“আল্লাহর প্রেমে এক অন্যরকম মানুষ! চেরাগি পাহাড়ের স্মৃতিবিজড়িত আস্তানায় হযরত সুলতান শাহর বড় শাহজাদা নাসির উদ্দিন শাহের সান্নিধ্যে এক অবিস্মরণীয় রাত-

0
34

-বাহ্যিক পরিচয়ের আড়ালে এক ভিন্ন জীবনদর্শন, আধ্যাত্মিক কথামালা, আল্লাহর প্রতি গভীর অনুরাগ এবং চট্টগ্রামের প্রাচীন সাধনভূমির স্মৃতির খোঁজে আমার এক ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা।
মানুষের জীবন বড় বিচিত্র। এই পৃথিবীতে কত মানুষের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়, কত মানুষের সঙ্গে কথা হয়, কত পরিচয় তৈরি হয়। কিন্তু সব সাক্ষাৎ স্মৃতির পাতায় সমানভাবে জায়গা করে নিতে পারে না। কিছু কিছু মানুষের সান্নিধ্য আমাদের ভাবনার জগতে নতুন জানালা খুলে দেয়। তাঁদের কথা, জীবনযাপন, বিশ্বাস ও ব্যতিক্রমী দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের পরিচিত পৃথিবীকে নতুন করে দেখতে শেখায়। কখনো কখনো একটি আকস্মিক সাক্ষাৎও হয়ে ওঠে দীর্ঘ সময় ধরে ভাবনার খোরাক।
গত রাতে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী চেরাগি পাহাড়সংলগ্ন একটি স্মৃতিবিজড়িত আস্তানায় আমার জীবনে তেমনই এক ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা হলো। আমার সঙ্গে ছিলেন আমার আপন মানুষ আজাদ এবং লিটু সূত্রধর। আমরা গিয়েছিলাম হযরত সুলতান শাহের স্মৃতিধন্য আস্তানায়, তাঁর ছোট শাহজাদা মহিউদ্দিন শাহের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। কিন্তু সেখানে গিয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে দেখা পেয়ে গেলাম হযরত সুলতান শাহের বড় শাহজাদা নাসির উদ্দিন শাহের।
সেই আকস্মিক সাক্ষাৎ আমাদের রাতটিকে অন্যরকম করে তুলল। একসময় আমরা তাঁর পাশে বসে রইলাম, শুনতে থাকলাম তাঁর কথামালা, বোঝার চেষ্টা করলাম তাঁর চিন্তার জগৎ। আর আমার মনে বারবার একটি প্রশ্ন জেগে উঠল—মানুষের প্রকৃত পরিচয় কি কেবল তার বাহ্যিক অবয়ব, পোশাক কিংবা সামাজিক অবস্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ?
প্রথম দর্শনে সাধারণ, কথার জগতে ব্যতিক্রমী
নাসির উদ্দিন শাহকে প্রথম দেখলে হয়তো অনেকে তাঁকে পথচলা একজন সাধারণ, উদাসীন মানুষের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলতে পারেন। তাঁর বাহ্যিক অবয়বে প্রচলিত সামাজিক আভিজাত্যের বিশেষ কোনো প্রকাশ চোখে পড়ে না। কিন্তু একজন মানুষকে কেবল প্রথম দর্শনের ভিত্তিতে বিচার করা কতটা যুক্তিসংগত?
তাঁর পাশে কিছুক্ষণ বসার পর বুঝতে চেষ্টা করলাম, তিনি নিজের মতো করে একটি ভিন্ন জগতে বিচরণ করেন। তাঁর কথার মধ্যে কখনো ধর্মীয় ভাবনা, কখনো আধ্যাত্মিক উপলব্ধি, কখনো গানের সুর, কখনো গজলের শব্দ, আবার কখনো ইংরেজি শব্দের ব্যতিক্রমী উচ্চারণ উঠে আসছিল। কথার গতি ও প্রকাশভঙ্গি ছিল প্রচলিত আলাপচারিতার চেয়ে আলাদা। তাঁর সব কথার অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারিনি। কিছু বক্তব্যের তাৎপর্য উপলব্ধি করার জন্য আরও মনোযোগ দিয়ে শোনার প্রয়োজন অনুভব করেছি।
আমি একজন লেখক, সাংবাদিক ও গবেষক হিসেবে বহু মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। সমাজের নানা স্তরের মানুষের জীবন, অভিজ্ঞতা, চিন্তা ও সংগ্রাম জানার সুযোগ পেয়েছি। তবু আমি বিশ্বাস করি, মানুষের জীবন সম্পর্কে জানার কোনো শেষ নেই। প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই থাকে এমন কিছু অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও বিশ্বাস, যা দূর থেকে দেখে বোঝা যায় না।
নাসির উদ্দিন শাহের সঙ্গে সেই রাতের কথোপকথন আমাকে আবারও মনে করিয়ে দিল, মানুষকে বুঝতে হলে তার পাশে বসতে হয়, তার কথা শুনতে হয়, প্রশ্নের চেয়ে কখনো কখনো মনোযোগকে বড় করে তুলতে হয়।
আমার আপন মানুষ আজাদ এবং লিটু সূত্রধরও সেই পরিবেশে উপস্থিত ছিলেন। আমরা প্রত্যেকে নিজেদের মতো করে তাঁর কথাগুলো উপলব্ধি করার চেষ্টা করছিলাম। সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, আমরা শুধু একজন মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করছি না; বরং পরিচিত জাগতিক জীবন থেকে কিছুটা দূরে সরে মানুষের বিশ্বাস, আত্মিক আকাঙ্ক্ষা ও জীবনদর্শন নিয়ে ভাবার একটি সুযোগ পেয়েছি।
দুনিয়ার মোহ নয়, আল্লাহর নৈকট্য লাভের আকাঙ্ক্ষা
নাসির উদ্দিন শাহের কথার মধ্যে যে বিষয়টি বারবার ফিরে এসেছে, তা হলো মহান আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা এবং তাঁর নৈকট্য লাভের আকাঙ্ক্ষা।
অর্থ, সম্পদ, বাড়ি, গাড়ি, সামাজিক প্রতিষ্ঠা কিংবা জাগতিক সাফল্যের হিসাব তাঁর কথার কেন্দ্রে ছিল না। বরং তিনি বারবার আল্লাহর পথে চলা, নিজের কর্মের জন্য জবাবদিহি করা এবং জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য উপলব্ধি করার প্রসঙ্গ তুলছিলেন। তাঁর কথায় প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার বিষয়টিও উঠে আসে।
তাঁকে দেখে এবং তাঁর কথা শুনে আমার মনে হয়েছে, তিনি প্রচলিত জাগতিক আকাঙ্ক্ষার চেয়ে আধ্যাত্মিক বিশ্বাসকে বেশি গুরুত্ব দেন। তবে তাঁর অন্তর্জগতের সম্পূর্ণ পরিচয় জানার দাবি আমি করি না। একজন মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও জীবনদর্শনকে যথাযথভাবে বুঝতে সময়, পর্যবেক্ষণ এবং তাঁর নিজের বক্তব্য সম্পর্কে আরও জানার প্রয়োজন রয়েছে।
তবু তাঁর কথার মধ্যে একটি বিশেষ আবেদন অনুভব করেছি। সেটি হলো, পৃথিবীতে মানুষ যত ক্ষমতাবানই হোক, যত অর্থের মালিকই হোক, শেষ পর্যন্ত তাকে নিজের কাজের নৈতিক পরিণতি নিয়ে ভাবতে হবে।
মানুষ অন্য মানুষের চোখে ধুলো দিতে পারে, নিজের ভুল আড়াল করতে পারে, ক্ষমতা ও প্রভাবের আশ্রয়ে অনেক কিছু ঢেকে রাখতে পারে। কিন্তু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মহান আল্লাহর কাছে মানুষের কোনো কাজই গোপন নয়। এই বিশ্বাস যদি মানুষের মনে সত্যিকারের দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করে, তবে সে অন্যায় থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করবে, মানুষের অধিকারকে সম্মান করবে এবং নিজের বিবেকের কাছে সৎ থাকার সাহস পাবে।
আমার কাছে নাসির উদ্দিন শাহের কথামালার এই দিকটি বিশেষভাবে ভাবনার জন্ম দিয়েছে।
সত্য, ন্যায় ও মানবতার প্রশ্নে তাঁর কথামালা
সেই রাতের কথোপকথনে তিনি দুনিয়ার নানা বিষয়, মানুষের আচরণ, ন্যায়-অন্যায়, মিথ্যা এবং মানবিকতার প্রসঙ্গ তুলে ধরছিলেন। তাঁর বক্তব্যের সব শব্দ ও বাক্যের তাৎপর্য আমার কাছে পরিষ্কার হয়নি। কখনো তাঁর কথার মধ্যে গানের সুরের মতো প্রকাশভঙ্গি, কখনো গজলের আবহ, কখনো ইংরেজি শব্দের ব্যবহার লক্ষ করেছি। তাঁর কথাগুলো বুঝতে গিয়ে উপলব্ধি করেছি, কোনো মানুষের বক্তব্য মন দিয়ে শোনা এবং তার প্রতিটি বক্তব্যের অর্থ অনুধাবন করা এক বিষয় নয়।
কিন্তু তাঁর কথার যে মূল সুরটি আমার কাছে ধরা পড়েছে, তা হলো—মানুষকে সৎ হতে হবে, অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না এবং নিজের কাজের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি জানি, সমাজের অন্যায়, অনিয়ম ও অসংগতির বিরুদ্ধে কথা বলা সহজ নয়। কখনো সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, কখনো মানুষের স্বার্থের সংঘাত সামনে আসে। তবু সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা একজন সাংবাদিকের গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক দায়িত্ব।
সেই জায়গা থেকে নাসির উদ্দিন শাহের ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি সম্পর্কিত কথাগুলো আমার চিন্তার সঙ্গে একটি মানবিক যোগসূত্র তৈরি করেছে। ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে নৈতিক দায়িত্ববোধের সম্পর্ক কতটা গভীর হতে পারে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ পেয়েছি।
আমার বিশ্বাস, ধর্মীয় অনুরাগের সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ তখনই ঘটে, যখন তা মানুষের মধ্যে সততা, দয়া, সংযম, সহমর্মিতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মানসিকতা তৈরি করে। আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালনও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
পিতার আধ্যাত্মিক স্মৃতি ও এক ব্যতিক্রমী বিশ্বাস
কথোপকথনের একপর্যায়ে নাসির উদ্দিন শাহ তাঁর পিতা হযরত সুলতান শাহের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা সম্পর্কে নিজের বিশ্বাসের কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর পিতার সঙ্গে আল্লাহর সরাসরি কথোপকথন হওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল। তিনি আরও বলেন, আল্লাহর কোনো নিবেদিতপ্রাণ বান্দা আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করলে আল্লাহ তাঁর প্রার্থনার জবাব দেন।
এগুলো তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধির বর্ণনা। এমন অভিজ্ঞতার সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো তথ্য আমার হাতে নেই। তবে একজন মানুষ তাঁর পিতা, পারিবারিক ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাসকে কীভাবে ধারণ করেন, তা জানার ক্ষেত্রে তাঁর বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রসঙ্গে আমার মনে হয়েছে, আমাদের সমাজে বহু সাধক, দরবেশ ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে ঘিরে পারিবারিক স্মৃতি, স্থানীয় জনশ্রুতি এবং ভক্তদের নানা অভিজ্ঞতা প্রচলিত রয়েছে। এসবের মধ্যে কিছু বিষয় ইতিহাসের দলিল দিয়ে যাচাই করা সম্ভব, আবার কিছু বিষয় মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের পরিসরে থেকে যায়।
বিশ্বাসকে সম্মান করা এবং যাচাইযোগ্য তথ্যকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করা—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি মনে করি, আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য নিয়ে লেখার ক্ষেত্রেও এই ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন।
চেরাগি পাহাড়: ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাধনস্মৃতির এক পুরোনো ঠিকানা


চট্টগ্রামের চেরাগি পাহাড় কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান নয়; শহরের ইতিহাস, সংস্কৃতি, সাহিত্য, সংবাদপত্র ও নানা ঐতিহ্যের সঙ্গে এই এলাকার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। দৈনিক আজাদী কার্যালয়ের পেছনে রাজা পুকুর লেইনসংলগ্ন যে আস্তানায় আমরা বসেছিলাম, সেটিও স্থানীয় স্মৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত একটি স্থান।
স্থানীয়ভাবে প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, হযরত বদর শাহ বা বদর আউলিয়ার সাধনাস্মৃতির সঙ্গে চেরাগি পাহাড় অঞ্চলের সম্পর্ক রয়েছে। বদরপাট্টিতে অবস্থিত বদর আউলিয়ার মাজার চট্টগ্রামের ধর্মীয় ঐতিহ্যের একটি পরিচিত নিদর্শন। তাঁকে ঘিরে প্রচলিত কাহিনি ও স্থানীয় স্মৃতির মধ্যে চট্টগ্রামের অতীতের নানা অধ্যায় মিশে আছে।
আমরা যে আস্তানায় সময় কাটিয়েছি, সেই স্থানকেও স্থানীয় ঐতিহ্যে হযরত বদর শাহের স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বর্ণনা করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় হযরত সুলতান শাহের আস্তানা, তাঁর পারিবারিক স্মৃতি এবং আধ্যাত্মিক সাধনার কথাও উঠে আসে।
এই স্থানগুলোর ইতিহাস আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। পুরোনো দলিল, স্থানীয় প্রবীণদের সাক্ষাৎকার, পারিবারিক স্মৃতিচারণ, মাজার ও আস্তানার সংরক্ষিত নিদর্শন এবং নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্র একত্র করা গেলে চট্টগ্রামের আধ্যাত্মিক ইতিহাসের একটি মূল্যবান চিত্র তৈরি হতে পারে।
আমার মনে হয়েছে, এসব স্মৃতিচিহ্ন শুধু কোনো পরিবারের সম্পদ নয়; এগুলো চট্টগ্রামের স্থানীয় ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ। সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে এগুলো সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারবে, এই শহরের অতীত কত বৈচিত্র্যময় এবং কত মানুষের বিশ্বাস, সাধনা ও জীবনকথা তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
হযরত সুলতান শাহ: স্মৃতির কেন্দ্রে এক আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব
স্থানীয়ভাবে জানা যায়, হযরত সুলতান শাহ ১৯৭১ সালে ইন্তেকাল করেন। তাঁর মাজার শরিফ চট্টগ্রামের চান্দগাঁওয়ের মৌলভী পুকুরপাড় এলাকায় অবস্থিত বলে জানানো হয়েছে। তাঁর স্মৃতিবিজড়িত আস্তানায় প্রতি চান্দ্রমাসের প্রথম সপ্তাহে জিকির ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয় বলেও জানা যায়।
তাঁর বড় শাহজাদা নাসির উদ্দিন শাহের সঙ্গে সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে পিতার স্মৃতি ও পারিবারিক আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের কিছু কথা শোনার সুযোগ হলো। একই সঙ্গে তাঁর ছোট শাহজাদা মহিউদ্দিন শাহের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যেই আমাদের সেখানে যাওয়া হয়েছিল।
একটি পরিবারের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য কীভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্মৃতি, বিশ্বাস ও কথামালার মধ্য দিয়ে বহমান থাকে, এই সাক্ষাৎ আমাকে সেই বিষয়টি ভাবতে সাহায্য করেছে।
কোনো সাধকের জীবন সম্পর্কে যথাযথভাবে জানতে হলে তাঁর জন্ম, জীবনযাপন, সাধনা, সমসাময়িক মানুষের সাক্ষ্য এবং মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতিকে ঘিরে গড়ে ওঠা ঐতিহ্য সম্পর্কে অনুসন্ধান জরুরি। হযরত সুলতান শাহের জীবন ও কর্ম নিয়েও তথ্যনির্ভর গবেষণার সুযোগ রয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে।
মানুষের বাহ্যিক অবয়ব নয়, তার অন্তর্জগৎকে জানার চেষ্টা
আমরা প্রায়ই মানুষকে তার পোশাক, কথাবার্তা, সামাজিক অবস্থান ও বাহ্যিক আচরণ দিয়ে বিচার করি। অথচ একজন মানুষের চিন্তার জগৎ, বিশ্বাস ও জীবনদর্শন সম্পর্কে না জেনে তার প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করা কঠিন।
নাসির উদ্দিন শাহকে প্রথম দেখার পর আমার মনে যে প্রশ্ন জেগেছিল, তাঁর পাশে বসে সেই প্রশ্নের আরও গভীরতা উপলব্ধি করেছি। তিনি প্রচলিত সামাজিক রীতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তাঁর কথার প্রতিটি বক্তব্য কতটা সহজবোধ্য—এসবের বাইরে গিয়েও একজন মানুষকে জানার চেষ্টা করা প্রয়োজন।
তাঁর সব কথা আমি বুঝতে পারিনি। তাঁর সব বিশ্বাসের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধির মিল আছে, এমন দাবিও করছি না। কিন্তু তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং তাঁর বিশ্বাসের জগৎকে জানার চেষ্টা করার মধ্যে আমি একটি মূল্যবান অভিজ্ঞতা পেয়েছি।
মানুষের প্রতি সম্মান দেখানোর অর্থ তার প্রতিটি বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়া নয়। বরং মত ও উপলব্ধির পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তার কথা শোনার মানসিকতা রাখা, যাচাইযোগ্য বিষয় যাচাই করা এবং মানবিক মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখা।
আমার কাছে এই শিক্ষাটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
আমার আপন মানুষ আজাদ ও লিটু সূত্রধরের সঙ্গে স্মরণীয় রাত
সেই রাতের অভিজ্ঞতাকে আরও আপন করে তুলেছে আমার সঙ্গে থাকা দুজন মানুষ—আমার আপন মানুষ আজাদ এবং লিটু সূত্রধর। তাঁদের সঙ্গে এই আস্তানায় যাওয়া, সেখানে বসে নাসির উদ্দিন শাহের কথামালা শোনা এবং পুরোনো স্মৃতিবিজড়িত পরিবেশে কিছুটা সময় কাটানো আমার কাছে একটি স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকবে।
জীবনের অনেক অভিজ্ঞতা একা অর্জন করা যায়, কিন্তু কিছু মুহূর্ত কাছের মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নিলে সেগুলোর স্মৃতি আরও গভীর হয়। গত রাতের এই সাক্ষাৎও তেমনই। আমরা সেখানে গিয়েছিলাম একটি পরিচয়ের সূত্র ধরে, কিন্তু ফিরে এলাম নানা প্রশ্ন, ভাবনা ও উপলব্ধি নিয়ে।
আমার আপন মানুষ আজাদ ও লিটু সূত্রধরের উপস্থিতি সেই অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে থাকবে। চেরাগি পাহাড়ের পুরোনো পরিবেশ, আস্তানার স্মৃতি, নাসির উদ্দিন শাহের ব্যতিক্রমী কথামালা এবং তাঁর পিতা হযরত সুলতান শাহকে ঘিরে প্রচলিত আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য—সব মিলিয়ে রাতটি হয়ে উঠেছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
শেষ কথা: এক রাতের সাক্ষাৎ, অনেক দিনের ভাবনা
আমি জানি না, নাসির উদ্দিন শাহের প্রতিটি কথার গভীরে ঠিক কী অর্থ লুকিয়ে ছিল। তাঁর বক্তব্যের সবটুকু বোঝার দাবি আমার নেই। তবে তাঁর সান্নিধ্যে বসে একটি বিষয় নতুন করে অনুভব করেছি—মানুষের জীবনকে বুঝতে হলে শুধু চোখ দিয়ে দেখলেই চলে না, মন দিয়েও শুনতে হয়।
আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা, মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং নিজের কর্মের জন্য জবাবদিহি—এসব বিষয় আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই গুরুত্বপূর্ণ। কেউ সাধনার পথে, কেউ কর্মের পথে, কেউ জ্ঞানচর্চায়, আবার কেউ মানুষের সেবার মধ্য দিয়ে নিজের জীবনদর্শন প্রকাশ করেন। পথের ধরন ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু সততা ও মানবিকতার মূল্য কখনো ছোট হতে পারে না।
চেরাগি পাহাড়ের সেই স্মৃতিবিজড়িত আস্তানায় আমার আপন মানুষ আজাদ ও লিটু সূত্রধরের সঙ্গে কাটানো রাতটি তাই আমার কাছে শুধু একটি সাক্ষাৎ নয়; এটি মানুষের অন্তর্জগৎ, আধ্যাত্মিক বিশ্বাস, ইতিহাস ও মানবিকতার নানা দিক নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি উপলক্ষ।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার, অন্যায়ের প্রতিবাদ করার, মানুষের প্রতি সহমর্মী হওয়ার এবং নিজেদের কর্মের জন্য জবাবদিহির অনুভূতি নিয়ে জীবনযাপন করার তৌফিক দান করুন। হযরত সুলতান শাহের স্মৃতিবিজড়িত আস্তানায় যাঁরা প্রার্থনা ও জিকিরে সময় অতিবাহিত করেন, তাঁদের সবার জন্য রইল শান্তি ও কল্যাণের শুভকামনা।
মানুষের পরিচয় তার বাহ্যিক অবয়বে নয়, তার কর্ম, চিন্তা, বিশ্বাস ও মানবিকতায়। আর আল্লাহর প্রেমের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই বিকশিত হয়, যখন সেই প্রেম মানুষের জীবনে সততা, বিনয়, ন্যায়বোধ ও কল্যাণের পথ তৈরি করে।
লেখক: মো. কামাল উদ্দিন
লেখক, সাংবাদিক ও গবেষক
ডেপুটি এডিটর, দি ডেইলি টুরিস্ট

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here