–মো.কামাল উদ্দিনঃ
বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে অনেক অফিসারই আছেন, কিন্তু খুব কমজনই তাদের সততা, দক্ষতা এবং সাহসিকতার জন্য সাধারণ মানুষের মনে অটুট আস্থা ও শ্রদ্ধার জায়গা করে নিতে পেরেছেন। কক্সবাজার থানার বর্তমান অফিসার ইনচার্জ ইলিয়াস তাদেরই একজন—যিনি কর্মের মাধ্যমে, মনোভাবের দৃঢ়তায় এবং দায়িত্ববোধের অঙ্গীকারে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। কক্সবাজার সফরের সময় আমার হাতে লেখা বই “সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের কথা” ওসি ইলিয়াসকে উপহার দেই। উপহার গ্রহণের মুহূর্তেই তার চোখেমুখে ফুটে উঠল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা আর এক ধরনের স্নিগ্ধ আলো। তিনি বললেন, “আমি অনেক বই পড়তাম, এখন সময় পাই না। তবে আপনার লেখা আমার মুখস্থ। আপনার সব লেখা আমি পড়েছি।”
এই এক মুহূর্তেই বুঝলাম, একজন পুলিশ অফিসারের ভেতর জ্ঞানের প্রতি কী গভীর শ্রদ্ধা আর মানুষের প্রতি কী অটুট ভালোবাসা লুকিয়ে আছে। ছবি তোলার বিষয়ে সাধারণত তিনি কঠোরভাবে না বলেন, কিন্তু আমাকে নিজে থেকে বললেন— “কামাল ভাই, আমি কাউকে নিয়ে ছবি তুলি না। তবে আপনার সাথে ছবি তুলব। কারণ আপনি শুধু সাংবাদিক নন, লেখক, গবেষক, উপস্থাপকও।” এই কথাগুলো প্রকাশ করে তার অন্তরের মানবিকতা এবং বেছে নেওয়ার ক্ষমতা। ওসি ইলিয়াসের দীর্ঘ পুলিশি জীবনের কথা যদি বলা যায়, তবে তা হবে একেকটি সাহস ও সফলতার অধ্যায়। চট্টগ্রামে ডিভিশনাল সিআইডি, পিবিআইসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা শাখায় তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন বহু বছর। অসংখ্য আলোচিত মামলার রহস্য উদঘাটন করেছেন বুদ্ধিমত্তা, ধৈর্য এবং অপরিসীম দক্ষতার সাথে। বিশেষ করে জোড়া খুনসহ একাধিক সিরিয়াল খুনের মামলার তদন্তে তার গোয়েন্দা মেধা প্রমাণ করেছে—সত্যকে লুকানো যায় না, যদি ইলিয়াসের মতো অফিসার দায়িত্বে থাকেন। জটিল মামলার আসল আসামিকে চিহ্নিত করা এবং অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচন করার ক্ষেত্রে তিনি এক অনন্য সাফল্যের অধিকারী।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এই সাফল্যের কোনোটিই তিনি প্রচারের জন্য ব্যবহার করেননি। বরং নীরবে কাজ করেছেন, দায়িত্বকে পবিত্রতার সাথে পালন করেছেন।
নিজের কথাতেই স্পষ্ট করেছেন তিনি—
“আমার ওসিগিরি করার সখ নেই। আমি রহস্য উদঘাটন করতে ভালোবাসি, ঘটনার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সত্যকে বের করতে চাই। তবে যখন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তখন তা সর্বোচ্চ সততার সাথে পালন করব।” এই বক্তব্যে প্রতিফলিত হয় একজন প্রকৃত পুলিশ অফিসারের অন্তর্গত দর্শন। থানার সাধারণ দায়িত্ব পালন তার কাছে হয়তো কখনো একঘেয়ে মনে হতে পারে, কিন্তু মানুষের জন্য সত্য প্রতিষ্ঠার যে আবেগ, সেটিই তাকে বারবার নতুন করে প্রেরণা জোগায়। কক্সবাজার থানা নিঃসন্দেহে দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ থানা। প্রতিদিন হাজারো পর্যটকের আনাগোনা, সমুদ্র সৈকতের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক সংস্থার নজরদারি—সব মিলিয়ে এখানে দায়িত্ব পালন সত্যিই কঠিন। তবুও ওসি ইলিয়াস এই থানাকে করে তুলেছেন দুর্নীতিমুক্ত, অনিয়মমুক্ত ও স্বজনপ্রীতিমুক্ত একটি উদাহরণ। সাধারণত থানার ভেতরে সিসি ক্যামেরা থাকলেও ওসির কক্ষে থাকে না। কিন্তু কক্সবাজার থানার ওসি কক্ষের ছাদে বসানো আছে সিসি ক্যামেরা। তিনি নিজেই বললেন—“আমার কক্ষে যেন কেউ কখনো প্রশ্ন তুলতে না পারে। দুর্নীতি বা অনিয়মের কোনো সুযোগ আমি রাখতে চাই না।” এই দৃশ্য শুধু কক্সবাজার থানা নয়, পুরো দেশের পুলিশ বাহিনীর জন্য এক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকতে পারে। স্থানীয় মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, ওসি ইলিয়াসের সততা, ন্যায়ের প্রতি অঙ্গীকার ও সাহসিকতা নিয়ে তাদের কোনো সন্দেহ নেই। তিনি একদিকে যেমন অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের কাছে আস্থার প্রতীক। তার নিজের বক্তব্যই যেন তার জীবনদর্শনকে প্রকাশ করে— “আমি মনেপ্রাণে দেশপ্রেমিক পুলিশ। দায়িত্বকে আমি শুধু চাকরি হিসেবে দেখি না, এটি আমার অঙ্গীকার।” আজ যখন কিছু মানুষ অপপ্রচার চালিয়ে পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে, তখন ইলিয়াসের মতো অফিসাররা প্রমাণ করছেন—পুলিশ মানেই শুধু কঠোরতা নয়, বরং ন্যায়, মানবিকতা এবং দেশপ্রেমের সমন্বিত প্রতীক। ওসি ইলিয়াসের মতো কর্মকর্তা যতদিন থাকবেন, ততদিন সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে পারবে— সত্যকে লুকানো যায় না, সততাকে পরাজিত করা যায় না, আর দেশপ্রেমিক পুলিশই পারে জাতির আস্থা ফিরিয়ে আনতে। কক্সবাজার থানার ওসি ইলিয়াস কেবল একজন পুলিশ অফিসার নন, তিনি এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সততা, বুদ্ধিমত্তা, ন্যায়বোধ এবং মানবিকতার সমন্বয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন এক আলোকবর্তিকা—যিনি প্রমাণ করছেন, সঠিক দায়িত্ববোধ থাকলে একজন পুলিশ অফিসারও মানুষের ভালোবাসা ও আস্থার প্রতীক হতে পারেন। ওসি ইলিয়াস—বাংলাদেশ পুলিশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, কক্সবাজার থানার এক অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত।