“রিয়াজ হায়দার চৌধুরীকে ঘিরে সাংবাদিকদের ঐক্যের বার্তা: ইফতারের টেবিলে মূলধারার সাংবাদিকতার শক্ত অবস্থান-

By admin
7 Min Read

-মো. কামাল উদ্দিনঃ
পবিত্র রমজান মাস মানুষের আত্মশুদ্ধি, সংযম এবং ভ্রাতৃত্ববোধের মাস। দিনের দীর্ঘ রোজার পর যখন সূর্যাস্তের সোনালি আলো শহরের আকাশে মিশে যায়, তখন মানুষ এক টেবিলে বসে ইফতার ভাগ করে নেয়—সেখানে থাকে শুধু খাদ্যের অংশীদারিত্ব নয়, হৃদয়েরও মিলন। চট্টগ্রামের সাংবাদিক সমাজের জন্য এবারের রমজান এমনই এক স্মরণীয় সন্ধ্যার সাক্ষী হয়ে থাকবে। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের মূল কমিটি এবং চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের যৌথ উদ্যোগে ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন হলে আয়োজিত ইফতার মাহফিলটি ছিল শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ছিল সাংবাদিকদের ঐক্য, সহমর্মিতা এবং পেশাগত বন্ধনের এক উজ্জ্বল প্রতীক। এই আয়োজনকে ঘিরে যার নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে তিনি হলেন চট্টগ্রামের সাংবাদিক সমাজের পরিচিত মুখ—রিয়াজ হায়দার চৌধুরী। চট্টগ্রামের সাংবাদিকতার ইতিহাসে তিনি শুধু একজন সাংবাদিক নন; তিনি দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকদের অধিকার, মর্যাদা এবং পেশাগত সম্মান রক্ষার প্রশ্নে সক্রিয় ভূমিকা রেখে আসছেন। ফলে তাকে কেন্দ্র করে আলোচনা, সমালোচনা কিংবা বিতর্ক—সবকিছুই যেন একসাথে জড়িয়ে থাকে। এই ইফতার মাহফিলকে ঘিরে গত কয়েকদিন ধরে কিছু মহল থেকে অপপ্রচার, বিভ্রান্তি এবং হুমকি-ধমকির পরিবেশ সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এমনকি এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল যাতে রিয়াজ হায়দার চৌধুরী যেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত না হন এবং সাংবাদিক সমাজের মধ্যে এক ধরনের বিভাজন সৃষ্টি হয়। কিন্তু বাস্তবতা অন্য কথা বলেছে। সেদিন ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন হলের ভেতরে উপস্থিত সাংবাদিকদের মুখে যে আন্তরিকতা, হাসি আর বন্ধুত্বের উষ্ণতা দেখা গেছে, তা যেন স্পষ্ট করে দিয়েছে—চট্টগ্রামের মূলধারার সাংবাদিকরা এখনো ঐক্যবদ্ধ। এই আয়োজন যেন একটি নীরব ঘোষণা— অপপ্রচার দিয়ে সাংবাদিক সমাজকে বিভক্ত করা যায় না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে একটি দুঃখজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিছু নামসর্বস্ব তথাকথিত সাংবাদিক নিজেদের আলোচনায় আনতে গিয়ে অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করার চেষ্টা করছেন। কখনো পেশিশক্তির প্রদর্শন, কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কটূক্তি—এসব আচরণ সাংবাদিকতার মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। আমি যখন রিয়াজ হায়দার চৌধুরীকে নিয়ে একটি লেখা লিখলাম, তখন কিছু মানুষের মধ্যে অদ্ভুত অস্থিরতা দেখা গেল। তারা প্রশ্ন তুলতে শুরু করলেন—আমি কেন তাকে নিয়ে লিখলাম? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে একটু ইতিহাসে ফিরে যেতে হয়। রিয়াজ হায়দার চৌধুরীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক আজকের নয়। আমাদের পরিচয় ১৯৯২ সাল থেকে। সেই সময় থেকেই আমরা সাংবাদিকতা এবং নাগরিক আন্দোলনের বিভিন্ন অধ্যায়ে একসঙ্গে পথ চলেছি। ১৯৯৪ সালে আমরা চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশ করি একটি ব্যতিক্রমধর্মী ম্যাগাজিন—“চট্রল চিত্র”। এটি ছিল চট্টগ্রামের প্রথম দিককার ফোর কালার অপরাধ ও রাজনৈতিক ম্যাগাজিনগুলোর একটি। মুক্তিযোদ্ধা গবেষক সাংবাদিক জামাল উদ্দিন ছিলেন সম্পাদক এবং আমি ছিলাম নির্বাহী সম্পাদক। সেই ম্যাগাজিনের পাতায় আমরা তুলে ধরতাম সমাজের অন্ধকার দিক, অপরাধ জগতের গল্প এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার নানা দিক। সেই সময় নিয়মিত লিখতেন রিয়াজ হায়দার চৌধুরী এবং মহসিন কাজী। প্রথম সংখ্যা প্রকাশের দিন আমরা সবাই মিলে মোঘল বিরিয়ানির টেবিলে বসে যে আনন্দ ভাগ করে নিয়েছিলাম—সেই স্মৃতি আজও আমাদের মনে উজ্জ্বল হয়ে আছে। সাংবাদিকতার বাইরে আমাদের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছিল নাগরিক আন্দোলনের রাজপথে। এস এম জামাল উদ্দিনের নেতৃত্বে বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির আন্দোলন এবং ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের জলাবদ্ধতা নিরসন ও কালুরঘাট সেতু নির্মাণ আন্দোলনে আমরা একসঙ্গে রাজপথে নেমেছি। সেই আন্দোলনগুলো ছিল চট্টগ্রামের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এখানে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন— রিয়াজ হায়দার চৌধুরী শুধু সহযোদ্ধা নন, তিনি আমার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ও। এই দীর্ঘ সম্পর্ক, সংগ্রামের স্মৃতি এবং সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতার আলোকে আমি তাকে নিয়ে বহুবার লিখেছি। আজও লিখছি। কারণ সাংবাদিকতা শুধু খবর লেখা নয়; এটি ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করা। আজকের লেখাটি লিখতে বসে আমি আরেকটি বাস্তবতার কথা বলতে চাই। বর্তমান সময়ে দেশের সাংবাদিকতা এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সেই পরিবর্তনের ঢেউ চট্টগ্রামেও পৌঁছেছে। দীর্ঘদিন ধরে কিছু গোষ্ঠী সাংবাদিকতার উপর এক ধরনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। যেন সাংবাদিকতার লাইসেন্স দেওয়ার দায়িত্ব তাদেরই হাতে। তাদের চোখে প্রেসক্লাবের সদস্যরাই শুধু সাংবাদিক—বাকিরা যেন অযোগ্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো— সাংবাদিকতা কোনো ক্লাবের সদস্যপদ দিয়ে নির্ধারিত হয় না। সাংবাদিকতা নির্ধারিত হয় সততা, সাহস এবং কলমের শক্তি দিয়ে। আজ তৃণমূল পর্যায়ের কর্মরত সাংবাদিকরা সেই বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। তারা তাদের অধিকার এবং মর্যাদা দাবি করছেন। আমি সেই আন্দোলনের একজন সহযোদ্ধা। কারণ একজন কলম সৈনিক হিসেবে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আমার অবস্থান সব সময়ই স্পষ্ট। আমি লেখালেখি শুরু করেছি ১৯৮৮ সালে। প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত আছি। প্রথমে ম্যাগাজিনে লিখেছি। তারপর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে পেশাগত জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করি। আমি কাজ করেছি—দৈনিক খবর,চিত্র বাংলা,বর্তমান দিনকাল,ছায়া চন্দ, নিয়মিত কলাম লিখেছি-দৈনিক পূর্বকোণ ও দৈনিক আজাদী, এবং জাতীয় দৈনিক একাধিক পত্রিকাসহ দৈনিক ঈশান, নয়া বাংলা, সুপ্রভাত বাংলাদেশসহ অসংখ্য পত্রিকায়। বিশেষ করে আমিরিকার ঠিকানা পত্রিকায়, তবে অপরাধ বিষয় অনুসন্ধানীপ্রতিবেদন করতাম “অপরাধ জগত” ম্যাগাজিনে- ২০০৬ সাল থেকে প্রকাশ করছি সাপ্তাহিক সময়ের আলো, যা তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতার জন্য পরিচিত। ২০১৭ সালে বাংলা টিভিতে আমার উপস্থাপনায় শুরু হয় “চট্টগ্রাম সংলাপ” টকশো। পাশাপাশি সচিত্র চট্টগ্রাম, কিছু কথা কিছু গান এবং কথার কথা ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছি টানা কয়েক বছর। লেখালেখির পাশাপাশি পড়াকে আমি জীবনের অন্যতম সাধনা হিসেবে নিয়েছি। দেশি-বিদেশি প্রায় পঞ্চাশ হাজারের বেশি বই পড়েছি। বাংলাদেশের অসংখ্য লাইব্রেরি থেকে বই সংগ্রহ করেছি। সেই পড়া থেকেই শুরু হয়েছে বই লেখা।২০০৮ সালে প্রকাশিত হয় আমার প্রথম বই “বাঁকা কথা”। বর্তমানে আমার বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৩২ টি।আমি বিশ্বের লেখকদের সংগঠন পেন ইন্টারন্যাশনাল-এর সদস্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। সাতজন নোবেলজয়ী সাহিত্যিককে সরাসরি সাক্ষাৎকার নেওয়ার অভিজ্ঞতাও আমার রয়েছে। ২০০৪ সালে কাতারের শেরাটন হোটেলে সৌদি রাজকন্যা সুরাইয়ার একক সাক্ষাৎকার নেওয়ার বিরল অভিজ্ঞতাও আমার হয়েছিল।
এই দীর্ঘ পথচলার কথা বলার উদ্দেশ্য অহংকার নয়— বরং একটি সত্য মনে করিয়ে দেওয়া। সাংবাদিকতার মর্যাদা আসে অধ্যবসায় থেকে, অভিজ্ঞতা থেকে এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সাহস থেকে। পৃথিবীর বহু খ্যাতিমান সাংবাদিককে কাছ থেকে দেখেছি। কিন্তু তাদের মধ্যে অহংকার দেখিনি। তারা যত বড় মাপের সাংবাদিক—তাদের মনও তত বড়। দুঃখজনকভাবে আমাদের সমাজে কিছু মানুষ আছেন যারা নিজেদের সীমাবদ্ধতা ভুলে গিয়ে অন্যের সমালোচনা করতেই আনন্দ পান। তারা ভুলে যান সাংবাদিকতার শক্তি পদবি নয়, কলম। প্রেসক্লাবের সদস্য হওয়া বড় কথা নয়। বড় কথা হলো—বড় মনের সাংবাদিক হওয়া। আজকের এই ইফতার মাহফিল সেই সত্যকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। সেদিন এক টেবিলে বসে যে সৌহার্দ্যের দৃশ্য দেখা গেছে, তা প্রমাণ করে—চট্টগ্রামের মূলধারার সাংবাদিকরা এখনো ঐক্যবদ্ধ। অপপ্রচার, হুমকি কিংবা বিভ্রান্তি দিয়ে সেই ঐক্য ভাঙা যাবে না। কারণ ইতিহাস সব সময়ই সত্যের পাশে দাঁড়ায়। আর সত্যের পক্ষে যারা কলম ধরেন— সময়ের স্রোত বয়ে গেলেও ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদের নামই মনে রাখে।

Share This Article
Leave a Comment