বাঁশখালীতে ভুয়া SRB পরিচয়ে ব্যবসায়ী অপহরণ, ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি; গ্রেপ্তার ৬

0
8

মর্জিনা আক্তার চট্টগ্রাম :

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে নিজেদের SRB সদস্য পরিচয় দিয়ে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ এবং ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবির ঘটনায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও বাঁশখালী থানা পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে চাকরিচ্যুত এক সাবেক সেনাসদস্যও রয়েছেন। অপহরণের চার দিন পর কক্সবাজারের টেকনাফের লেদা (আলীখালী) রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫ সংলগ্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসানকে সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।

এ ঘটনায় অপহরণে ব্যবহৃত একটি প্রাইভেট কার, পাঁচটি কালো রঙের SRB লেখা কটি, দুটি ভুয়া SRB পরিচয়পত্র এবং একটি হ্যান্ডকাফ জব্দ করেছে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে অপহরণ এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনায় জড়িত ছিল গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ অক্টোবর রাত আনুমানিক সাড়ে আটটার দিকে বাঁশখালী থানার পুঁইছড়ি এলাকার প্রেমবাজারে ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসানের মালিকানাধীন মেসার্স আব্দুল্লাহ এন্টারপ্রাইজ নামের হার্ডওয়্যারের দোকানে প্রবেশ করেন কয়েকজন ব্যক্তি। তাঁদের পরনে ছিল কালো পোশাকের ওপর SRB লেখা কটি, মাথায় কালো ক্যাপ এবং মুখে মাস্ক।

তাঁরা নিজেদের SRB সদস্য পরিচয় দিয়ে দোকানে থাকা ব্যবসায়ীকে তাঁর যমজ ভাই মো. হোছাইনের ছবি দেখিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করেন। একপর্যায়ে ব্যবসায়ী নিজের পরিচয় দিলে তাঁর দুই হাত পেছনে নিয়ে হ্যান্ডকাফ পরানো হয়। পরে টানাহেঁচড়া করে তাঁকে দোকান থেকে বের করে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নিয়ে যায় অপহরণকারীরা।

এরপর বিভিন্ন যানবাহনে স্থানান্তর করে তাঁকে কক্সবাজারের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।

ব্যবসায়ীকে অপহরণের পর ১৭ অক্টোবর রাত আনুমানিক ১১টা ৪০ মিনিট থেকে তাঁর স্ত্রী ও দোকানের ম্যানেজারের মোবাইল ফোনে বিভিন্ন ভিওআইপি নম্বর থেকে কল আসতে থাকে। ফোনে অপহরণকারীরা ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। দাবিকৃত টাকা পরিশোধ না করলে ব্যবসায়ীকে হত্যা করার হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এ ঘটনায় ব্যবসায়ীর ভাই মো. হোছাইমের এজাহারের ভিত্তিতে বাঁশখালী থানায় মামলা করা হয়। এরপর অপহৃত ব্যক্তিকে উদ্ধার এবং জড়িতদের শনাক্ত করতে মাঠে নামে জেলা গোয়েন্দা শাখা ও বাঁশখালী থানা পুলিশ।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম, বিপিএমের দিকনির্দেশনায় সহকারী পুলিশ সুপার (আনোয়ারা সার্কেল) মাহমুদুল হাসান এবং ডিবির ওসি মো. মাসুদ রানার নেতৃত্বে তদন্ত শুরু হয়। তথ্যপ্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য ও ঘটনার পারিপার্শ্বিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০ অক্টোবর কক্সবাজার সদর থানার বাস টার্মিনাল, বাংলাবাজার ও কোর্টবাজার এলাকা থেকে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২১ অক্টোবর ভোর আনুমানিক চারটার দিকে টেকনাফের লেদা (আলীখালী) রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫ সংলগ্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকেই অপহরণকারীদের হেফাজত থেকে ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসানকে সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার সুমন মুন্সি, কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার মিজানুর রহমান, উখিয়া উপজেলার জয়নাল উদ্দিন, চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার মো. আব্বাস উদ্দিন, টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৬-এর বাসিন্দা মো. ছলিম ওরফে সেলিম এবং কক্সবাজার সদর উপজেলার দেলোয়ার হোসেন।

পুলিশের দাবি, সুমন মুন্সি একসময় উখিয়া এলাকায় SRB-তে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে তিনি চাকরিচ্যুত হন এবং কারাভোগ করেন। কারাগারে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে তিনি ভুয়া SRB পরিচয়ে একটি দল গড়ে তোলেন বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, আব্বাস উদ্দিন ও দেলোয়ার হোসেন বিভিন্ন এলাকায় সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে সুমনকে তথ্য সরবরাহ করতেন। পরে ভুয়া SRB পরিচয় ব্যবহার করে অপহরণ এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনা করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সুমন মুন্সির বিরুদ্ধে ছিনতাই, দস্যুতা ও অস্ত্র-সংক্রান্ত ১৩টি মামলা রয়েছে। আব্বাস উদ্দিনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা, জয়নাল উদ্দিন ওরফে জুনুর বিরুদ্ধে অপহরণ, চুরি ও ছিনতাইয়ের তিনটি মামলা এবং ছলিম ওরফে সেলিমের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে দুটি মামলা রয়েছে।

অপহরণে ব্যবহৃত গাড়ি, SRB লেখা কটি, ভুয়া পরিচয়পত্র ও হ্যান্ডকাফ জব্দের পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য কেউ রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। উদ্ধার হওয়া ব্যবসায়ীকে সুস্থ অবস্থায় পাওয়ার মধ্য দিয়ে অপহরণকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সূত্র।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here