
শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলায় প্যারাগন ফিড লিমিটেডের অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির বিষাক্ত বর্জ্যে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ার পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে ফসলি জমির ধান, মারা যাচ্ছে মাছ ও গবাদিপশু। স্থানীয়দের দাবি, উপজেলার প্রায় ১২৪ কৃষকের প্রায় ১০০ একর জমির ধান পচে নষ্ট হয়ে গেছে। বর্জ্যের তীব্র দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ। এছাড়া সরু সড়কে ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে সাধারণ মানুষের যাতায়াতেও চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। মঙ্গলবার (১২ মে) রাতে উপজেলার কাকরকান্দি ইউনিয়নে প্যারাগনের পণ্যবাহী গাড়ি আটকে বিক্ষোভ করেন এলাকাবাসী। সরেজমিনে জানা যায়, উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে মধ্যমকুড়া গ্রামে ২০২২ সালে ২৮ একর জমির ওপর ‘প্যারাগন ফিড লিমিটেড এগ্রো কমপ্লেক্স’ গড়ে তোলা হয়। বর্তমানে সেখানে প্রায় ২১ লাখ ডিম উৎপাদনকারী মুরগি রয়েছে এবং প্রতিদিন গড়ে ১৩ লাখ ডিম উৎপাদন হয়। মুরগির বিষ্ঠা থেকে কম্পোস্ট সারও তৈরি করা হয়। তবে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় আশপাশের অন্তত ১০টি গ্রাম মারাত্মক পরিবেশ দূষণের শিকার হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলোর মধ্যে রয়েছে বিন্নিবাড়ি, হাতিবান্দা, শালমারা, ঘাইলারা, কাকরকান্দি, পলাশিয়া, কাউলারা, রসাইতলা, বেনুপাড়া ও সোহাগপুর। এসব এলাকায় কয়েকটি স্কুল-কলেজসহ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কোম্পানির তরল ও কঠিন বর্জ্য সরাসরি আশপাশের কৃষিজমিতে গিয়ে মিশছে। এতে ধান লালচে হয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে দূষিত পানিতে মাছ মরে ভেসে উঠছে এবং সেই পানি পান করে হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল অসুস্থ হয়ে মারা যাচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, দুর্গন্ধ এতটাই তীব্র যে বাতাসের সঙ্গে তা ৫ থেকে ৬ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এতে শিশু, বৃদ্ধসহ সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া গ্রামের সরু পাকা রাস্তা দিয়ে প্যারাগনের ভারী ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান চলাচলের ফলে রাস্তার ক্ষতি হচ্ছে এবং যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যাতায়াতেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা আফতাব উদ্দিন, শফিকুল, আবুতালেব, জয়নাল ও শহর আলীসহ কয়েকজন জানান, শুরুতে প্যারাগন কর্তৃপক্ষ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত তার বাস্তবায়ন হয়নি। এ কারণে এলাকাবাসী বিক্ষোভে নামতে বাধ্য হয়েছেন। তারা জানান, ক্ষতিপূরণ ও কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। পরে গভীর রাতে স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রকৌশলী ফাহিম চৌধুরী ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলে পরিস্থিতি শান্ত হয়। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নিয়ামুল কাউসার বলেন, বিষাক্ত বর্জ্যের কারণে কৃষকদের আবাদি জমি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে পূর্বে চুক্তি হলেও এখন আর কোম্পানির পক্ষ থেকে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। শেরপুর জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক হেদায়েতুল ইসলাম জানান, প্যারাগন কর্তৃপক্ষ বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট সার তৈরির প্ল্যান্ট স্থাপনের অনুমোদন নিয়েছে। দ্রুত কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে ইতোমধ্যে যে পরিবেশগত ক্ষতি হয়েছে, তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্যারাগন ফিড লিমিটেডের এজিএম আনোয়ারুল কবির বলেন, প্রতিষ্ঠানে একটি ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) রয়েছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আরও ইটিপি যুক্ত করে দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি কৃষকদের ক্ষতিপূরণের বিষয়েও আলোচনা চলছে। নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল মালেক বলেন, স্থানীয়দের অভিযোগের পর প্রশাসন সরেজমিনে তদন্ত শুরু করেছে। কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতি ও পরিবেশ দূষণের বিষয়গুলো যাচাই করে আগামী রোববারের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হবে। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।