
মো. কামাল উদ্দিন।
১৯৯১ সালের এ দিনে প্রলয়ঙ্ককরী ঘূর্ণিঝড় চট্টগ্রাম বিভাগের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার বেগে আঘাত হানে। এ ঘূর্ণিঝড়ের ফলে ছয় মিটার (২০ ফুট) উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় এলাকা প্লাবিত হয় এবং এতে বেসরকারি হিসেবে এক লাখ ৩৮ হাজার মানুষ প্রাণ হারান। তাদের বেশিরভাগেরই মৃত্যু হয় চট্টগ্রাম জেলার উপকূল ও দ্বীপগুলোতেে। সেই ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের দিনকে স্মরণ করার জন্য এই লেখা, আজ সর্বনাশা ২৯ শে এপ্রিল, বিগত ১৯৯১ সালে আজকের এইদিনে আমাদের উপর বড় ধরণের ভয়ংকর চাপ অতিবাহিত হয়েছিল, আমি সেই দিনের সেই ভয়ংকর স্মৃতিময় দৃশ্য নিয়ে লিখতে গিয়ে আজ থেকে ৩৫ বছর আগের স্মরণকালের অবিস্মরণীয় ঘটনা কথায় আমাকে দারুণ ভাবে নারা দিয়েছে, জানিনা সেই দিনের সেই ঘটে যাওয়ার কথা ভুলে থাকতে পারবো কিনা।আজীবন এই করুন স্মৃতি মাথায় নিয়ে বাকি সময় কাটাইতে হবে।আমি আমার নিজের কিছু কথা দিয়ে শুরু করছি, ৯১ ঘূর্ণিঝড়ের সময় আমি বহদ্দারহাট ছিলাম, আমার বন্ধু ইকাবালের বাবার মেজবানের দাওয়াত দেওয়া জন্য আমরা রাউজান উরকিরচর গেযেছিলাম, আমরা শহরের ফেরার সময় একটু টকটু বাতাস শুরু হয়েছে, প্রায় সন্ধ্যা নেমে আসছে, গাড়ী পাওয়া খুবই কষ্ট হচ্ছিল, কোনোভাবে একাধিক গাড়ী বদলি করে শহরে পৌঁছলাম, তখন কিন্তু সবদিকে হুর হুরি শুরু হয়েছে ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাসের খবর প্রচার হওয়াতে। আবহাওয়া অফিস বার বার সতর্ক সংকেত বাজাচ্ছে তখন হালকা বৃষ্টি ও ধমকা বাতাস শুরু হয়ে গেছে। কোনো ভাবে বহদ্দারহাট আসারপর একটু নিরাপদ মনে করলাম, একটু একটু করে বাতাস বৃদ্ধি পাচ্ছে রাতে খাওয়ার তারাতাড়ি সেরে নিলাম। রাতে শুরু হলো প্রচন্ড বেগে বাতাস সাথে বৃষ্টি যতই রাত গভীর হচ্ছে ততোই বাতাসের তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, সারারাত আল্লাহ আল্লাহ করে রাত অতিবাহিত করলাম। সকালে দেখলাম পুরো শহর লন্ডভন্ড হয়েগেছে, চির চেনা জানা শহরকে অচেনা অজানা মনে হচ্ছে, শহরে খাওয়ার কোন হোটেল নেই, নাস্তা করার জন্য, না খেয়ে চলে গেলাম খাজা রোডে বন্ধু মুনসুরের বাড়ীতে মুনসুর তখন ওমানে তার বাড়ীঘর দেখার দায়িত্ব ছিলো আমার উপর, আমি শুনলাম মুনসুরের ঘর একেবারে ভেঙে গেছে, ঘরছিলো মাটির তাই অতিরিক্ত পানি হওয়াতে মাটিঘর পানি খেয়ে পরে গেছে, তাদের জন্য সাথে করে আমি কিছু কলা ও চিঁড়া নিয়েছিলাম। যাওয়ার সময় খরম পড়ার মুখে কবরস্থানের পাকা দেওয়ালের মাজারের দান বাক্সের উপর একটি সাপ অসহায়ের মতো বসেছিল,কিন্তু মজার বিষয় হলো সাপের পাশদিয়ে বুক সমান পানি ভেঙে আমরা হেঁটে গেলাম, সাপ কোন কাহাওকে কিছুই করেনি। তার বিস্তারিত অন্য দিন লিখবো, আমি মুনসুরের বাড়ীতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে চলে গেলাম আমার গ্রামের বাড়ীতে, বোয়ালখালী চরণ দ্বীপ বাড়ীতে খুব কষ্ট করে পৌঁছলাম, তখন বাড়ীতে গিয়ে দেখলাম আমাদের বাড়ী নেই, সব কিছু পানিতে চলেগেছে কারণ আমাদের ঘর ছিলো একেবারে কর্ণফুলী নদীর তীরে, বাড়ীতে পানি পান করার একটি গ্লাসও ছিলোনা বাড়ীতেনগিয়ে দেখলাম আমার মা বসে বসে কন্না করছে, মা কান্নাকাটি করবেনা কেন, সাজানো ঘর তছনছ হয়েগেছে। অনেক কথা এই লেখাতে তুলে ধরা সম্ভব নয়, ঘূর্ণিঝড়ের তান্ডবে পুরো চট্টগ্রাম যখন মৃত্যুপুরি পরিনত হয়েছে তখন আমি আমার নিজের ধ্বংসকৃত বাড়ীঘর রেখে মানুষকে সাহায্য করার জন্য বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্হ এলাকায় চলে গেলাম, আমরা দলবেঁধে বাঁশখালী, চকরিয়া আনোয়ারা, পতেঙ্গা সহ সগার ও নদী সংলগ্ন থানা গুলোতে গিয়ে মানবিক সেবা শুরু করেছি, তখন দেখেছিলাম মানুষের লাশের সাথে গরু ছাগলের লাশ আর লাশ। কবর দেওয়ার জায়গাও ছিলোনা তা স্ব চোখে দেখার পর আমি বহুদিন সাবাভিক ভাবে খাওয়া দাওয়া করতে পারেনি। ঐদিনের দৃশ্য সমূহ মনে পড়লে মন কেন যেন খারাপ হয়ে যায়,আগামীতে সব কিছুর বর্ননা দিয়ে শুধুমাত্র ঘূর্ণিঝড়ের তান্ডবের কাহিনি আলাদাভাবে লিখবো ইনশাআল্লাহ। আজকে শুধুমাত্র ২৯ শের এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ের আংশিক কথা তুলে ধরার পাশাপাশি চট্টগ্রাম ক্ষতির সামন্য চিত্র তুলে ধরছি। দিনটি ছিল সোমবার। সকাল থেকেই আকাশে মেঘের আনাগোনার পাশাপাশি ছিল গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি, বাতাসও বইছিল হালকাভাবে। দুপুর গড়াতেই বেড়ে গিয়েছিল বাতাসের গতিবেগ। বিকেলের পর থেকে বাতাসের সঙ্গে বাড়তে থাকে বৃষ্টি। রাত ১২টার দিকে ভেড়িবাঁধ ভেঙে উঠে আসা জলোচ্ছ্বাস ভাসিয়ে নিয়ে যায় বাড়িঘর, মানুষ, গবাদিপশু সবকিছু। মূহুর্তের মধ্যে পাল্টে যায় সবকিছু! এটি কোন গল্পের বর্ণনা নয়, বাস্তব জীবনে ঘটে যাওয়া এক দুঃসহ ঘটনার বর্ণনা! বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রকৃতির এ ভয়াল রূপটি দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছিল ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল। ৩৩ বছর আগের প্রলয়ংকারী ঘুর্ণিঝড়ের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ আর প্রাণহাণির দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে আবারো দিনটি হাজির হয়েছে উপকূলবাসীর কাছে! ২৯ এপ্রিলের মধ্যরাতে আঘাত হানা প্রবল ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে গিয়েছিল কক্সবাজার জেলার মহেশখালী, কুতুবদিয়া, চকরিয়া, কক্সবাজার সদর, চট্টগ্রামের আনোয়ারা, বাঁশখালীসহ দেশের ১৩টি উপকূলীয় জেলার শত শত ইউনিয়ন! ঘন্টায় ২০০ থেকে ২২৫ কিলোমিটার গতিবেগের প্রচন্ড ঘূর্ণিঝড় এবং ২৫ থেকে ৩০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসে দেশের উপকূলীয় এলাকা পরিণত হয়েছিল বিরানভূমিতে। ঘরবাড়ি লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়, সহায় সম্বল হারায় মানুষ।বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস তছনছ করে দিয়েছিল উপকূলীয় জনপদ। ভেসে গিয়েছিল ফসলের ক্ষেত, লাখ লাখ গবাদি পশু। ভয়াবহ এ ঘূর্ণিঝড়ে মারা যায় প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ। যদিও সরকারি হিসাব মতে মৃতের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৮ হাজার। সম্পদহানি হয়েছিল ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল প্রায় ৬০ লাখ মানুষ! ২৯ এপ্রিলের সেই ধ্বংসযজ্ঞের স্মৃতি বয়ে নিয়ে আবারও উপকূলীয় মানুষের কাছে দিনটি ফিরে এসেছে। ভয়াল সে স্মৃতি আজো কাঁদায় পুরো উপকূলবাসীকে। এ দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি শোকাবহ দিন। দুঃসহ সে স্মৃতি এখনো কাঁদায় স্বজনহারা মানুষগুলোকে! সেই ভয়াবহ দিনটি কখনো ভূলবো না, ভোলার নয়! আজো মনে পরলে(সেই রাত) এখনো শরীর কেপেঁ উঠে। ১৯৯১ সালের ২৯শে এপ্রিলের ঘূর্নিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্থাদের জন্য সমবেদনা ও নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করছি, ১৯৯১ সালের আজকের এই দিনে এক ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আঘাতে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়েছিল বাংলার উপকূল। ১৯৯১ সালের ২২ এপ্রিল মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বঙ্গোপসাগরে একটি গভীর নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়। ২৪ এপ্রিল নিম্নচাপটি ০২বি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয় এবং উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হতে থাকে। অগ্রসর হওয়ার সময় এটি আরও শক্তিশালী হয়। ২৮ ও ২৯ এপ্রিল এটির তীব্রতা বৃদ্ধি পায় এবং এর গতিবেগ পৌঁছায় ঘণ্টায় ১৬০ মাইলে। ২৯ এপ্রিল রাতে এটি চট্টগ্রামের উপকূলবর্তী অঞ্চলে ঘণ্টায় ১৫৫ মাইল বেগে আঘাত করে। স্থলভাগে আক্রমণের পর এর গতিবেগ ধীরে ধীরে কমতে থাকে এবং ৩০ এপ্রিল এটি বিলুপ্ত হয়। এই ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাংলাদেশের ১৯টি জেলার ১০২টি উপজেলা। তবে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুতুবদিয়া, খেপুপাড়া, ভোলা, টেকনাফ। ১৯৯১ সালের এই ঝড়ে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৮২ জন মানুষ মৃত্যুবরণ করে এবং প্রায় সমপরিমাণ মানুষ আহত হয়। আমার এখনো মনে আছে, তখন কয়েক দিন ধরে টিভিতে নিয়মিত সব অনুষ্ঠান বাতিল করে একটু পরপর বিভিন্ন হুঁশিয়ারি সংকেত শোনানো হচ্ছিল।১৫-২০ ফুট জলোচ্ছ্বাসসহ সেই প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে সরকারি হিসাবেই ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ মারা যায়। প্রায় ১ কোটি মানুষ আশ্রয়হীন হয়েছিল। সে সময় ক্ষুদ্র অর্থনীতির বাংলাদেশে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদের ক্ষতি হয়েছিল। বলা হয়, সে সময় ঘূর্ণিঝড়ের বার্তা প্রচার ও মাইকিং হলেও গুরুত্ব না দিয়ে মানুষ সেভাবে আশ্রয়কেন্দ্রে যায়নি। অনেকের কাছে খবর না পৌঁছানোরও অভিযোগ আছে আজ ৩৩ বছর পর সর্বনাশা ঘূর্ণিঝড়ের কথা আংশিক লিখলাম। আমরা অনেকেই এখন ঘূর্ণিঝড়ের সেই ভয়াল তান্ডবের কথা ভুলে যাচ্ছি, আবার বর্তমান প্রজন্মের অনকেই ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাস দেখেনি তখন তাদের অনেকর জন্মও হয়নি। আমরা প্রতি বছর ২৯ শে এপ্রিল আসলে এই সর্বনাশা ঘূর্ণিঝড়ের কথা কিছুটা মনে করি ২৯ শে এপ্রিল চলে গেলে আবাও আমরা ভুলে যায় ভয়াল তান্ডবের কথা। তখন আমাদের সচেতনতা খুবই কম ছিলো, এতবড় ঘূর্ণিঝড় যে হবে বা আঘাত আনবে তা বিশ্বাস করতে পারিনি মানুষ, এখন কিন্তু তখনকার তুলনায় মানুষ অনেক সচেতন হয়েছে। এই সচেতনতা ধরে রাখতে হবে যেন আগমীতে বড় ধরণের কোনো ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাস হয় তার থেকে যেন আমরা রক্ষাপায়।
লেখকঃ সাংবাদিক, গবেষক,প্রাবন্ধিক, টেলিভিশন উপস্থাপক ও মহাসচিব, চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম।