চট্টগ্রামের চালিয়াতলীতে রক্তাক্ত শুটআউট: টার্গেট ছিল সরোয়ার হোসেন বাবলা, গুলিবিদ্ধ বিএনপি নেতা এরশাদ উল্লাহ

By admin
5 Min Read

— মো. কামাল উদ্দিন
চট্টগ্রাম মহানগরের বায়েজিদের চালিয়াতলীতে বুধবার (৫ নভেম্বর) বিকেলে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ শুটআউটে মূল টার্গেট ছিলেন না বিএনপি নেতা এরশাদ উল্লাহ, বরং গুলিবর্ষণের আসল লক্ষ্যবস্তু ছিলেন চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেন বাবলা। দীর্ঘদিন ধরে তার বিরুদ্ধে হত্যার পরিকল্পনা চলছিল বলে গোপন সূত্রে জানা গেছে।
এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে বহু বছরের পুরোনো শত্রুতা, প্রতিশোধ আর আধিপত্যের রক্তাক্ত প্রতিযোগিতা। চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডে একসময় সমান প্রভাব বিস্তার করতেন সরোয়ার বাবলা ও “ছোট সাজ্জাদ” নামের এক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। দুজনেরই রয়েছে বিশাল অনুসারী গোষ্ঠী, অস্ত্র ও অর্থবল। একসময় তারা একই গ্রুপে থাকলেও পরবর্তীতে এলাকা দখল ও মাদক-চাঁদাবাজি বাণিজ্যের ভাগাভাগি নিয়ে তাদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ শুরু হয়। সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাই এখন প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে।
বিশেষ সূত্র জানায়, কয়েক মাস আগে ঢাকায় পুলিশের হাতে ছোট সাজ্জাদ গ্রেফতার হয়। তার গ্রেফতারের পেছনে সরোয়ার বাবলার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল—এমন তথ্য পুলিশি জেরাতেই প্রকাশ পায়। এরপর থেকেই সাজ্জাদের সহযোগীরা বাবলার বিরুদ্ধে হত্যার পরোয়ানা জারি করে। সাজ্জাদের গ্রুপ একাধিকবার বাবলাকে হত্যার চেষ্টা চালায়, কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হয়।
বাবলা সম্প্রতি রাজনীতির ছত্রছায়ায় আশ্রয় নেন। তিনি চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহর ঘনিষ্ঠ হিসেবে সক্রিয় হতে থাকেন এবং চান্দগাঁও-বাকলিয়া এলাকায় তার গণসংযোগ কর্মসূচিতে নিয়মিত অংশ নেন। কিন্তু বাবলার পেছনে যে মৃত্যুর ছায়া ঘনিয়ে আসছে, তা হয়তো এরশাদ উল্লাহ পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেননি।
বুধবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে চালিয়াতলীর ক্যাম্পিং এলাকায় এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনী গণসংযোগ চলাকালে হঠাৎই একদল অজ্ঞাতনামা অস্ত্রধারী মোটরসাইকেলে এসে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গুলির মূল লক্ষ্য ছিল সরোয়ার বাবলা। কিন্তু পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা এরশাদ উল্লাহ বুকে ও হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। চারদিক রক্তে ভেসে যায়, মুহূর্তেই এলাকা পরিণত হয় আতঙ্কের নগরীতে।
গুলিবিদ্ধ অবস্থায় এরশাদ উল্লাহকে দ্রুত এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়, তার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। সরোয়ার হোসেন বাবলাও গুরুতর আহত হন। তার মৃত্যু হয়েছে—এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লেও এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি বা নির্ভরযোগ্য সূত্র তা নিশ্চিত করেনি।
স্থানীয়দের মতে, এটি কোনো রাজনৈতিক হামলা নয়, বরং চট্টগ্রামের পুরনো গ্যাং-দ্বন্দ্বের ধারাবাহিকতায় সংঘটিত একটি হত্যাচেষ্টা। ছোট সাজ্জাদ ও সরোয়ার বাবলার মধ্যে বহু বছরের রক্তের হিসাব মেটাতে সাজ্জাদপন্থিরাই এই হামলার পেছনে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, “এটি সুপরিকল্পিত হত্যার অপারেশন ছিল। এরশাদ উল্লাহ কেবল ভুল জায়গায়, ভুল সময়টিতে উপস্থিত ছিলেন। বাবলাকে ঘিরে এই দ্বন্দ্ব বহুদিনের, আর তার রাজনৈতিক মঞ্চে ওঠা সেই সংঘাতকে আরও তীব্র করে তুলেছিল।”
চট্টগ্রাম পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “আমরা ঘটনাটি রাজনৈতিক নয়, বরং ব্যক্তিগত প্রতিশোধ ও গ্যাং সংঘর্ষ হিসেবে তদন্ত করছি। বাবলার অতীত রেকর্ড এবং সাজ্জাদের সঙ্গে তার বিরোধের দিকটিও গুরুত্ব পাচ্ছে।”
এদিকে স্থানীয়দের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তারা আশঙ্কা করছেন, এই ঘটনার জেরে নতুন করে প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। এলাকাবাসীর এক প্রবীণ ব্যক্তি বলেন,
“চান্দগাঁও-বায়েজিদ এলাকায় গ্যাং কালচার এখন এক দানবের মতো দাঁড়িয়ে গেছে। রাজনীতির ছায়ায় এই সন্ত্রাসীরা আশ্রয় নিচ্ছে, আর নিরীহ মানুষ বলি হচ্ছে।”
চট্টগ্রামের এই রক্তাক্ত ঘটনার পর এখন প্রশ্ন একটাই—
এ শহরে রাজনীতি আর গ্যাং যুদ্ধের সীমারেখা কোথায়?
আর কতজন মানুষ এমন দ্বন্দ্বের বলি হয়ে পড়বে, যেখানে রাজনীতি নয়, বেঁচে থাকাই যেন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ?
আরো জানাযায়-ছোট সাজ্জাদ কয়েকদিন আগেই কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছে।
মুক্তির পর থেকেই সে সরোয়ার হোসেন বাবলার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব আর বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে সাজ্জাদ মনে করেছিল—বাবলাই তার গ্রেপ্তারের মূল কারিগর। ফলে মুক্তির পরপরই সে গোপনে বাবলাকে হত্যার পরিকল্পনা শুরু করে।
গোপন সূত্রে জানা গেছে, সাজ্জাদের নেতৃত্বে থাকা একটি গ্রুপ গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বাবলার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল। সুবিধাজনক সময়ের অপেক্ষায় ছিল তারা। অবশেষে বুধবার (৫ নভেম্বর) বিকেলে চালিয়াতলীতে সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটে।
যদিও হামলার মূল টার্গেট ছিলেন সরোয়ার বাবলা, কিন্তু বেপরোয়া গুলিতে বিএনপি নেতা এরশাদ উল্লাহ গুরুতর আহত হন। ফলে এই রক্তাক্ত শুটআউটের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা গ্যাং দ্বন্দ্ব নতুন করে চট্টগ্রামের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।এই প্রতিবেদনটি আমাদের বিশেষ প্রতিনিধি জামাল উদ্দিন ও জি. সানের সরেজমিন অনুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। তারা ঘটনাস্থল চালিয়াতলী এবং এভারকেয়ার হাসপাতাল—উভয় স্থানেই গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী, স্থানীয় সূত্র ও চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। তাদের সংগৃহীত নির্ভরযোগ্য তথ্য ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই এই সংবাদটি প্রণয়ন করা হয়েছে।

Share This Article
Leave a Comment