চিরনিদ্রায় শায়িত এক অমলিন নাম: আইয়ুব আলীর প্রস্থান, আমাদের বিবেকের কাছে এক কঠিন প্রশ্ন-

By admin
6 Min Read

-মো. কামাল উদ্দিনঃ
রাতের শেষ প্রহর। নগরী তখন ঘুমের গভীরতায় নিমগ্ন। আলো-আঁধারের চট্টগ্রাম যেন নিজের ক্লান্ত শরীরটাকে একটু বিশ্রাম দিতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই নিস্তব্ধতার বুক চিরে এলো এক সংবাদ—চিকিৎসাধীন অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ ইন্তেকাল করেছেন সাংবাদিক মো. আইয়ুব আলী। সংবাদটি শোনার পর মনে হলো—কেবল একজন মানুষ চলে গেলেন না, আমাদের সময়ের এক নীরব নৈতিক শক্তিও নিভে গেল। আমরা যাকে নিয়ে আশাবাদী ছিলাম, যার জন্য প্রার্থনার হাত উঠেছিল—তাকে বিদায়ের দোয়া জানাতে হচ্ছে। মাটির ঘ্রাণমাখা শেকড় পটিয়ার শুভনদণ্ডী গ্রামে জন্ম নেওয়া আইয়ুব আলীর বেড়ে ওঠা ছিল গ্রামীণ বাস্তবতার ভেতর দিয়ে। সে বাস্তবতা তাকে শিখিয়েছে মানুষের কষ্ট বুঝতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, নিজেকে ছোট ভাবতে না। ছাত্রজীবনেই তিনি রাজপথের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের দিনগুলোতে তার কণ্ঠ ছিল প্রতিবাদের কণ্ঠ। তিনি রাজনীতিকে ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে নেননি; নিয়েছিলেন আদর্শের লড়াই হিসেবে। পরবর্তীকালে তিনি যুক্ত হন কে এম ওবায়দুর রহমান-এর রাজনৈতিক ধারায়। সে সময় বিএনপির ভেতরে বিভিন্ন মতধারা থাকলেও তিনি স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিলেন ওবায়দুর রহমানের আদর্শিক লাইন অনুসরণ করে। বাংলাদেশ ছাত্রদলের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির প্রথম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন ছিল তার রাজনৈতিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই সময় আমরা একসঙ্গে রাজপথে ছিলাম—আমি সাধারণ সম্পাদক, এস এম ফরিদ সভাপতি—আর আইয়ুব আলী ছিলেন সংগঠনের প্রথম সারির মুখ। জামাল খানস্থ মোহাম্মদ আলী কুসুমপুরী আলী ভাইয়ের বাসায় বসে কত রাত যে কেটেছে—আলোচনায়, বিতর্কে, স্বপ্নে! রাজনীতির ভবিষ্যৎ, সংগঠনের পথরেখা, দেশের অবস্থা সবকিছু নিয়েই কথা হতো। সেই সময়ের বন্ধন ছিল বিশ্বাসের বন্ধন। রাজনীতি থেকে সাংবাদিকতায়—এক নৈতিক যাত্রা রাজপথের অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছিল বাস্তবতা। সেই বাস্তবতার আলো নিয়েই তিনি পা রাখেন সাংবাদিকতায়। দৈনিক পূর্বকোণে এম এ হাশেম রাজুর সঙ্গে কাজের মাধ্যমে তার সংবাদজীবনের সূচনা।
তিনি কখনো উচ্চকণ্ঠ ছিলেন না। কখনো শিরোনামের জন্য উত্তেজক শব্দ ব্যবহার করেননি। কিন্তু তার লেখা ছিল দৃঢ়, তথ্যসমৃদ্ধ, ন্যায়নিষ্ঠ। চারবার নির্বাচিত হয়ে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব-এর সমাজসেবা ও আপ্যায়ন সম্পাদক হয়েছেন—এটি কেবল একটি পদ নয়, এটি সহকর্মীদের আস্থার স্বীকৃতি। বর্তমান নির্বাচিত কমিটির নির্বাহী সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন।
এছাড়া চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন-এর সাবেক প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হিসেবে সংগঠনের কার্যক্রমে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। সাংবাদিক কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটির পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। সংগঠনের সভায়, আলোচনায়, সংকটময় মুহূর্তে—তিনি ছিলেন যুক্তির পক্ষে, শালীনতার পক্ষে, ঐক্যের পক্ষে। সময়ের নির্মম বিদ্রূপ কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যে ঘটনাপ্রবাহ শুরু হলো—প্রেসক্লাব দখল, ৯৬ জন পেশাদার সাংবাদিকের সদস্যপদ বাতিল ও স্থগিত—তার ভেতর আইয়ুব আলীও ছিলেন একজন ভুক্তভোগী। অভিযোগ ছিল রাজনৈতিক পরিচয়। কিন্তু তার রাজনৈতিক জীবন তো শুরু হয়েছিল ছাত্রদলের আহ্বায়ক হিসেবে। তিনি কখনো সুবিধাবাদী ছিলেন না, ক্ষমতার পালাবদলে নিজের অবস্থান বদলাননি। সবচেয়ে বেদনাদায়ক হলো—প্রেসক্লাবের দীর্ঘদিনের রেওয়াজ অনুযায়ী কোনো সদস্য মারা গেলে ক্লাবে মরদেহ এনে শ্রদ্ধা নিবেদন ও জানাজা পড়ার সুযোগ থাকে। অথচ আইয়ুব আলী সেই সম্মান থেকেও বঞ্চিত হলেন। যে মানুষটি ক্লাবের জন্য সময় দিয়েছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন, সহকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন—তার মৃত্যুর পর ক্লাব প্রাঙ্গণে শেষবারের মতো তাকে রাখা গেল না। এ কি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত? নাকি এটি আমাদের নৈতিক পরাজয়? একজন মানুষ, যাকে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি আমার সঙ্গে তার সম্পর্ক কেবল পেশাগত ছিল না—ছিল রাজনৈতিক বন্ধুত্বের, দীর্ঘ সহযাত্রার। বহুবার আলোচনা করেছি, তর্ক করেছি, মতবিরোধ হয়েছে। কিন্তু কখনো তাকে ক্ষুদ্র স্বার্থে জড়াতে দেখিনি। কখনো ব্যক্তিগত আক্রমণে যেতে দেখিনি। তিনি ছিলেন সংযত, মার্জিত, বিনয়ী। তার হাসি ছিল প্রশান্ত। তার চোখে ছিল আত্মমর্যাদার দীপ্তি। টেলিভিশনের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন—চিৎকার না করেও দৃঢ় থাকা যায়। উত্তেজনা ছাড়াই সত্য বলা যায়। শোকের ভেতর বিবেকের ডাক আজ তার মৃত্যু আমাদের সামনে এক নির্মম আয়না তুলে ধরেছে। আমরা কি আমাদের সহকর্মীদের মর্যাদা দিতে পারছি? আমরা কি মতভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতার জায়গায় দাঁড়াতে পারছি? মৃত্যুর পর তো সব বিভাজন অর্থহীন হয়ে যায়। সেখানে থাকে শুধু মানুষ—তার জীবন, তার অবদান, তার স্মৃতি। আইয়ুব আলীকে প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে শেষবারের মতো আনা গেল না—এটি কেবল একটি ঘটনার বিবরণ নয়; এটি আমাদের পেশাগত সংস্কৃতির প্রশ্ন। আজ তার পরিবারের মানুষ কাঁদছেন—কিন্তু আমাদেরও কি অন্তর কাঁদছে না? স্মৃতির ভেতর বেঁচে থাকা মানুষ পটিয়ার শুভনদণ্ডীর মাটিতে তিনি চিরশান্তিতে শায়িত। কিন্তু তার স্মৃতি আমাদের রাজপথে, সংগঠনের সভাকক্ষে, সংবাদকক্ষের আলো-আঁধারে ঘুরে বেড়াবে। তিনি ছিলেন কলমযোদ্ধা। তিনি ছিলেন রাজনৈতিক সহযোদ্ধা। তিনি ছিলেন এক নীরব নৈতিক শক্তি। আজ তার অনুপস্থিতি আমাদের শূন্য করে দিয়েছে। কিন্তু তার জীবন আমাদের শিক্ষা দেয়—সততা শেষ পর্যন্ত হারায় না। আপস না করেও বেঁচে থাকা যায়। শেষ প্রার্থনা মহান আল্লাহ তার সব ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন। তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। শোকসন্তপ্ত পরিবারকে ধৈর্য ও শক্তি দিন। আর আমাদের সাংবাদিক সমাজকে—ঐক্য দিন, বিবেক দিন, ন্যায়বোধ দিন। যেন আমরা আর কোনো সহকর্মীকে তার প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত না করি। যেন মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের মর্যাদা রাজনীতির ঊর্ধ্বে। আইয়ুব আলী, তুমি চিরনিদ্রায় শায়িত। কিন্তু তোমার সততা, তোমার সংগ্রাম, তোমার নীরব দীপ্তি চট্টগ্রামের আকাশে দীর্ঘদিন জ্বলবে। আজ শহর নিস্তব্ধ। কিন্তু এই নিস্তব্ধতার ভেতরই আমাদের বিবেক প্রশ্ন করছে আমরা কি সত্যিই আমাদের মানুষদের মর্যাদা দিতে শিখেছি?

Share This Article
Leave a Comment