ইতিহাসের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র নূর আহমদ চেয়ারম্যান ও মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী শিক্ষা, মানবকল্যাণ, সাংবাদিকতা ও সমাজজাগরণে দুই মহান মনীষীর অবদান-

0
12

মো. কামাল উদ্দিনঃ
মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মানুষের কল্যাণে নিবেদিত মহৎ কর্ম চিরকাল বেঁচে থাকে। পৃথিবীতে অনেক মানুষ জন্মগ্রহণ করেন, অনেকে ক্ষমতা ও খ্যাতি অর্জন করেন; কিন্তু তাঁদের মধ্যে অল্প কয়েকজনই নিজের কর্ম, আদর্শ, সততা ও ত্যাগের মাধ্যমে ইতিহাসে স্থায়ী আসন করে নিতে পারেন। যাঁরা মানুষের জীবনকে আলোকিত করেন, সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত রেখে যান, তাঁরাই প্রকৃত অর্থে স্মরণীয় মানুষ।
চট্টগ্রামের ইতিহাসে নূর আহমদ চেয়ারম্যান ও মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী তেমনই দুই মহান ব্যক্তিত্ব। একজন শিক্ষা বিস্তার, পৌর প্রশাসন ও নাগরিক সেবায় অসামান্য অবদান রেখেছেন; অন্যজন জ্ঞানচর্চা, সাংবাদিকতা, সাহিত্য, সমাজসংস্কার, শিক্ষার প্রসার ও রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে মানুষকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন।
এই দুই মনীষীর জীবন ও কর্ম আমাদের শেখায়, মানুষের প্রকৃত পরিচয় তাঁর পদ-পদবি, সম্পদ কিংবা ব্যক্তিগত সাফল্যে নয়; বরং মানুষের জন্য তিনি কী করেছেন এবং সমাজের জন্য কী রেখে গেছেন, তার মধ্যেই তাঁর জীবনের সার্থকতা।
এই মহান ব্যক্তিত্বদের জীবন, কর্ম ও অবদান নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে ২৪ অক্টোবর ২০২৬, শনিবার, বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের উদ্যোগে চট্টগ্রাম একাডেমি হলে আয়োজন করা হয়েছে এক যৌথ স্মরণসভা ও আলোচনা অনুষ্ঠান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত আছেন চট্টগ্রামের কৃতী সন্তান, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র জনাব মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী। এ ছাড়া বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ, শিক্ষাবিদ, লেখক, সাংবাদিক, সমাজসেবক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও বিশিষ্টজনেরা এই আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন।
আমাদের এই আয়োজন কেবল স্মৃতিচারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই দুই মহান ব্যক্তিত্বের অবদান তুলে ধরা, তাঁদের জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং তাঁদের আদর্শকে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
নূর আহমদ চেয়ারম্যান: চট্টগ্রামের শিক্ষা ও নাগরিক উন্নয়নের অগ্রপথিক
নূর আহমদ চেয়ারম্যান চট্টগ্রামের ইতিহাসে একজন স্মরণীয় শিক্ষানুরাগী, জননেতা ও সমাজসেবক। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, একটি শহরের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু রাস্তাঘাট নির্মাণ কিংবা প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষার প্রসার, নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
১৮৯০ সালের ২৫ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম শহরের আলকরণ এলাকার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী ও অধ্যবসায়ী। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে বৃত্তি অর্জন করে তিনি নিজের যোগ্যতার পরিচয় দেন। ১৯১৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে প্রথম স্থান অধিকার করে এমএ ডিগ্রি অর্জন এবং চ্যান্সেলরস স্বর্ণপদক লাভ তাঁর অসাধারণ মেধার প্রমাণ। পরবর্তী সময়ে তিনি আইনশাস্ত্রেও ডিগ্রি অর্জন করেন।
কিন্তু উচ্চশিক্ষা অর্জন করেই তিনি ব্যক্তিগত উন্নতির পথে সীমাবদ্ধ থাকেননি। নিজের জ্ঞান ও যোগ্যতাকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর প্রত্যয় নিয়ে তিনি জনসেবায় আত্মনিয়োগ করেন।
৩৩ বছরের নেতৃত্ব ও জনসেবার দৃষ্টান্ত
১৯১৮ সালে নূর আহমদ চট্টগ্রাম পৌরসভার কমিশনার নির্বাচিত হন। ১৯২১ সালে তিনি পৌরসভার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৩ বছর এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। এই দীর্ঘ কর্মজীবন তাঁকে চট্টগ্রামের পৌর প্রশাসনের ইতিহাসে একটি বিশেষ স্থান দিয়েছে।
তাঁর জীবনীমূলক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে, চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি পৌরসভা থেকে কোনো ভাতা গ্রহণ করতেন না। জনসেবাকে ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে না দেখে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করার এই মানসিকতা তাঁর জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক।
তিনি মনে করতেন, জনপ্রতিনিধির প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে মানুষের প্রয়োজন বোঝা এবং সেই প্রয়োজন পূরণে কাজ করা। তাই শিক্ষার উন্নয়ন, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, সড়কে আলোর ব্যবস্থা, পাঠাগার প্রতিষ্ঠা ও দরিদ্র মানুষের সুবিধার মতো বিষয়গুলো তাঁর কর্মকাণ্ডে গুরুত্ব পেয়েছিল।
শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার ঐতিহাসিক উদ্যোগ
নূর আহমদ চেয়ারম্যানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলোর একটি হলো চট্টগ্রাম পৌর এলাকায় প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার।
তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের সময় শহরের বহু শিশু বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা এবং মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর পরিবেশ তৈরি করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষাই সমাজের উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি। এই বিশ্বাস থেকে ১৯২৭ সালে চট্টগ্রাম পৌর এলাকায় বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা চালুর উদ্যোগ নেন। ১৯২৮ সালে মেয়েদের জন্যও এই ব্যবস্থা সম্প্রসারিত করেন। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, শিক্ষকদের দায়িত্ব নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি এবং মেয়েদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতের সুবিধা তৈরির মতো বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
সীমিত অর্থ, সামাজিক বাধা এবং শিক্ষার বিষয়ে মানুষের অনীহা থাকা সত্ত্বেও তিনি এই কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর এই উদ্যোগের ফলে চট্টগ্রামের প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয়।
১৯৪২ সালে অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক বঙ্গীয় আইন পরিষদে চট্টগ্রাম পৌর এলাকার শিক্ষার অগ্রগতির জন্য নূর আহমদের অবদানের প্রশংসা করেন বলে সংশ্লিষ্ট কার্যবিবরণীতে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তী সময়েও পাকিস্তান গণপরিষদে চট্টগ্রামের শিক্ষার অগ্রগতি এবং তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশংসাসূচক বক্তব্যের বিবরণ পাওয়া যায়।
এই স্বীকৃতিগুলো তাঁর শিক্ষাবিষয়ক উদ্যোগের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে।
নাগরিক উন্নয়ন ও দরিদ্র মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ
শিক্ষার পাশাপাশি চট্টগ্রামের নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধিতেও নূর আহমদ চেয়ারম্যানের ভূমিকা স্মরণ করা হয়। দামপাড়ায় পানি সরবরাহের ব্যবস্থা, শহরের বিভিন্ন স্থানে পানির কল স্থাপন, রাস্তায় বৈদ্যুতিক বাতি স্থাপন এবং লালদীঘি পাড়ের মিউনিসিপ্যাল পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে আছে।
তিনি শহরের দরিদ্র মানুষের সমস্যার প্রতিও সহানুভূতিশীল ছিলেন। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে পৌর কর দিতে সমস্যায় পড়া মানুষের কর মওকুফের বিষয়ে তাঁর উদার মনোভাবের কথা জীবনীমূলক বিবরণে পাওয়া যায়।
১৯৩৭ সালে তিনি বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। আইন পরিষদে জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন বিষয়ে ভূমিকা রাখেন। প্রজাস্বত্ব আইন, সূর্যাস্ত আইন বিলোপ, যৌতুক প্রথা বিলোপের প্রস্তাব এবং ওয়াক্‌ফ ও দেবোত্তর আইনসংক্রান্ত কার্যক্রমে তাঁর ভূমিকার কথাও বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক প্রস্তাব ও উদ্যোগের ইতিহাসেও তাঁর নাম আলোচিত হয়। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, ব্রিটিশ আমলে চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব উত্থাপন এবং এ উদ্দেশ্যে পৌরসভার পক্ষ থেকে পাঁচশ টাকা সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন।
এ ছাড়া চট্টগ্রামে মেরিন শিক্ষার প্রসার এবং হোমিওপ্যাথি শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নেও তাঁর ভূমিকার কথা বিভিন্ন বিবরণে পাওয়া যায়।
১৯৬৪ সালের ২২ অক্টোবর আলকরণে নিজ বাসভবনে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, প্রকৃত জননেতার সার্থকতা মানুষের জন্য কাজ করার মধ্যে।
মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী: জ্ঞানচর্চা, সাংবাদিকতা ও সমাজজাগরণের অগ্রপথিক
মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ছিলেন উপমহাদেশের একজন বিশিষ্ট আলেম, লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিক। ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি শিক্ষা বিস্তার, সাহিত্য, সাংবাদিকতা, সমাজসংস্কার এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তাঁর অবদান তাঁকে ইতিহাসে বিশেষ স্থান দিয়েছে।
১৮৭৫ সালের ২২ আগস্ট চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার বরমা এলাকার আড়ালিয়ার চর গ্রামে তাঁর জন্ম। চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক নাম ইসলামাবাদের স্মৃতি ধারণ করে তিনি নিজের নামের সঙ্গে ‘ইসলামাবাদী’ শব্দটি যুক্ত করেন।
প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় যান এবং হুগলি সরকারি মাদরাসা থেকে ১৮৯৫ সালে উচ্চতর শিক্ষা সম্পন্ন করেন। আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষায় দক্ষতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার প্রতিও তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল।
শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও তিনি দ্রুত বৃহত্তর সমাজের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করেন। বিভিন্ন স্থানে স্কুল ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষার প্রসারে কাজ করেন। তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল মানুষের চিন্তা, জ্ঞান ও আত্মমর্যাদা বিকাশের অন্যতম প্রধান মাধ্যম।
সাংবাদিকতা ও লেখালেখির মাধ্যমে মানুষের মধ্যে জাগরণ
মাওলানা ইসলামাবাদী ছিলেন একজন চিন্তাশীল ও সমাজসচেতন সাংবাদিক। তিনি সোলতান, মুহাম্মদী, কোহিনূর, হাবলুল মতিন, বাসনা ও আল-ইসলামসহ বিভিন্ন পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। চট্টগ্রাম থেকে ‘ইসলামাবাদ’ নামে পত্রিকাও প্রকাশ করেন।
বাংলা, আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষায় তিনি লেখালেখি করতেন। তাঁর লেখায় ধর্মীয় জ্ঞান, মুসলিম ইতিহাস, শিক্ষা, সমাজসংস্কার ও জাতীয় চেতনার প্রকাশ ঘটেছে। বিভিন্ন জীবনীমূলক বিবরণে তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ৪২ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ভারতে মুসলিম সভ্যতা’, ‘সমাজ সংস্কার’, ‘ভূগোল শাস্ত্রে মুসলমান’, ‘ইসলাম জগতের অভ্যুত্থান’, ‘ভারতে ইসলাম প্রচার’, ‘সুদ সমস্যা’, ‘ইসলামী শিক্ষা’ এবং ‘কোরআন ও বিজ্ঞান’।
তিনি কলমকে শুধু ব্যক্তিগত পরিচিতি অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি। মানুষের মধ্যে জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া, সামাজিক সমস্যা নিয়ে চিন্তা সৃষ্টি করা এবং জাতিকে সচেতন করার কাজে লেখনীকে ব্যবহার করেছেন।
তাঁর জীবন থেকে বর্তমান সাংবাদিক সমাজেরও শিক্ষা নেওয়ার আছে। সাংবাদিকতার দায়িত্ব শুধু সংবাদ প্রকাশ করা নয়; সত্য তুলে ধরা, মানুষের কথা বলা এবং সমাজের কল্যাণে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করাও সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রাজনৈতিক সংগ্রাম ও বাংলা ভাষার মর্যাদা
মাওলানা ইসলামাবাদী বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আঞ্জুমানে উলামায়ে বাংলা প্রতিষ্ঠায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। মুসলিম সমাজের শিক্ষা ও জাগরণের পাশাপাশি তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনেও অংশ নেন।
প্রথমদিকে কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরবর্তী সময়ে খেলাফত আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯৩৭ সালে কৃষক প্রজা পার্টির মনোনয়নে বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন।
ব্রিটিশ শাসনবিরোধী কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনের ঐতিহাসিক পরিমণ্ডলে তাঁর ভূমিকা তাঁর দেশপ্রেম ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পরিচয় বহন করে।
বাংলা ভাষার মর্যাদার প্রশ্নেও তাঁর অবস্থান স্মরণ করা হয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিতর্কের সময় বাংলা ভাষার পক্ষে তাঁর সমর্থন পরবর্তী ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে অনুপ্রাণিত করেছিল বলে বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ রয়েছে।
জাতীয় আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন
মাওলানা ইসলামাবাদীর অন্যতম বড় স্বপ্ন ছিল চট্টগ্রামের দেয়াং পাহাড় এলাকায় একটি জাতীয় আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। এই উদ্দেশ্যে জমি সংগ্রহসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন তিনি।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ১৯১৫ সালে এই প্রকল্পের জন্য সরকারি জমি এবং স্থানীয় জমিদারের কাছ থেকে ভূমি গ্রহণের ব্যবস্থা করেছিলেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল, এই প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে।
কিন্তু নানা কারণে তাঁর জীবদ্দশায় সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি। তবু তাঁর প্রচেষ্টা একজন দূরদর্শী শিক্ষানুরাগীর পরিচয় বহন করে।
১৯৫০ সালের ২৪ অক্টোবর তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর জীবন ও কর্ম আজও শিক্ষা, সাংবাদিকতা, সাহিত্য, সমাজসংস্কার ও দেশপ্রেমের ইতিহাসে স্মরণীয়।
দুই মহান ব্যক্তিত্বের জীবন থেকে আমাদের শিক্ষা
নূর আহমদ চেয়ারম্যান ও মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করলেও তাঁদের জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের কল্যাণ ও সমাজের উন্নয়ন।
নূর আহমদ চেয়ারম্যান দেখিয়েছেন, প্রশাসনিক দায়িত্বে থেকেও শিক্ষা ও নাগরিক সেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়া যায়। মাওলানা ইসলামাবাদী দেখিয়েছেন, জ্ঞান, লেখনী ও সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে মানুষের চিন্তা ও সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা যায়।
তাঁদের জীবন আমাদের সামনে চারটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরে।
প্রথমত, শিক্ষা ছাড়া কোনো সমাজের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
দ্বিতীয়ত, নেতৃত্বের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় মানুষের জন্য করা কাজের মাধ্যমে।
তৃতীয়ত, সততা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতা একজন মানুষকে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে দেয়।
চতুর্থত, ইতিহাসের মহান ব্যক্তিদের স্মরণ করার পাশাপাশি তাঁদের আদর্শকে বাস্তব জীবনে অনুসরণ করা প্রয়োজন।
আজকের সমাজে শিক্ষা, নৈতিকতা, মানবিকতা ও জনকল্যাণের যে প্রয়োজন, তা পূরণে এই দুই মনীষীর জীবন আমাদের প্রেরণা জোগাতে পারে।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের উদ্যোগের তাৎপর্য
একটি শহরের পরিচয় শুধু তার রাস্তাঘাট, ভবন কিংবা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়। একটি শহরের প্রকৃত পরিচয় গড়ে ওঠে তার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, গুণীজন এবং মানুষের সম্মিলিত অবদানের মধ্য দিয়ে।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ, নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সামনে আনার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় নূর আহমদ চেয়ারম্যান ও মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর স্মরণে এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।
আজকের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি জনাব মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতি আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার বিষয়।
আমরা আশা করি, এই আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে দুই মহান ব্যক্তিত্বের জীবন ও কর্মের বিভিন্ন দিক আরও ব্যাপকভাবে আলোচিত হবে। তাঁদের অবদান নিয়ে গবেষণা, নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাস পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও আরও জোরদার হবে।
চট্টগ্রামের গুণীজনদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা শুধু কোনো একটি সংগঠনের দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। তাঁদের অবদানকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে পারলে আগামী প্রজন্মও নিজেদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন হবে।
আমার উপলব্ধি: স্মরণ হোক আদর্শ অনুসরণের অঙ্গীকার
একজন লেখক, সাংবাদিক ও গবেষণাকর্মী হিসেবে আমি মনে করি, ইতিহাসের প্রতি দায়িত্বশীল থাকা আমাদের সবার কর্তব্য। অতীতের গুণীজনদের অবদান তুলে ধরার সময় তাঁদের জীবনের সাফল্য, কর্ম ও ঐতিহাসিক ভূমিকা নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।
নূর আহমদ চেয়ারম্যানের জীবন আমাদের শেখায়, মানুষের কল্যাণে দায়িত্বশীল নেতৃত্ব কতটা গুরুত্বপূর্ণ। মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর জীবন শেখায়, জ্ঞানচর্চা, সাংবাদিকতা ও সমাজসচেতনতা একটি জাতির অগ্রযাত্রায় কত বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
আমরা যদি তাঁদের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে শিক্ষা বিস্তার, নাগরিক উন্নয়ন, মানবিক মূল্যবোধ ও জনকল্যাণে কাজ করতে পারি, তাহলেই তাঁদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা অর্থবহ হবে।
চট্টগ্রামের ইতিহাসে যাঁরা অবদান রেখেছেন, তাঁদের জীবন ও কর্ম যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। তাঁদের নামে স্মরণসভা আয়োজনের পাশাপাশি বই প্রকাশ, গবেষণা, পাঠচক্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনা এবং ঐতিহাসিক তথ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
আমাদের সন্তানদের জানতে হবে, তাঁদের পূর্বসূরিরা কীভাবে সীমিত সুযোগের মধ্যেও সমাজের উন্নয়নে কাজ করেছেন। সেই ইতিহাস তাঁদের মধ্যে দায়িত্ববোধ, দেশপ্রেম ও মানুষের জন্য কাজ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
উপসংহার: কর্মের মধ্যেই মানুষের প্রকৃত অমরত্ব
মানুষের জীবন একদিন শেষ হয়, কিন্তু মানুষের জন্য করা ভালো কাজ কখনো হারিয়ে যায় না। সময়ের পরিবর্তন ঘটে, প্রজন্মের পরিবর্তন হয়, তবু মহৎ কর্ম মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকে।
নূর আহমদ চেয়ারম্যান ও মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী আমাদের ইতিহাসের তেমনই দুই স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁদের জীবন আমাদের শিক্ষা, সততা, দায়িত্ববোধ, জ্ঞানচর্চা ও জনকল্যাণের মূল্য বুঝতে শেখায়।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের এই স্মরণসভা থেকে আমাদের অঙ্গীকার হোক, আমরা চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করব, গুণীজনদের যথাযথ সম্মান জানাব এবং মানুষের কল্যাণে নিজেদের অবস্থান থেকে কাজ করে যাব।
দুই মহান মনীষীর স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। মহান আল্লাহ তাঁদের ক্ষমা করুন এবং তাঁদের ভালো কাজগুলোকে আমাদের জন্য অনুসরণীয় করে রাখুন।
ইতিহাস তাঁদের স্মরণ করুক, চট্টগ্রাম তাঁদের অবদান ধারণ করুক, আর নতুন প্রজন্ম তাঁদের আদর্শ থেকে শিখুক মানুষের জন্য বেঁচে থাকার প্রকৃত অর্থ।
লেখক পরিচিতিঃ
-লেখক, সাংবাদিক, গবেষক ও টেলিভিশন উপস্থাপক।
মহাসচিব, বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম (BCcf)
সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম সিনিয়র্স প্রেস ক্লাব
সাধারণ সম্পাদক, কক্সবাজার ক্লাব লিমিটেড
ডেপুটি এডিটর, জাতীয় ইংরেজি দৈনিক দি ডেইলি টুরিস্ট
নির্বাহী সম্পাদক, চট্রল চিত্র
PEN International-এর সদস্য
লেখক, সাংবাদিকতা, গবেষণা ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here