
—মো. কামাল উদ্দিন
সমুদ্র যখন অশান্ত হয়, তখন সবচেয়ে শক্ত জাহাজও কেঁপে ওঠে। ইতিহাসে আমরা দেখেছি, অহংকার নয়—অপ্রস্তুত ঝড়ই ডুবিয়ে দেয় মহাশক্তিধর জাহাজকে। যেমন একদিন Titanic আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরেছিল মানবসভ্যতার এক করুণ পরিণতি। আজ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক দিগন্তে আমি দেখতে পাচ্ছি আরেকটি ঝড়ের পূর্বাভাস।
সেই ঝড়ের মুখে দাঁড়িয়ে আছে এস আলম গ্রুপ—চট্টগ্রামের শিল্প-অভিযাত্রার এক দীর্ঘ অধ্যায়, হাজারো শ্রমিকের জীবনরেখা, এবং দেশের অর্থনীতির এক শক্ত স্তম্ভ।
চট্টগ্রাম: বন্দরনগরীর বাণিজ্যিক আত্মা: প্রাচ্যের রাণী চট্টগ্রাম কেবল একটি শহর নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। এই শহরের প্রতিটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান মানে হাজারো পরিবারের স্বপ্ন। আশির দশকে ছোট পরিসরের পরিবহন ব্যবসা দিয়ে শুরু করে এস আলম গ্রুপ যে বিস্তৃত শিল্প সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে—তা কেবল ব্যবসায়িক সাফল্য নয়, এটি উদ্যোক্তা সাহসের এক অনন্য উদাহরণ। খাদ্যপণ্য, চিনি, ভোজ্যতেল, ইস্পাত, সিমেন্ট, বিদ্যুৎ উৎপাদন—বহু খাতে তাদের বিনিয়োগ দেশের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণ করে বৈদেশিক বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি জোরদার করেছে। ব্যাংক ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা হয়েছে—যা শিল্প অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ঋণ মানেই অপরাধ নয়; বরং উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ইঞ্জিন সচল রাখার উপায়। যদি কোথাও অসঙ্গতি থাকে—আইন আছে, তদন্ত হোক। কিন্তু বিচারপূর্বেই প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া কি ন্যায়সংগত?
সম্ভাব্য বিপর্যয়ের মুখোমুখি আমরা
যদি এই শিল্পগোষ্ঠী ভেঙে পড়ে—
লক্ষাধিক শ্রমিক-কর্মচারী বেকার হবে, বাজারে খাদ্য ও নির্মাণ সামগ্রীর সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেবে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হবে, সামাজিক অস্থিরতা বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, একটি শিল্পগোষ্ঠীর পতন মানে কেবল একটি নামের বিলুপ্তি নয়; এটি হাজারো পরিবারের চুলা নিভে যাওয়ার শঙ্কা।
ষড়যন্ত্র না প্রতিযোগিতা? সফলতা সবসময় প্রশংসা পায় না—পায় ঈর্ষাও। বাজার প্রতিযোগিতা থাকবেই। কিন্তু প্রতিযোগিতা যদি নীতির বদলে কৌশলী আঘাতে পরিণত হয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় গোটা অর্থনীতি। রাজনৈতিক চাপ, বাজার নিয়ন্ত্রণের লড়াই, স্বার্থের সংঘাত—এসব প্রশ্ন আজ জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে। আমি কোনো রায় দিচ্ছি না; আমি কেবল বলছি—সত্য উদঘাটিত হোক, কিন্তু শিল্প রক্ষা করে। মাননীয় প্রধান মন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি আবেদন
মাননীয় প্রধান মন্ত্রী তারেক রহমান,
আজকের এই সংকটময় মুহূর্তে আপনার বিচক্ষণ নেতৃত্বই পারে পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে। আমরা চাই—
নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত, শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুরক্ষা, ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ রক্ষা, একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে লাগে বহু বছর; ধ্বংস হতে লাগে মুহূর্ত। আপনার হস্তক্ষেপ হাজারো পরিবারকে আশ্বাস দিতে পারে—ন্যায়বিচার হবে, কিন্তু শিল্প ধ্বংসের বিনিময়ে নয়। আমাদের দায়বদ্ধতা, এই মুহূর্তে প্রয়োজন—তথ্যভিত্তিক আলোচনা
গণতান্ত্রিক ও আইনানুগ আন্দোলন, দলমত নির্বিশেষে ঐক্য, এস আলম গ্রুপকে রক্ষা করা মানে কেবল একটি শিল্পগোষ্ঠীকে রক্ষা করা নয়; এটি চট্টগ্রামের শিল্প ঐতিহ্যকে রক্ষা করা, শ্রমিকের অন্ন রক্ষা করা, দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে রক্ষা করা।
শেষ আহ্বান- আজ যদি আমরা নীরব থাকি, কাল হয়তো আরেকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান একই পরিণতির মুখে পড়বে। আমার কলম হয়তো সমুদ্রের ঢেউ থামাতে পারবে না, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি—সত্য ও বিবেকের শক্তি ইতিহাসের গতিপথ বদলাতে পারে। আসুন, আমরা এক হই। ন্যায়বিচার চাই, স্বচ্ছতা চাই—কিন্তু শিল্প ধ্বংস নয়। চট্টগ্রামের আকাশে আবার যেন ভেসে ওঠে আশার সূর্য।