেন না। নিজেদের অক্ষমতা বুঝতে পেরে সঙ্গীতে সাধনা থেকে বিরত হবে কিংবা সুরচর্চা ছেড়ে দেবে। তা এই বেসুর গান-বাজনা যে গাইছে বা বাজাচ্ছে তার কানে সুমধুর শোনালেও তার প্রতিবেশীদের বাড়ির লোকদের কথা একবার ভাবুনতো। তবুও বেসুর গান সদা সহ্য করা যায়। কিন্তু যতই সুরেলা ও মধুর হোক না গান যদি অসময়ে বেজায় গায় উচ্চ শব্দে গীত হয় তা অনেক যন্ত্রণার কারণ হতে পারে। বর্তমানে আমার নীচতলায় বসবাসরত প্রতিবেশী সকাল হতে রাত অবধি গান শুনে। এত আওয়াজ বেশি করে নতুন কেউ গেলে মনে করবে পাশে বাড়িতে মাইক বাজাচ্ছে হয়তো। তবে এ ধরনের প্রতিবেশী থাকলে অন্য কোন পরিবারের বাজনার প্রয়োজন হবে না। আমার এক ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীর বাড়িতে পৌত্রের অন্নপ্রাশন উপলক্ষে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একটিই গান প্রায় সাতদিন ধরে মাইকে বাজানো হয়েছিল এবঙ সে গানটি হল ‘তোমার সমাধি ফুলে ফুলে ভরা’। একটি শিশুর মুখে ভাতের উপযুক্ত গানই বটে। আসলে গান বাজানো হচ্ছে তা হচ্ছেই । কি গান, কেন গান, অন্যদের অসুবিধে হচ্ছে কিনা, কে খেয়াল করে, কে তোয়াক্কা করে। বিগত সময় মহামান্য হাইকোর্টে মাইক বাজানোর ব্যাপারে কয়েখটি নির্দেশ জারি করেছিলেন।
কথা সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র রেঙ্গুনগামী জাহাজে এক ভয়াবহ শব্দ বিপর্যয়ে পড়েছিলেন। স্কুল পাঠ্য রচনায় শ্রীকান্ত উপন্যাসের সেই অংশটি অন্তর্ভুক্ত হয়ো বাঙলা পাঠকের সুপরিচিত। তবুও শব্দদূষণ সূত্রে কিঞ্চিত প্রক্ষিপ্ত অংশ স্মরণ করা যেতে পারে। এক প্রকার তুমুল শব্দ কানে পৌছল যার সঙ্গে তুলনা করি এমন অভিজ্ঞতা আমার নেই। গোয়ালে আগুন ধরিয়া গেলে এক প্রকার আওয়াজ উঠিবার কথা বটে। কিন্তু ইহার অনুরূপ আওয়াজ এর জন্য যতবড় গোশালার আবশ্যক ততবড় গোশালা মহাভারতের যুগে বিরাট বাজার যদি থেকে থাকে তো সে আলাদা কথা। কিন্তু এ কলিকালে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া এবং কাবুল থেকে ব্রহ্মপুত্র, কুমারিকা হতে চীনের সীমানা পর্যন্ত যত প্রকারের সুরব্রহ্ম আছে জাহাজের এই আবদ্ধ খোলের মধ্যে বাদ্যযন্ত্র সহযোগ তাহাদেরই সমবেত অনুশীলন চলছে। এ মহাসঙ্গীত শুনিবার ভাগ কদাচিৎ ঘটে। …… মহাকবি শেক্সপিয়ার নাকি বলেছিলেন, ‘সঙ্গীতে যে মুগ্ধ না হয় সে মানুষ খুন করতে পারে’। কিন্তু মিনিটখানেক গুনলেই যে মানুষের খুন চাপিয়া যায় এমন সঙ্গীতের খবর বোধ করি তার জানা ছিল না। তবুও ভাগ্য ভাল শরৎচন্দ্রের সে আমলে মাইক ও শব্দদূষণ এর বাদ্যযন্ত্র ছিল না। এই মহাসঙ্গীত যদি মাইকে গীত হত তাহলে কি অভস্থা হত সেটা কল্পনা করাও কঠিন। মহামান্য আদালত অবশ্যই মাইক ব্যবহারের সমকাল ও শব্দাতঙ্গ (অর্থাৎ কতটা জোরে মাইক বাজাবে) সেটা নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। হয়তো এতে কিছুটা সুফল পাওয়া যাবে। কিন্তু শব্দ রাক্ষস শুধু মাইক নির্ভর নয়। বাড়ির পশের কারখানায় হাতুড়ি পেটার শব্দ আছে। তিন ঘন্টার শব্দ আছে মোটর গাড়ি হর্ন সে যে কত রকমের গোলমাল হতে পারে । যদি ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরের ব্যস্ততম সড়কে জ্যামে না পড়ে তাহলে একমাত্র সেই বুঝবে। ঐ মোটর গাড়িওয়ালাদের হর্ন বাজানো দেখলে বুঝা যায় আমাদের গাড়ির চালকগণ কত অসভ্য ও শব্দদূষণ সম্পর্কে কত অনভিজ্ঞ। কত ধরনের গোলমাল হতে পারে তার কোন তুলনা নেই। সর্বোপরি আছে বাজি বোমা ও পটকা। আমাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২১শে আগস্টে বোমা হামলার শিকার হয়ে বোমার আওয়াজে কানের শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। আমাদের দেশের বোমা সাধারণ নাশকতা কাজে ব্যবহার হয়। পটকা ব্যবহার হয় পুজো পার্বণে, খেলার মাঠে বিসর্জনের ঘাটে, বিয়ে বাড়িতে, মিছিলে এবং আত্মকলহে বাজি বোমার অফুরন্ত ব্যবহার। এ গুলোকেও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তা নাহলে শব্দদূষণ হতে রক্ষা নেই। শব্দ দূষণের নতুন সংযোজন মোবাইল ফোন। আমরা যারা মোবাইল ফোন ব্যবহার করি প্রতিটি মোবাইল ব্যবহারকারী কিন্তু শব্দ দূষণের শিকার হচ্ছি। কিছুদিন পূর্বে পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছিল মোবাইল ব্যবহারকারী ধুমপানকারীদের মতো শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মোটর গ্যারেজের শব্দ দূষণের কথা দিয়ে লিখা শুরু করেছিলাম। মটর গ্যারেজের চেয়েও বেশি শব্দ দূষণ হচ্ছে মিল কারখানায় বিশেষ করে ইস্পাত কারখানায় শব্দ দূষণের মাত্রা বেশি। শব্দদূষণ রোধের জন্য সরকারিভাবে বাধা নিষেধ থাকলেও কিন্তু শব্দ দূষণকারীররা বাঁধা মানে না। কারণ যেখানে সেখানে হর্ন বাজায় কিন্তু অনেক শিক্ষিত গাড়ির মালিক চালকগণ। হর্ন দেয়াটা তাদের বাহাদুরী মনে করেন। শব্দ দূষণকারীদের কারণে আমরা প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। তাই সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের উচিৎ শব্দ দূষণ রোধ করা।
লেখক- বাংলা tv ‘র উপস্থাপক, সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক