সাড়ে ছয় বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে প্রায় ৮ হাজার শিশুর

0
7

সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুদের মৃত্যুর মিছিল থামছে না। সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, কমছে না দুর্ঘটনার সামগ্রিক সংখ্যাও। গত সাড়ে ছয় বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৭ হাজার ৯৬৩ শিশু। অন্যদিকে, গত ১৩ বছরে দেশে ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন।

সড়ক ও পরিবহন খাতের অব্যবস্থাপনা, দুর্বল তদারকি, ট্রাফিক আইন অমান্য এবং কার্যকর পদক্ষেপের অভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা দুটি সংগঠন—রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ও বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

বুধবার জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত পৃথক প্রতিবেদন ও বার্তায় এসব তথ্য তুলে ধরে সংগঠন দুটি। সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে শিশুবান্ধব সড়ক নির্মাণ, ট্রাফিক আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ এবং পরিবহন খাতের প্রচলিত কার্যক্রম পর্যালোচনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে তারা।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন সড়কে দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৯৬৩ শিশু নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ৯৫৮ শিশু মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী হিসেবে প্রাণ হারিয়েছে। এ ছাড়া পথচারী হিসেবে ২ হাজার ৮১২ এবং বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী হিসেবে ২ হাজার ১৯৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নিহত শিশুদের মধ্যে ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৩ হাজার ৫৪৭ জন। ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী ২ হাজার ৮৮৪ শিশু এবং শূন্য থেকে ৫ বছর বয়সী ১ হাজার ৫৩২ শিশু সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ৫১৩ শিশু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার পথে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। এ ছাড়া বসতবাড়ির আশপাশের সড়কে খেলাধুলা করার সময় প্রাণ গেছে ৯৬২ শিশুর।

সড়কের ধরন অনুযায়ী, গ্রামীণ সড়কে ২ হাজার ৭১৩ শিশু নিহত হয়েছে। আঞ্চলিক সড়কে প্রাণ হারিয়েছে ২ হাজার ৮২, মহাসড়কে ১ হাজার ৯৭৪ এবং শহরের সড়কে ১ হাজার ১৯৪ শিশু।

পথচারী শিশুদের মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, থ্রি-হুইলারের ধাক্কায় ১ হাজার ২৭১ শিশু নিহত হয়েছে। বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপের মতো ভারী যানবাহনের ধাক্কা বা চাপায় প্রাণ গেছে ১ হাজার ১২৬ শিশুর। এ ছাড়া প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের ধাক্কায় ৩১৭ এবং মোটরসাইকেলের ধাক্কায় ৯৮ শিশু নিহত হয়েছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন। আহত হয়েছেন আরও ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত দুর্ঘটনার সংবাদ পর্যবেক্ষণ করে এসব পরিসংখ্যান তৈরি করেছে সংগঠনটি। তবে হাসপাতালগুলোর তথ্য বিবেচনায় নিলে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি হতে পারে বলে দাবি তাদের।

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২৬ উপলক্ষে বুধবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় এসব তথ্য জানান বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী।

সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সরকারের নেওয়া উদ্যোগ এবং সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। কালবেলাকে মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমাতে সরকার আন্তরিক প্রচেষ্টার কথা বলছে। কিন্তু সরকারি কার্যক্রম বাড়লেও দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির সংখ্যা কমছে না, বরং বাড়ছে। সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের পরও কেন পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, বিশ্বের যেসব দেশ উল্লেখযোগ্যভাবে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সক্ষম হয়েছে, তাদের অভিজ্ঞতা ও গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে জানা এবং তা বিনিময় করা দরকার। একই সঙ্গে সরকারের চলমান কার্যক্রম নিরীক্ষা করে গতানুগতিক উদ্যোগের বাইরে গিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

পরিবহন খাত পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অভিজ্ঞতার ঘাটতি রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। মোজাম্মেল হক চৌধুরীর ভাষ্য, সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং ট্রাফিক বিভাগের কার্যক্রমে অভিজ্ঞতার ঘাটতি রয়েছে বলে তাদের মনে হয়েছে। এ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করে দায়িত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর আইন প্রয়োগ, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে চলমান উদ্যোগগুলোর কার্যকারিতা যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here