
-মো.কামাল উদ্দিনঃ বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু দিন রয়েছে, যেগুলো শুধু একটি ঘটনার স্মৃতি নয়; বরং একটি জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের প্রতীক। ২ জুলাই তেমনই এক শোকাবহ দিন। ১৭৫৭ সালের এই দিনে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তাঁর হত্যার মধ্য দিয়ে শুধু একজন তরুণ শাসকের জীবনের অবসান ঘটেনি; বরং স্বাধীন বাংলার রাজনৈতিক অস্তিত্ব ভেঙে পড়ে এবং উপমহাদেশে প্রায় দুই শতাব্দীব্যাপী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়।
ইতিহাসে ২৩ জুন ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধকে একটি সামরিক যুদ্ধের চেয়ে অনেক বেশি একটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখা হয়। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে নবাবের সেনাবাহিনী সংখ্যায় অনেক বেশি হলেও, সেই বাহিনীর একটি বড় অংশ যুদ্ধ না করে নিষ্ক্রিয় দাঁড়িয়ে ছিল। এই নিষ্ক্রিয়তার পেছনে ছিল ক্ষমতার লোভ, ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং বিদেশি শক্তির সঙ্গে গোপন সমঝোতা।
মাত্র কুড়ির কোঠায় বয়সী সিরাজউদ্দৌলা ১৭৫৬ সালে বাংলার নবাবের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর শাসনামল ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু অত্যন্ত অস্থির। ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তখন বাণিজ্যের আড়ালে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছিল, দুর্গ নির্মাণ করছিল এবং নবাবের অনুমতি ছাড়াই নিজেদের ক্ষমতা বিস্তার করছিল। সিরাজউদ্দৌলা এই কর্মকাণ্ডকে বাংলার সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখেছিলেন। তিনি কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম দখল করেন এবং কোম্পানির অবাধ কার্যক্রম বন্ধ করার চেষ্টা করেন। এই ঘটনাই ইংরেজদের সঙ্গে সংঘাতকে তীব্র করে তোলে। এরপর শুরু হয় ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত ষড়যন্ত্র। ইংরেজ কর্মকর্তা রবার্ট ক্লাইভ বাংলার অভিজাত শ্রেণির অসন্তুষ্ট অংশকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসেন। নবাবের সেনাপতি মীর জাফর, ধনকুবের জগতশেঠ, রায় দুর্লভ, উমিচাঁদসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি গোপনে ইংরেজদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। একটি গোপন চুক্তির মাধ্যমে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়—যদি সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন, তবে মীর জাফরকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব করা হবে। ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধ শুরু হলে নবাবের বিশ্বস্ত সেনাপতি মোহনলাল এবং মীর মদন সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করেন। মীর মদন কামানের গোলায় নিহত হলে নবাবের পক্ষে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। অন্যদিকে মীর জাফরের বিশাল সৈন্যদল যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত থেকেও কার্যত নিষ্ক্রিয় থাকে। এই বিশ্বাসঘাতকতার ফলে যুদ্ধের ফলাফল দ্রুত ইংরেজদের পক্ষে চলে যায়। পরাজয়ের পর সিরাজউদ্দৌলা রাজধানী মুর্শিদাবাদ ত্যাগ করে আত্মগোপনের চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি ধরা পড়েন। ২ জুলাই ১৭৫৭ সালে মীর জাফরের পুত্র মীরনের নির্দেশে তাঁকে হত্যা করা হয়। ইতিহাসের অনেক বর্ণনায় উল্লেখ আছে, তাঁর মরদেহ জনসমক্ষে প্রদর্শন করা হয়েছিল, যাতে সম্ভাব্য প্রতিরোধের মনোবল ভেঙে যায়। এই হত্যাকাণ্ড বাংলার স্বাধীনতার অবসানের প্রতীক হয়ে ইতিহাসে স্থান পায়। সিংহাসনে বসার পর মীর জাফর বুঝতে পারেন, তিনি প্রকৃত অর্থে স্বাধীন নবাব নন। তাঁকে ইংরেজদের দাবিমতো বিপুল পরিমাণ অর্থ, সম্পদ, জমি ও বাণিজ্যিক সুবিধা দিতে হয়। রাজকোষ দ্রুত শূন্য হয়ে পড়ে। বাংলার অর্থনীতি দুর্বল হতে শুরু করে। কোম্পানির কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। ইতিহাসবিদদের মতে, এই সময় থেকেই বাংলার সম্পদ নিয়মিতভাবে বিদেশে স্থানান্তরিত হতে থাকে। ১৭৬০ সালে ইংরেজরা মীর জাফরকে অপসারণ করে তাঁর জামাতা মীর কাশিমকে নবাব বানায়। মীর কাশিম ছিলেন দক্ষ, দূরদর্শী ও স্বাধীনচেতা শাসক। তিনি প্রশাসনিক সংস্কার করেন, সেনাবাহিনীকে আধুনিক করার উদ্যোগ নেন এবং ইংরেজদের অবৈধ বাণিজ্যিক সুবিধার বিরোধিতা করেন। এর ফলে কোম্পানির সঙ্গে তাঁর সংঘর্ষ বাধে। ১৭৬৩ সালে তাঁকেও ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং পুনরায় মীর জাফরকে নবাব করা হয়। এতে স্পষ্ট হয়ে যায় যে বাংলার নবাব তখন কেবল নামমাত্র শাসক; প্রকৃত ক্ষমতা চলে গেছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে।
১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধ ব্রিটিশ আধিপত্যকে আরও শক্তিশালী করে। এরপর ১৭৬৫ সালে মুঘল সম্রাট শাহ আলম দ্বিতীয় কোম্পানিকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি বা রাজস্ব আদায়ের অধিকার প্রদান করেন। এর মাধ্যমে কোম্পানি কার্যত বাংলার অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। ইতিহাসবিদদের মতে, এই ঘটনাই ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়। মীর জাফর ৫ ফেব্রুয়ারি ১৭৬৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের জাফরগঞ্জ কবরস্থানে তাঁর সমাধি রয়েছে। কিন্তু মৃত্যুর পরও তিনি সম্মানের প্রতীক হয়ে ওঠেননি। বরং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিতে “মীর জাফর” নামটি বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিশব্দে পরিণত হয়েছে। আজও কোনো ব্যক্তি নিজের জাতি, দেশ বা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থবিরোধী কাজ করলে তাঁকে “মীর জাফর” বলা হয়। এটি শুধু একটি ব্যক্তির নাম নয়; ইতিহাস থেকে জন্ম নেওয়া একটি সামাজিক প্রতীক।
অন্যদিকে সিরাজউদ্দৌলার ব্যক্তিত্ব নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। কেউ তাঁকে আবেগপ্রবণ ও অভিজ্ঞতাহীন বলেছেন, আবার কেউ তাঁকে স্বাধীনতার শেষ প্রতিরোধকারী শাসক হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। কিন্তু একটি বিষয়ে প্রায় সবাই একমত—তিনি বিদেশি শক্তির কাছে দেশের সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিতে রাজি ছিলেন না। তাঁর পতনের প্রধান কারণ ছিল অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র এবং রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা। আজকের বাংলাদেশ ও ভারতের জন্য পলাশীর ইতিহাস শুধু অতীতের স্মৃতি নয়; এটি একটি সতর্কবার্তা। রাষ্ট্র যখন অভ্যন্তরীণ বিভক্তিতে দুর্বল হয়ে পড়ে, যখন ব্যক্তিস্বার্থ জাতীয় স্বার্থের উপরে স্থান পায়, তখন বিদেশি শক্তি সেই সুযোগ কাজে লাগায়। পলাশীর ট্র্যাজেডি আমাদের সেই কঠিন শিক্ষা দিয়ে গেছে। ইতিহাস কখনো শুধু অতীতের গল্প নয়; এটি ভবিষ্যতের পথনির্দেশক। সিরাজউদ্দৌলার হত্যাদিবসে তাঁর আত্মত্যাগকে স্মরণ করার পাশাপাশি আমাদের প্রতিজ্ঞা হওয়া উচিত—দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় আমরা কখনো বিশ্বাসঘাতকতার পথ বেছে নেব না। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব হয়তো পরাজিত হয়েছিলেন, কিন্তু ইতিহাসে তিনি স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে আছেন। আর মীর জাফরের নাম আজও স্মরণ করিয়ে দেয়—ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতার কলঙ্ক প্রজন্মের পর প্রজন্ম ইতিহাসে বহমান থাকে। ২ জুলাই তাই কেবল একটি হত্যাদিবস নয়; এটি জাতীয় আত্মসমালোচনার দিন, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার দিন এবং দেশপ্রেম, সততা ও জাতীয় ঐক্যের শপথ পুনর্নবীকরণের দিন।