
–মো.কামাল উদ্দিনঃ
চট্টগ্রামের ব্যস্ত শহরটা নিচে তার চিরচেনা কোলাহল নিয়ে ছুটে চলেছে—আর আমি দাঁড়িয়ে আছি আকাশের অনেকটা কাছাকাছি, Best Western SKS Chattogram–এর ১৪ তলার এই নীরব ছাদে। চারপাশে সাজানো সবুজ গাছগুলো যেন শহরের কংক্রিটের ভিড়ের মাঝেও এক টুকরো প্রশান্তির ঘোষণা দিচ্ছে। অথচ এই শান্তির মধ্যেও আমার ভেতরে অদ্ভুত এক আলোড়ন—কিছু অজানা, কিছু অনুচ্চারিত, কিছু না বলা অনুভূতির ভিড়।
আমি দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু মনে হচ্ছে আমি কোথাও হাঁটছি নিজের ভেতরের কোনো দীর্ঘ পথ ধরে।
দূরে তাকিয়ে দেখি—শহরের অসংখ্য দালান যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, অথচ এই উচ্চতায় এসে তারা সবাই সমান হয়ে গেছে। কে বড়, কে ছোট—তা আর বোঝা যায় না। ঠিক তেমনি, জীবনের বহু হিসাব-নিকাশ, অর্জন-অভিমান—সবই এখানে এসে একাকার হয়ে যায়।
হয়তো এটাই উচ্চতার সত্য—যেখানে পৌঁছে মানুষ নিজের ভেতরের গভীরতাকেই বেশি স্পষ্ট দেখতে পায়।
আকাশ আজ মেঘে ঢাকা। সেই মেঘগুলো যেন ভেসে ভেসে আমার মনের অগোছালো ভাবনাগুলোকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। আমি তাকিয়ে থাকি—একদৃষ্টে, যেন মেঘের ফাঁক দিয়ে কোনো উত্তর খুঁজছি।
কিন্তু প্রশ্নটাই তো স্পষ্ট নয়—
আমি কাকে খুঁজছি?
হয়তো কেউ নেই, তবুও কারো উপস্থিতি অনুভব করছি।
হয়তো কোনো মুখ মনে পড়ছে না, তবুও হৃদয়ের ভেতর কেউ একজন জায়গা করে বসে আছে।
এই অনুভূতিটা অদ্ভুত—এটা ভালোবাসা কিনা জানি না, কিন্তু এর মধ্যে এক ধরনের কোমলতা আছে, এক ধরনের টান আছে, যা আমাকে নিজের ভেতরেই আটকে রাখে।
বাতাস এসে গায়ে লাগে। খুব মৃদু, খুব নরম। মনে হয়, কেউ যেন দূর থেকে এসে আমাকে ছুঁয়ে দিয়ে গেল। সেই স্পর্শে একটা অদ্ভুত শিহরণ জাগে—আমি চোখ বন্ধ করি।
চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে কিছু অসম্পূর্ণ দৃশ্য—
কিছু কথা, যা বলা হয়নি…
কিছু সম্পর্ক, যা শুরু হওয়ার আগেই থেমে গেছে…
কিছু স্বপ্ন, যা কখনো পূর্ণতা পায়নি…
তবুও তারা হারিয়ে যায়নি—
তারা রয়ে গেছে আমার ভেতরের এক গোপন কোণে।
আমি ভাবি—মানুষ কেন এমন অনুভূতি বয়ে বেড়ায়?
কেন কিছু ভালোবাসা প্রকাশ পায় না, তবুও সবচেয়ে গভীরে জায়গা করে নেয়?
হয়তো উত্তরটা খুব সহজ—
যে ভালোবাসা শব্দের প্রয়োজন পড়ে না, সেটাই সবচেয়ে সত্য।
আমি দাঁড়িয়ে আছি, দু’হাত পকেটে—যেন নিজের ভেতরের অস্থিরতাকে লুকিয়ে রাখতে চাইছি। কিন্তু কিছু অনুভূতি লুকানো যায় না। তারা চোখে ভেসে ওঠে, নিঃশ্বাসে মিশে যায়, আর নীরবতার মধ্যে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দূরের শহরটা ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসছে। আলো আর ছায়ার মিশেলে এক অদ্ভুত দৃশ্য তৈরি হয়েছে। মনে হচ্ছে, পুরো শহরটাই যেন একটা স্বপ্ন—যেখানে আমি আছি, তবুও নেই।
এই উচ্চতা আমাকে একটা সত্য শেখায়—
জীবনে যতই মানুষের ভিড় থাকুক, কিছু মুহূর্ত থাকে একান্ত নিজের।
সেই মুহূর্তগুলোতেই মানুষ নিজের সঙ্গে সত্যিকারের কথা বলে।
আজ আমি ঠিক সেই কথোপকথনের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি।
আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করি—
“তুমি কি কাউকে ভালোবাসো?”
উত্তর আসে না সরাসরি।
বরং একটা অনুভূতি এসে বলে—
“হ্যাঁ, আমি ভালোবাসি… কিন্তু কাকে, তা জানি না।”
হয়তো আমি ভালোবাসি সেই মানুষটাকে,
যে এখনো আমার জীবনে আসেনি…
হয়তো আমি ভালোবাসি সেই সময়টাকে,
যা এখনো আসেনি…
অথবা হয়তো আমি ভালোবাসি এই মুহূর্তটাকেই—
যেখানে আমি সম্পূর্ণ নিজের মতো।
চারপাশের গাছগুলো নীরবে দুলছে। তাদের কোনো ভাষা নেই, তবুও তারা অনেক কিছু বলে। তারা জানে, এই মানুষটা আজ নিজের ভেতরের এক গভীর স্রোতের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
একটা পাখি উড়ে গেল আকাশের দিকে। আমি তাকিয়ে থাকলাম—যতক্ষণ না সেটি চোখের আড়াল হয়ে যায়। মনে হলো, আমার কোনো এক অনুভূতিও ঠিক এভাবেই উড়ে যাচ্ছে—ধরা যায় না, তবুও হারিয়েও যায় না।
আমি হালকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলি।
এই দীর্ঘশ্বাসে কোনো কষ্ট নেই, আবার পুরোপুরি স্বস্তিও নেই—এটা এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি।
হয়তো এটাই জীবন—
অসম্পূর্ণতার মাঝেই এক ধরনের পূর্ণতা খুঁজে নেওয়া।
আমি আবার আকাশের দিকে তাকাই। মনে মনে বলি—
“যদি কেউ এসে আমার পাশে দাঁড়ায়, তবে সে যেন এই নীরবতাকে বুঝতে পারে।
সে যেন আমার কথার চেয়ে আমার নীরবতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
কারণ আমি যা বলতে পারিনি,
সেটাই আমার সবচেয়ে সত্য অনুভূতি।”
এই ১৪ তলার ছাদে দাঁড়িয়ে আমি বুঝতে পারি—
মানুষের সবচেয়ে বড় যাত্রা বাইরের নয়, ভেতরের।
আমি আকাশ ছুঁতে পারিনি—
কিন্তু নিজের ভেতরের গভীরতাকে ছুঁয়ে ফেলেছি।
আর সেই স্পর্শটাই সবচেয়ে মূল্যবান।
আমি ধীরে ধীরে চোখ নামাই, চারপাশে তাকাই—সবকিছু আগের মতোই আছে, কিন্তু আমি আর আগের মতো নেই।
কারণ এই মুহূর্তে আমি জানি—
আমার ভেতরে এক অদৃশ্য ভালোবাসা জন্ম নিয়েছে,
যার কোনো নাম নেই, কোনো ঠিকানা নেই,
তবুও সে আমারই—
একান্ত, নীরব, আর চিরন্তন।