
– মো. কামাল উদ্দিনঃ পৃথিবীতে কিছু মানুষ জন্ম নেন নিজের জন্য নয়, অন্যের পথ আলোকিত করার জন্য। তারা আলো নিয়ে জন্মান না, বরং নিজের কর্ম, সততা ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে নিজেরাই আলো হয়ে ওঠেন। তাদের জীবন কোনো একক পরিচয়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে না; বরং প্রতিটি পরিচয়ই সমাজের জন্য এক একটি আশীর্বাদ হয়ে ওঠে। এমন মানুষদের নিয়ে লিখতে গেলে মনে হয়, শব্দের অভিধানও যেন ছোট হয়ে যায়। আমার দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে অসংখ্য মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। কেউ এসেছেন ক্ষণিকের অতিথি হয়ে, কেউ আবার সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছেন। কিন্তু অল্প কিছু মানুষ আছেন, যাদের নাম উচ্চারণ করলেই হৃদয়ের ভেতর এক ধরনের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও নির্ভরতার অনুভূতি জন্ম নেয়। ইব্রাহিম কুতুবী তেমনই একজন মানুষ। তিনি শুধু আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু নন, তিনি আমার কর্মজীবনের স্মৃতি, সংগ্রামের সহযাত্রী এবং মূল্যবোধের এক উজ্জ্বল প্রতীক। আজ বর্ষার এক স্নিগ্ধ দুপুর। বৃষ্টির ফোঁটা জানালার কাঁচে আঘাত হেনে যেন পুরোনো দিনের অ্যালবাম খুলে দিচ্ছিল। প্রকৃতির এই নীরব সুরের মাঝেই মনে হলো—অনেকদিন ধরে যে মানুষটিকে নিয়ে লিখতে চেয়েছি, আজ তারই সময়। কারণ কিছু মানুষকে সম্মান জানাতে কোনো দিবসের প্রয়োজন হয় না; তাদের কর্মই তাদের স্মরণ করার যথেষ্ট উপলক্ষ। আমাদের পরিচয় নব্বইয়ের দশকের শুরুতে। সেই সময় সাংবাদিকতা ছিল আদর্শের লড়াই। সত্য প্রকাশ করা মানেই ছিল ঝুঁকি নেওয়া। আমরা একসঙ্গে কাজ করতাম সাহসী অনুসন্ধানী সাময়িকী ‘আঁচড়’-এ। আমি অপরাধজগত নিয়ে লিখতাম, আর ইব্রাহিম কুতুবী ছিলেন সমাজের অন্ধকার কোণগুলোতে আলো ফেলার নির্ভীক অভিযাত্রী। সেই সময়ের প্রতিটি প্রতিবেদন ছিল যেন বিস্ফোরণের মতো। ক্ষমতাবানদের মুখোশ উন্মোচন করা সহজ ছিল না। অসংখ্য হুমকি, মিথ্যা মামলা, অপপ্রচার—সবকিছুর মুখোমুখি হয়েও কুতুবী ভাই কখনো সত্যের পথ থেকে একচুলও সরে যাননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘সত্যকে সাময়িকভাবে আটকে রাখা যায়, কিন্তু পরাজিত করা যায় না।’ সেই বিশ্বাসই তাকে আজও আলাদা মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
অনেকেই কলম ধরেন, কিন্তু সবাই কলমের মর্যাদা রক্ষা করতে পারেন না। ইব্রাহিম কুতুবী সেই বিরল সাংবাদিকদের একজন, যিনি সংবাদকে কখনো ব্যক্তিগত স্বার্থের হাতিয়ার বানাননি। তিনি সংবাদকে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তার সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘সেবক কণ্ঠ’ আজও সত্য ও জনস্বার্থের পক্ষে একটি সম্মানজনক কণ্ঠস্বর। তবে সাংবাদিকতাই তার একমাত্র পরিচয় নয়। তিনি একজন শিক্ষক। আমার বিশ্বাস, একজন ভালো শিক্ষক শত বইয়ের চেয়েও মূল্যবান। কারণ তিনি শুধু তথ্য দেন না, মানুষ গড়েন। ইব্রাহিম কুতুবী তার শিক্ষার্থীদের কেবল পাঠ্যসূচি শেখান না; শেখান সততা, যুক্তিবোধ, দেশপ্রেম এবং মানবিকতা। তার ক্লাস শেষ হয়, কিন্তু তার শিক্ষা শেষ হয় না। অনেক শিক্ষার্থীর জীবনে তিনি অনুপ্রেরণার বাতিঘর হয়ে আছেন। আবার আদালতের অঙ্গনে তিনি একজন সুপরিচিত আইনজীবী। সেখানে তার পরিচয় যুক্তির, ন্যায়বিচারের এবং মানুষের অধিকারের পক্ষে একজন দৃঢ় কণ্ঠস্বর হিসেবে। তিনি জানেন, আইন শুধু ধারা-উপধারার ভাষা নয়; আইন মানুষের শেষ আশ্রয়। তাই তিনি পেশাকে কখনো ব্যবসায় পরিণত করেননি, বরং সেবার মাধ্যম হিসেবে দেখেছেন।
সাংবাদিকতা, শিক্ষকতা ও আইন—এই তিনটি ক্ষেত্রই একটি সভ্য সমাজের তিনটি শক্তিশালী স্তম্ভ। বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই তিনটি ক্ষেত্রেই ইব্রাহিম কুতুবী নিজের সততা, দক্ষতা এবং মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। খুব কম মানুষই এমন সৌভাগ্য অর্জন করেন। তার ব্যক্তিত্বের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো বিনয়। এত সাফল্য, এত পরিচিতি, এত মানুষের ভালোবাসা—কোনোটিই তাকে অহংকারী করতে পারেনি। তিনি এখনও আগের মতোই সহজ, আন্তরিক ও নিরহংকার। মানুষের সম্মান দিতে জানেন, ছোটদের স্নেহ করেন, বড়দের শ্রদ্ধা করেন, বন্ধুদের পাশে থাকেন এবং প্রয়োজনে নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিতেও দ্বিধা করেন না। আমি ব্যক্তিগতভাবে তার আরেকটি গুণে সবসময় মুগ্ধ। তিনি কখনো সম্পর্ককে প্রয়োজনের ভিত্তিতে বিচার করেন না। সময়ের ব্যবধানে অনেক সম্পর্ক ফিকে হয়ে যায়, কিন্তু কুতুবী ভাইয়ের বন্ধুত্ব সময়ের সঙ্গে আরও দৃঢ় হয়েছে। সুখে-দুঃখে, সংকটে-সম্ভাবনায় তিনি একই রকম আন্তরিক। আজকের সমাজে আমরা প্রায়ই দেখি—মানুষের পরিচয় বড় হয়, কিন্তু মানুষটি ছোট হয়ে যায়। ইব্রাহিম কুতুবীর ক্ষেত্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো। তার পরিচয় যত বিস্তৃত হয়েছে, তার মানবিকতাও তত গভীর হয়েছে। আমি মনে করি, সমাজের প্রকৃত সম্পদ অর্থবিত্ত নয়; প্রকৃত সম্পদ হলো ইব্রাহিম কুতুবীর মতো সৎ, আদর্শবান ও দায়িত্বশীল মানুষ। তারা কোনো প্রচারের আলোয় বাঁচেন না, মানুষের ভালোবাসায় বেঁচে থাকেন। তারা উচ্চকণ্ঠ নন, কিন্তু তাদের নীরব কর্মই সমাজকে বদলে দেয়। আজ যখন মূল্যবোধের সংকট আমাদের চারপাশকে ঘিরে ফেলেছে, তখন ইব্রাহিম কুতুবীর মতো মানুষরা আমাদের আশাবাদী হতে শেখান। তারা মনে করিয়ে দেন—সততা এখনও সম্মানের, ন্যায় এখনও প্রয়োজনের, আর মানবিকতা এখনও পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শক্তি। এই লেখাটি কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশংসা নয়; এটি একজন সহযোদ্ধা, একজন প্রিয় বন্ধু এবং একজন অসাধারণ মানুষের প্রতি আমার হৃদয়ের গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার প্রকাশ। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সময়ের স্রোত অনেক নাম মুছে ফেলবে, কিন্তু কর্ম, সততা ও মানবিকতার ইতিহাসে ইব্রাহিম কুতুবীর মতো মানুষদের নাম কখনো হারিয়ে যাবে না। কারণ তারা ক্ষণস্থায়ী জনপ্রিয়তার মানুষ নন; তারা দীর্ঘস্থায়ী মূল্যবোধের মানুষ। ইব্রাহিম কুতুবী—তিনি কেবল একজন সাংবাদিক, শিক্ষক কিংবা আইনজীবী নন; তিনি সত্যের কলম, জ্ঞানের প্রদীপ এবং ন্যায়ের কণ্ঠস্বর। তিনি তিনটি পেশার মানুষ নন, তিনটি দিগন্তে সমান দীপ্তিতে জ্বলতে থাকা এক অনন্য আলোকবর্তিকা।