বন ও প্রকৃতির নীরব আর্তনাদ নিয়ে গোলাম হাবিবের গ্রন্থ ‘বন-বনানীর নীরবে নিভৃতে ক্রন্দন’-এর মোড়ক উন্মোচন

0
16

বৃক্ষরোপণ, বন সংরক্ষণ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান
নিজস্ব প্রতিবেদক:
সাবেক প্রধান বনসংরক্ষক, বিশিষ্ট লেখক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম হাবিবের লেখা ‘বন-বনানীর নীরবে নিভৃতে ক্রন্দন’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান রাজধানীর উত্তরায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। বন, বৃক্ষ, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ সংরক্ষণের গুরুত্বকে সামনে রেখে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বক্তারা গ্রন্থটির প্রশংসা করেন এবং প্রকৃতি রক্ষায় ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব পালনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সাবেক প্রধান বনসংরক্ষক মো. ইউনুছ আলী। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক প্রধান বনসংরক্ষক আনোয়ার ফারুক। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক জামাল উদ্দিন জামাল এবং আবু সৈয়দ। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ড. তপন কুমার দে, অসিত রাহুল পাল, দেলোয়ার হোসেন, কামাল মুজাহিদ, কাদের চৌধুরী ও কাজী শিলাসহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
বক্তারা বলেন, বন ও বনানী প্রকৃতির অপরিহার্য সম্পদ। মানুষের জীবনধারণ থেকে শুরু করে জলবায়ুর ভারসাম্য, বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিকতা, মাটির উর্বরতা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশের সুস্থতা বজায় রাখতে বৃক্ষ ও বনভূমির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গাছ শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ায় না, মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহ করে, বায়ুদূষণ কমাতে সহায়তা করে এবং অসংখ্য প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে। তাই বন ধ্বংসের অর্থ কেবল গাছ হারানো নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানুষের জীবন, জীববৈচিত্র্য ও ভবিষ্যৎ পৃথিবীর নিরাপত্তা।
তাঁরা আরও বলেন, বর্তমান সময়ে পরিবেশদূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বনভূমি উজাড় এবং নির্বিচারে বৃক্ষনিধনের কারণে প্রকৃতি নানা সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে জলবায়ু, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়। প্রকৃতির এই সংকটকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি কেবল সরকারি দপ্তর বা পরিবেশবাদী সংগঠনের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না; প্রত্যেক নাগরিককে নিজের অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
গ্রন্থটি প্রকৃতির প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়—এমন অভিমত ব্যক্ত করে বক্তারা বলেন, ‘বন-বনানীর নীরবে নিভৃতে ক্রন্দন’ নামের মধ্যেই প্রকৃতির প্রতি গভীর মমতা এবং বনভূমির সংকটের একটি তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত রয়েছে। বন ও প্রকৃতি মানুষের কাছে প্রতিনিয়ত উপকার বয়ে আনলেও মানুষের অসচেতনতা ও স্বার্থপরতার কারণে অনেক সময় সেই প্রকৃতিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গাছের ভাষা নেই, বনভূমি মানুষের মতো প্রতিবাদ করতে পারে না; কিন্তু প্রকৃতির ক্ষতচিহ্ন পরিবেশের নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। লেখক গোলাম হাবিব তাঁর গ্রন্থে বন ও প্রকৃতির গুরুত্ব সম্পর্কে পাঠককে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করেছেন বলে বক্তারা উল্লেখ করেন।
বক্তারা বলেন, গাছ লাগানোর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করার পাশাপাশি রোপণ করা গাছের পরিচর্যা নিশ্চিত করাও জরুরি। অনেক সময় আনুষ্ঠানিকভাবে বৃক্ষরোপণ করা হলেও পরবর্তী পরিচর্যার অভাবে চারাগাছ বেঁচে থাকতে পারে না। তাই বৃক্ষরোপণকে একটি ধারাবাহিক সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। বাড়ির আঙিনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়কের উপযুক্ত স্থান এবং অন্যান্য নির্ধারিত এলাকায় পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যার উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান বনভূমি রক্ষা, অবৈধভাবে গাছ কাটা প্রতিরোধ এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
তাঁদের মতে, পরিবেশ সংরক্ষণে বই ও লেখালেখির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি সচেতনতামূলক গ্রন্থ পাঠকের চিন্তাজগতে পরিবর্তন আনতে পারে, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা জাগাতে পারে এবং দায়িত্বশীল আচরণে অনুপ্রাণিত করতে পারে। বিশেষ করে শিশু-কিশোর ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বৃক্ষ, বন ও জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে জ্ঞান বাড়াতে এ ধরনের বইয়ের পাঠ ও আলোচনা ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। কারণ আজকের প্রজন্মের মধ্যেই আগামী দিনের পরিবেশ রক্ষার দায়িত্বশীল নাগরিকেরা গড়ে উঠবে।
সাবেক প্রধান বনসংরক্ষক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম হাবিবের লেখকসত্তার পাশাপাশি বন ও প্রকৃতি বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতার কথাও অনুষ্ঠানে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, ‘বন-বনানীর নীরবে নিভৃতে ক্রন্দন’ গ্রন্থটি পাঠকদের মধ্যে প্রকৃতির প্রতি মমত্ববোধ জাগিয়ে তুলবে এবং বন সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ রক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে সহায়তা করবে।
বক্তারা আরও বলেন, উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখা অপরিহার্য। বর্তমান প্রজন্মের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবীকে বিপন্ন করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাই উন্নয়ন পরিকল্পনায় বন, জলাভূমি, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।
গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানটি শুধু একটি বই প্রকাশের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং বন ও প্রকৃতির প্রতি মানুষের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়ার একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রকৃতি মানুষের জীবনধারণের ভিত্তি, আর সেই ভিত্তি সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব মানুষেরই। বৃক্ষরোপণ, গাছের পরিচর্যা, বনভূমি সংরক্ষণ এবং পরিবেশ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির মধ্য দিয়েই আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর, সবুজ ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব।
প্রকৃতি বাঁচলে মানুষ বাঁচবে, বন বাঁচলে জীববৈচিত্র্য বাঁচবে—এই উপলব্ধিকে ধারণ করে বন ও পরিবেশ সংরক্ষণে সবাইকে আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান অনুষ্ঠানে উপস্থিত বক্তারা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here