“অপ-সাংবাদিকতার বিষবাষ্পে নিঃশেষ হচ্ছে সত্য—জাগো, এখনই সময় সতর্ক হওয়ার!

4 Min Read

—মো. কামাল উদ্দিনঃ
সাংবাদিকতা এক সময় ছিল গণমানুষের ভরসার জায়গা—একটি পবিত্র দায়িত্ব যেখানে সত্য, নিরপেক্ষতা ও মানবিকতা ছিল মূল ভিত্তি। সাংবাদিকরা ছিলেন সমাজের আয়না—যারা সত্য তুলে ধরতেন, ক্ষমতাধরদের প্রশ্ন করতেন, নিপীড়িতের পক্ষে কথা বলতেন। কিন্তু আজ, আমরা এক ভয়াবহ পরিবর্তনের মুখোমুখি। সাংবাদিকতার সেই পবিত্র ভূমি আজ কলুষিত হয়েছে। একে বলা হচ্ছে “অপ-সাংবাদিকতা”—যেখানে মিথ্যা, গুজব, চরিত্র হনন, বিকৃত তথ্য ও অশ্লীলতা বিক্রি হচ্ছে সংবাদ নামে।
এই চিত্রটি—যেটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় আমাদের সময়ের ভয়াবহ এক বাস্তবতা—তাতে দেখা যায়, এক দুর্বৃত্ত ব্যক্তি মুখ ঢাকা, কালো পোশাকে কলম হাতে সংবাদ লিখছে। পাশে ঝুলছে টাকার থলি। তাঁর উদ্দেশ্য একটাই: মিথ্যা লিখে ক্ষমতাবানদের খুশি করা, সত্যকে হত্যা করা, আর সাংবাদিকতার আদর্শকে কফিনে ঢুকিয়ে দেওয়া।
চিত্রে আরও দেখা যায় একজন সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিক—যিনি কানে ও নাকে হাত দিয়ে কষ্টে, লজ্জায়, ঘৃণায় মুখ ঢেকে বসে আছেন। তাঁর সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে মিথ্যা খবরের শিরোনাম: False, Propaganda, Defamation। আর মাটিতে পড়ে আছে এক রক্তাক্ত মৃতদেহ—যার গায়ে মোড়ানো কাপড়ে লেখা রয়েছে: TRUTH (সত্য)। অর্থাৎ সত্যকে হত্যা করা হয়েছে—ক্লিক, ভিউ, প্রচারণা আর টাকার কাছে।
আজকের ডিজিটাল যুগে ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক, নিউজ পোর্টাল—এসব জায়গায় প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে হাজারো ভুয়া ভিডিও, মিথ্যা সংবাদ, বিকৃত তথ্য। ‘ভিউ’ বাড়ানোর নেশায় কিছু তথাকথিত “অনলাইন সাংবাদিক” অথবা ইউটিউবার একে পেশা নয়, ব্যবসা বানিয়ে ফেলেছে। তারা মানুষের ব্যক্তিগত জীবন টেনে এনে “ব্রেকিং নিউজ” বানায়, ঘটনার অর্ধেক সত্য জেনে পুরো সমাজে গুজব ছড়িয়ে দেয়। তাদের কাছে সংবাদ মানে উত্তেজনা, বিভ্রান্তি আর অর্থ।
এই অপ-সাংবাদিকতার শিকারে পরিণত হচ্ছেন নিরীহ মানুষ, সৎ রাজনীতিবিদ, মানবাধিকারকর্মী, শিক্ষাবিদ এমনকি প্রকৃত সাংবাদিকরাও। মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে কারো মান-ইজ্জত ধ্বংস করে দেওয়া হয়, আবার কোনো অপরাধীকে নায়ক বানিয়ে তুলে ধরা হয়—শুধু টাকার বিনিময়ে। ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এই অপকর্মের পেছনে অনেক সময় রাজনীতি, প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ জড়িত থাকে।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে—এই দানবকে থামাবে কে?
প্রথমে সচেতন হতে হবে আমাদের, সাধারণ পাঠক ও দর্শককে।
আমরা যেন যাচাই না করে কোনো খবর বিশ্বাস না করি। আমরা যেন প্রশ্ন করি—এটা সত্য কিনা? উৎসটি কতটা নির্ভরযোগ্য?
দ্বিতীয়ত, তরুণ ও বিবেকবান সাংবাদিকদের সামনে আসতে হবে।
তারা যেন নির্ভিকভাবে সত্যের পক্ষে কলম ধরেন, ক্যামেরা চালান এবং নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন করেন। তারা যেন অপপ্রচারকারীদের মুখোশ উন্মোচন করেন।
তৃতীয়ত, রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে।
যারা ভুয়া নিউজ ছড়ায়, মিথ্যা ভিডিও বানায়, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে—তবে সেটা যেন সত্যবাদী সাংবাদিকদের দমন করার অস্ত্র না হয়। রাষ্ট্রের কাজ হবে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা রক্ষা, কিন্তু অপ-সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়া।
আমরা যদি এখনই সচেতন না হই, যদি অপ-সাংবাদিকতার এই বিষবাষ্পকে থামাতে না পারি, তাহলে সমাজে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। সত্য হারিয়ে যাবে, মানুষ বিভ্রান্ত হবে, এবং সমাজ হয়ে উঠবে এক বিপন্ন অরণ্য—যেখানে শুধু মিথ্যার গর্জন শুনতে পাওয়া যাবে।
আমরা চাই, সাংবাদিকতা আবার ফিরে পাক তার আসল গৌরব—সত্য, সাহস ও ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে।
আমরা চাই, যে ‘সত্য’ আজ রক্তাক্ত হয়ে পড়ে আছে, সে আবার উঠে দাঁড়াক—শক্ত মেরুদণ্ড নিয়ে।
আমরা চাই, যে ‘সাংবাদিক’ আজ কানে মুখে হাত দিয়ে বসে আছেন, তিনি আবার কলম হাতে তুলে নিন—প্রতিবাদের জন্য, সত্যের জন্য।
জাগো সাংবাদিক, জাগো পাঠক, জাগো সমাজ—এই অপ-সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে এখনই সময় জেগে ওঠার।

Share This Article
Leave a Comment