
— মো. কামাল উদ্দিন
দেশের নারী উদ্যোক্তাদের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও সম্ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক এবার নিল এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের প্রতিটি নারী উদ্যোক্তাকে সর্বোচ্চ ২৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঋণ প্রদান করবে মাত্র ৪ শতাংশ মুনাফার হারে—যা দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো—নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং উদ্যোক্তা শ্রেণিকে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করা। সম্প্রতি আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক মো. নজরুল ইসলাম সাহেবের সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বসেছিলাম এই নীতিমালার পেছনের ভাবনা ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে। সাক্ষাৎকারে উপস্থিত ছিলেন আমার দীর্ঘদিনের সহকর্মী, বাংলা টিভির সাবেক সিইও এবং দৈনিক উদ্যোক্তা ও দৈনিক পাতা পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক এইচ. সোহেল। মো. নজরুল ইসলাম সাহেব জানালেন, “নারী উদ্যোক্তারা দেশের অর্থনীতিতে এখন এক শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করছেন। কিন্তু পুঁজির অভাব, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও ব্যাংকিং জটিলতা তাদের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াত। বাংলাদেশ ব্যাংক এই বাধা দূর করতে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করেছে, যাতে তারা সহজ শর্তে ব্যবসা শুরু ও সম্প্রসারণ করতে পারেন।” তিনি আরও বলেন, “২৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঋণ যে কেউ পেতে পারেন, তবে প্রাধান্য দেওয়া হবে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের, যারা বাস্তব ব্যবসা পরিচালনা করছেন বা শুরু করার উদ্যোগ নিয়েছেন। মুনাফার হার রাখা হয়েছে মাত্র ৪ শতাংশ—যা বাজারের স্বাভাবিক হারের অর্ধেকেরও কম। এতে নারী উদ্যোক্তারা নতুন করে সাহস পাবেন।“ সাক্ষাৎকার চলাকালীন আলোচনায় উঠে আসে—এই ঋণ প্রকল্প শুধুমাত্র ব্যবসায়িক নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের এক হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করবে। কারণ, এক নারী উদ্যোক্তা সফল হলে তার মাধ্যমে পরিবারের এবং সমাজের আরও অনেক নারী অনুপ্রাণিত হন।
এইচ. সোহেল বলেন, “নারীদের জন্য এটি হবে এক ‘গেম চেঞ্জার’ উদ্যোগ। দীর্ঘদিন ধরে আমরা উদ্যোক্তা খাতে কাজ করছি—দেখেছি, মূলধন সংকটে অনেক প্রতিভাবান নারী মাঝপথে থেমে যান। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নীতিমালা তাদের নতুন প্রাণ দেবে।” বাংলাদেশ ব্যাংকের এই কর্মসূচির আওতায় ইতোমধ্যে সারাদেশের নির্দিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে, যাতে তারা নারী উদ্যোক্তাদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেয়। আবেদন প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে, জামানতের নিয়ম শিথিল করা হয়েছে এবং আবেদনকারীদের জন্য আলাদা হেল্প ডেস্কও খোলা হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের মোট উদ্যোক্তার প্রায় ২৫ শতাংশ এখন নারী। যদি এই পরিকল্পনা সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন হয়, তাহলে আগামী পাঁচ বছরে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা দ্বিগুণে পৌঁছাতে পারে, যা জাতীয় উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই মহৎ উদ্যোগ প্রমাণ করে—নারী আর শুধু ‘সহযোগী’ নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির এক সমান অংশীদার। এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে গিয়ে আমি অনুভব করেছি—দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে শহরের ব্যবসা প্রাঙ্গণ পর্যন্ত, নারী উদ্যোক্তারা এক নতুন আলোর স্বপ্ন দেখছেন।
এই উদ্যোগ তাদের সেই স্বপ্ন পূরণের পথে এক দৃঢ় পদক্ষেপ। চোখ রাখুন—বাংলাদেশ ব্যাংকের এই কর্মসূচি কীভাবে বদলে দিচ্ছে দেশের নারীর অর্থনৈতিক মানচিত্র।