
– রাঙুনিয়া প্রতিনিধি:
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া—একসময় পাহাড়, নদী আর গ্রামীণ শান্তির জন্য পরিচিত এই উপজেলা আজ পরিণত হয়েছে কর্ণফুলী নদীর বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। নদী এখন আর শুধু প্রকৃতি নয়, শক্তি, প্রভাব, অর্থ আর আধিপত্যের সবচেয়ে বড় উৎস। আর এই আধিপত্যের হিংস্র প্রতিযোগিতায় বৃহস্পতিবার রাতে আরেকটি প্রাণ ঝরল—শ্রমিকদল নেতা আব্দুল মান্নান (৪০)। রাত ১০টায় ক্ষেত্রবাজার এলাকায় ওঁৎ পেতে থাকা সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা গুলি করে হত্যা করে এই বিদেশফেরত যুবক নেতাকে। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু ঘটে। পরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে পাঠিয়েছে। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের গল্প এত সরল নয়। এটি শুধু রাজনৈতিক হত্যা নয়; গল্পের আয়তন বিস্তৃত—পাহাড়, নদী, কোটি কোটি টাকা, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিদেশে থাকা গডফাদার, এবং স্থানীয় সন্ত্রাসী বাহিনীর গভীর কাঠামো। বিদেশ ফেরত মান্নান: রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে বালুমহালের অন্ধকার জগতে মান্নান ছিলেন সরফভাটার তিন নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। দীর্ঘদিন মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করতেন। শেখ হাসিনার পতনের পর দেশে ফিরেই আবারো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হন। তিনি সরফভাটা ইউনিয়ন শ্রমিকদলের সহ-সভাপতি হলেও তার পরিচয়ের আরেকটি দিক গোপনে বড় হয়ে ওঠে— ইসমাইল বাহিনীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা এবং বালু ব্যবসায় প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা।
স্থানীয়দের ভাষায়— “মান্নান আগে রাজনীতি করত, কিন্তু দেশে ফেরার পর সে ইসমাইলের দলে যোগ দিয়ে বালুর মহাল দখলের খেলায় নেমে পড়ে।” ইসমাইল বাহিনী ছিল কর্ণফুলী নদীজুড়ে বালু উত্তোলনের অঘোষিত নিয়ন্ত্রক শক্তি। ইসমাইল প্রথমে জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে অস্থায়ী ভিত্তিতে বালু উত্তোলনের অনুমতি পেলেও পরে আর সরকারি রাজস্ব জমা দেননি। এরপর থেকেই পুরো কার্যক্রম হয়ে যায় অবৈধ।
ইসমাইলের মূল কাজ—বালুর ঘাট দখল করে রাখা, উত্তোলন করা, অন্যদের উত্তোলন বন্ধ করা ও সিন্ডিকেটকে অটুট রাখা। এই সিন্ডিকেটে মাঠের কাজ করতেন—ইসমাইলের ভাগিনা এবং নিহত মান্নান। দু’জনই ছিলেন তার বিশ্বস্ত ক্যাডার। ৬–৭ কোটি টাকার বালুমহাল লেনদেন: কোনো হিসাব নেই- তদন্তে উঠে এসেছে ভয়াবহ তথ্য— ইসমাইল বাহিনী বালুমহাল দেখানো, ভাড়া দেওয়া ও নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার নামে বিভিন্ন ঠিকাদার এবং ব্যক্তি থেকে ৬–৭ কোটি টাকার বেশি টাকা হাতিয়ে নেয়। এই অর্থের কোনো হিসাব নেই, কোনো সরকারি রেকর্ড নেই, আর নেই কোনো কর বা ভ্যাট। এই অবৈধ অর্থের বণ্টন নিয়েই মূলত সিন্ডিকেটের ভেতর অসন্তোষ জন্মায়। এদিকে নদীর অপর প্রান্তে সেই বালুমহাল দখল চেয়েছিল আরেক শক্তিশালী পক্ষ—প্রতিপক্ষের নেতা ও তার অনুসারীরা। মান্নান: সিন্ডিকেটের মাঠের শক্তি প্রতিপক্ষের নেতা যখনই নদীতে নিজেদের ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন শুরু করতে চাইতো, তখনই বাধা হয়ে দাঁড়াতেন মান্নান। তিনি ছিলেন উদ্যমী, কখনও কখনও বেপরোয়া।
তার নেতৃত্বেই গত কয়েক মাসে— প্রতিপক্ষের একটি বড় ড্রেজার নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়,এরপর আরো দুইটি ড্রেজার গত শনিবার রাতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়, এই ড্রেজারগুলোর মালিক ছিলেন প্রতিপক্ষের নেতার ঘনিষ্ঠজন।
প্রথম ড্রেজার ডুবানোর পর প্রতিপক্ষের নেতা মান্নানকে সতর্ক করেছিলেন—
“আর ড্রেজারে হাত দিও না।”
কিন্তু সতর্কতা উপেক্ষা করে মান্নান আরও দুঃসাহসী হয়ে ওঠেন। ইসমাইল বাহিনীর শক্তিতে ভর করে চ্যালেঞ্জ করেন প্রতিপক্ষের ব্যবসা। এতে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায় যে—
প্রতিপক্ষের নেতা দুইটি পথের মধ্যে নির্বাচন করতে বাধ্য হন: পুরো ব্যবসা হারানো, মান্নানকে সরিয়ে দেওয়া,হত্যার সিদ্ধান্তের অদৃশ্য নির্দেশ -প্রতিপক্ষের নেতা ক্ষমতাধর হলেও একা সিদ্ধান্ত নেননি। এখানে রয়েছে আরও অদৃশ্য একটি হাত— সৌদি আরবে বসে নিয়ন্ত্রণ করা প্রবাসী ফজল হক। স্থানীয় সূত্রের দাবি— তিনি বহু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। ইসমাইল বাহিনী তার প্রত্যক্ষ নির্দেশে চলে। মান্নানের মতো কর্মীদের মাঠে নামাতেন তিনিই। ফজল হকের নির্দেশে ইসমাইল ও তার গ্রুপ প্রতিপক্ষের নেতাকে দমিয়ে রাখছিল। এই শক্তিমত্তাই মান্নানকে আরও বেপরোয়া করেছিল। প্রতিপক্ষের নেতা একাধিকবার মান্নানকে সতর্ক করলেও, ইসমাইল ও ফজল হক তাকে আগ্রাসী রেখেছিলেন। হত্যার রাত: অন্ধকারে লুকানো প্রতিশোধের দল বৃহস্পতিবার রাত ১০টা—ক্ষেত্রবাজার এলাকা স্বাভাবিক দেখালেও। মোটরসাইকেলে করে শিলক যাওয়ার পথে মান্নান বুঝতেই পারেননি তার ওপর নজর রাখছিলো সশস্ত্র দলটি।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন— তিনজন সশস্ত্র ব্যক্তি আগে থেকেই লুকিয়ে ছিল মান্নান কাছে এলেই তারা আকস্মিকভাবে সামনে এসে দাঁড়ায়,তাকে লক্ষ্য করে একাধিক গুলি ছোড়া হয়, মান্নান মাটিতে লুটিয়ে পড়তেই ঘাতকেরা পালিয়ে যায় নদীপথে,ঘটনাস্থলে রক্তাক্ত দেহটি দেখেই স্থানীয়রা বুঝে যায়—
এটি সাধারণ রাজনৈতিক খুন নয়, এটি বালুমহাল যুদ্ধের পরিকল্পিত প্রতিশোধ।
বালুমহাল যুদ্ধের পূর্ব ইতিহাস মাত্র কয়েক মাস আগে একই বালুমহাল নিয়ে নিহত হন— আব্দুল হাকিম, যিনি ছিলেন গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী। হত্যাকাণ্ড কি শেষ? নাকি নতুন রক্তঝড়ের শুরু?
গোপন সূত্রে জানা গেছে— ইসমাইল বাহিনী প্রতিশোধ নেবে, প্রতিপক্ষের নেতা ও তার অনুসারীরা আরও শক্ত হবে, ফজল হক বিদেশ থেকে আরও লোক নামাতে পারেন,নদীঘাট ও বালুমহাল আবারও অশান্ত হবে,যেকোনো সময় আরেকটি হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে,কর্ণফুলী নদীকে কেন্দ্র করে রাঙ্গুনিয়া আজ এক পূর্ণাঙ্গ ‘ক্রাইম জোন’ এ পরিণত হয়েছে। প্রশাসন কার্যত অসহায়। রাজনীতি নীরব। স্থানীয় জনতা আতঙ্কে। আর বালুমহাল সিন্ডিকেটগুলো কোটি টাকার জন্য একের পর এক মানুষ মারছে। যে নদী একদিন চট্টগ্রামের প্রাণ ছিল—আজ সেই নদীই হয়ে উঠেছে রক্ত, অর্থ, অস্ত্র ও সন্ত্রাসের নতুন যুদ্ধক্ষেত্র। এই নিউজটি সম্পূর্ণ ফ্রন্টপেজ-নিউজ আকারে প্রস্তুত, যেখানে সমস্ত চরিত্র, সিন্ডিকেটের কাঠামো, আর সংঘাতের পটভূমি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।