নিখোঁজ ২ হাজার শিশু কোথায়? হত্যার শিকার, অপরাধচক্রের কবলে, নাকি জঙ্গি নিয়োগের ঝুঁকিতে?

0
43

বাংলাদেশে শিশু নিরাপত্তার ভয়াবহ প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের নজির এবং রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহির দাবি
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
মো. কামাল উদ্দিন
সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক
একটি শিশু হারিয়ে গেলে শুধু একজন মানুষ নিখোঁজ হয় না; নিখোঁজ হয়ে যায় একটি পরিবারের শান্তি, মা-বাবার নির্ভরতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অসংখ্য স্বপ্ন। কোনো মা হয়তো এখনো সন্তানের ফিরে আসার আশায় দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন। কোনো বাবা হয়তো হাসপাতাল, থানা, রেলস্টেশন কিংবা বাস টার্মিনালে সন্তানের ছবি হাতে ঘুরছেন। আর কোনো পরিবার হয়তো জানেই না, তাদের সন্তান কোথায়, কার কাছে এবং কী অবস্থায় রয়েছে।
বাংলাদেশে শিশু নিখোঁজের পরিসংখ্যান সামনে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে: নিখোঁজ শিশুরা কি সবাই নিরাপদে ফিরছে? যারা ফিরছে না, তাদের কী হচ্ছে? কেউ কি হত্যার শিকার হচ্ছে? কেউ কি অপহরণকারী চক্রের হাতে বন্দি? কেউ কি যৌন নির্যাতন, মানব পাচার কিংবা জোরপূর্বক শ্রমের শিকার হচ্ছে? আর আন্তর্জাতিক সংঘাতের বাস্তবতায় আরও একটি প্রশ্ন কি উপেক্ষা করা যায়—কোনো শিশু কি অপরাধী বা সশস্ত্র উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হাতে পড়ে সহিংস কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আবেগের পাশাপাশি প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্য, পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি।
1. সাত মাসে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ: পুলিশের হিসাব কী বলছে?
বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ১৭ বছর পর্যন্ত বয়সী ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার তথ্য যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে অথবা তারা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। ওই সময় পর্যন্ত ২ হাজার ৩৮ শিশুর সন্ধান পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ, প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, নথিভুক্ত নিখোঁজ শিশুদের প্রায় ১৩ শতাংশের সন্ধান তখনো মেলেনি।
বয়সভিত্তিক হিসাবেও উদ্বেগের বিষয় রয়েছে। শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী ৪৭৪ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়; তাদের মধ্যে ৪০৬ জনের সন্ধান পাওয়া যায় এবং ৬৮ জনের সন্ধান তখনো মেলেনি। অন্যদিকে, ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১৫ হাজার ২৪৩ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার তথ্যের মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জনের সন্ধান পাওয়া যায় এবং ১ হাজার ৯৭০ জনের সন্ধান মেলেনি।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬; দ্য ডেইলি স্টার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
এখানে একটি মৌলিক বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। এই সংখ্যা নিখোঁজ হওয়ার নথিভুক্ত ঘটনার হিসাব। এর অর্থ এই নয় যে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুই অপহৃত হয়েছে কিংবা তাদের সবাই অপরাধের শিকার হয়েছে। আবার ২ হাজার ৩৮ শিশুর সন্ধান না পাওয়ার অর্থও এই নয় যে তারা সবাই নিহত, পাচার বা জঙ্গি সংগঠনের হাতে বন্দি।
কিন্তু তাদের বর্তমান অবস্থা নিশ্চিত করার জন্য হালনাগাদ তথ্যের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
2. নিখোঁজ হওয়ার পর শিশুর মরদেহ উদ্ধার: বাংলাদেশের বাস্তব উদ্বেগ
শিশু নিখোঁজের প্রশ্নটি শুধু পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নিখোঁজ হওয়ার পর কোনো কোনো শিশুর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও সামনে এসেছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত সংবাদ বিবৃতি অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় মোট ২৫৪ শিশুর মৃত্যুর তথ্যও সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে এসেছে।
আসকের পরিসংখ্যান মূলত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে সংকলিত। ফলে এগুলোকে সব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসাব হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
তথ্যসূত্র: আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সংবাদ বিবৃতি, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬; বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
এই তথ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে: নিখোঁজ হওয়ার পর যেসব শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, তাদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রে নিখোঁজ হওয়ার কারণ, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, সম্ভাব্য অপরাধী এবং তদন্তের অগ্রগতি কী?
এখানে প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কোনো শিশুর মরদেহ উদ্ধার হওয়ার অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপহরণ প্রমাণিত হওয়া নয়। আবার সব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা বলেও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। পুলিশি তদন্ত, ময়নাতদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং আদালতের নথি থেকেই প্রকৃত সত্য নির্ধারিত হতে হবে।
সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো, নিখোঁজ হওয়ার পর শিশুকে জীবিত উদ্ধারের জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত অনুসন্ধান হয়েছিল কি না? কোনো অবহেলা বা সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল কি না? অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
প্রতিটি ঘটনার উত্তর জনসমক্ষে আনার মতো তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থা প্রয়োজন।
3. নিখোঁজ শিশুদের কেউ কি জঙ্গি সংগঠনের হাতে পড়ছে?
এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রশ্ন। বাংলাদেশের নিখোঁজ শিশুদের মধ্যে কেউ আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের হাতে পড়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণিত জাতীয় পরিসংখ্যান এখানে পাওয়া যায়নি।
তবে আন্তর্জাতিকভাবে শিশু অপহরণ, জোরপূর্বক নিয়োগ এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে শিশুদের ব্যবহারের প্রমাণিত নজির রয়েছে। তাই বিষয়টি তদন্তের সম্ভাব্য একটি দিক হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে; কিন্তু প্রমাণ ছাড়া বাংলাদেশের নিখোঁজ শিশুদের সঙ্গে জঙ্গি সংগঠনের যোগসূত্র দাবি করা যাবে না।
জাতিসংঘের শিশু ও সশস্ত্র সংঘাতবিষয়ক দপ্তর জানিয়েছে, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো শিশুদের শুধু যোদ্ধা হিসেবেই ব্যবহার করে না; তাদের বার্তাবাহক, নজরদার, রসদ বহনকারী কিংবা অন্যান্য সহায়ক ভূমিকায়ও নিয়োগ করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে শিশুদের জোরপূর্বক সহিংস কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়েছে। জাতিসংঘের নথিতে শিশুদের আত্মঘাতী হামলাতেও ব্যবহারের নজির রয়েছে।
তথ্যসূত্র: জাতিসংঘের Office of the Special Representative of the Secretary-General for Children and Armed Conflict, Child Recruitment and Use।
এই আন্তর্জাতিক নজির বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা দেয়?
প্রথমত, কোনো শিশুর দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকা এবং তার সন্ধান না পাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী বিষয়। দ্বিতীয়ত, শিশু কোথায় রয়েছে তা শনাক্ত করার পাশাপাশি তাকে অপরাধচক্রের কবল থেকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা জরুরি। তৃতীয়ত, অপহরণ, পাচার, জোরপূর্বক শ্রম কিংবা সহিংস গোষ্ঠীতে নিয়োগের প্রমাণ পাওয়া গেলে সেসব অপরাধের ধরন অনুযায়ী তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
তবে মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের অপরাধের নজির বাংলাদেশের নিখোঁজ শিশুদের বিরুদ্ধে একই ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে—এমন প্রমাণ নয়।
4. আন্তর্জাতিকভাবে নথিভুক্ত শিশু নিয়োগ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের নজির
বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শিশুদের অপহরণ করে অথবা নানা প্রলোভন ও ভয়ভীতি দেখিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীতে যুক্ত করার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো।
ক. বোকো হারাম: অপহরণ ও আত্মঘাতী হামলায় শিশুদের ব্যবহার
নাইজেরিয়াকেন্দ্রিক জঙ্গি সংগঠন বোকো হারামের বিরুদ্ধে শিশু অপহরণ, হত্যা, যৌন সহিংসতা এবং শিশুদের আত্মঘাতী হামলায় ব্যবহারের বিষয়ে জাতিসংঘের একাধিক প্রতিবেদন রয়েছে।
জাতিসংঘের শিশু ও সশস্ত্র সংঘাতবিষয়ক দপ্তরের ৪ মে ২০১৭-এর প্রতিবেদনে ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে নাইজেরিয়া ও প্রতিবেশী অঞ্চলে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে শিশুদের ওপর গুরুতর নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরা হয়। ওই প্রতিবেদনে বোকো হারামের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে শিশু নিয়োগ, অপহরণ এবং আত্মঘাতী হামলায় শিশু ব্যবহারের প্রমাণিত ঘটনার উল্লেখ রয়েছে।
পরবর্তী সময়ের জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বোকো হারামের মাধ্যমে ১ হাজার ৩৮৫ শিশুর নিয়োগ ও ব্যবহারের তথ্য যাচাই করা হয়েছিল। এর মধ্যে অপহরণের মাধ্যমে শিশুদের যুক্ত করার ঘটনাও ছিল।
তথ্যসূত্র: জাতিসংঘ, Nigeria: UN report details ‘grave violations’ against children by Boko Haram, ৪ মে ২০১৭; জাতিসংঘের শিশু ও সশস্ত্র সংঘাতবিষয়ক দপ্তরের নাইজেরিয়াবিষয়ক প্রতিবেদন।
এই উদাহরণ প্রমাণ করে, সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শিশুদের জোরপূর্বক নিয়োগ এবং ভয়াবহ সহিংসতায় ব্যবহারের ঝুঁকি বাস্তব। তবে নাইজেরিয়ার ঘটনা দিয়ে বাংলাদেশের নিখোঁজ শিশুদের বিষয়ে কোনো সরাসরি সিদ্ধান্ত টানা যায় না।
খ. আল-শাবাব: শিশুদের সশস্ত্র গোষ্ঠীতে নিয়োগ
সোমালিয়াভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী আল-শাবাবের বিরুদ্ধে শিশু নিয়োগ ও ব্যবহারের অভিযোগ জাতিসংঘের শিশু ও সশস্ত্র সংঘাতবিষয়ক প্রতিবেদনে নথিভুক্ত হয়েছে।
জাতিসংঘের ২০২৩ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে সোমালিয়ার লোয়ার শাবেলে অঞ্চলে ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১০ শিশুকে আল-শাবাবের নিয়োগের একটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। শিশুদের পরে প্রশিক্ষণশিবিরে নিয়ে যাওয়ার তথ্যও ওই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।
তথ্যসূত্র: জাতিসংঘ, Children and Armed Conflict: Annual Report Summary 2023।
এ ধরনের ঘটনা দেখায়, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কখনো কখনো শিশুদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার করতে পারে। এ কারণে নিখোঁজ শিশুর সন্ধান পাওয়ার পর তার নিরাপত্তা, শারীরিক অবস্থা এবং সম্ভাব্য জবরদস্তি বা শোষণের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
গ. আইএসআইএস বা ইসলামিক স্টেট: শিশুদের উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার নজির
ইসলামিক স্টেট বা আইএসআইএসের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলে শিশুদের উগ্রবাদী মতাদর্শে প্রভাবিত করা এবং সশস্ত্র কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করার বিষয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও মানবাধিকার প্রতিবেদনে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
এই ধরনের নিয়োগ বা ব্যবহার শুধু অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিশুদের ওপর আদর্শিক প্রভাব বিস্তার, ভয়ভীতি, নির্যাতন কিংবা সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে তাদের আচরণ ও চিন্তাজগৎকে প্রভাবিত করার ঝুঁকিও রয়েছে।
তবে আইএসআইএস-সম্পর্কিত প্রতিটি অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট দেশ, সময়কাল, সংশ্লিষ্ট শাখা এবং নির্ভরযোগ্য নথির ভিত্তিতে তথ্য যাচাই করতে হবে। এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কোনো নিখোঁজ শিশুর সঙ্গে আইএসআইএসের সংশ্লিষ্টতার দাবি করা হচ্ছে না।
ঘ. লর্ডস রেজিস্ট্যান্স আর্মি: শিশু অপহরণ ও জোরপূর্বক নিয়োগ
আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয় লর্ডস রেজিস্ট্যান্স আর্মি বা এলআরএর বিরুদ্ধে শিশু অপহরণ, জোরপূর্বক সশস্ত্র দলে অন্তর্ভুক্ত করা এবং শিশুদের ওপর নির্যাতনের বহু নথিভুক্ত অভিযোগ রয়েছে।
এলআরএর মতো গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক শিশু সুরক্ষা আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এসব ঘটনায় অপহৃত শিশুদের শুধু সশস্ত্র কাজে ব্যবহার নয়, তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা এবং স্বাভাবিক সামাজিক জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার মতো গুরুতর ক্ষতির বিষয়ও উঠে এসেছে।
এ ধরনের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, শিশু উদ্ধার করাই শেষ কথা নয়; তাদের নিরাপদ পুনর্বাসন, পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলন এবং মানসিক সহায়তাও জরুরি।
আন্তর্জাতিক নজির থেকে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা
উল্লিখিত ঘটনাগুলোর কোনোটিই বাংলাদেশের নিখোঁজ শিশুদের জঙ্গি নিয়োগের প্রমাণ নয়। এগুলো আন্তর্জাতিকভাবে নথিভুক্ত ঝুঁকির উদাহরণ।
বাংলাদেশে কোনো শিশুকে অপহরণ করে সশস্ত্র বা উগ্রবাদী গোষ্ঠীতে নিয়োগ করা হয়েছে কি না, তা জানতে হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত, মামলার নথি, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং যাচাই করা গোয়েন্দা তথ্যের প্রয়োজন। শুধু নিখোঁজের সংখ্যা, গুজব কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট দিয়ে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা নয়।
5. নিখোঁজ শিশুরা কি অপরাধী চক্রের কবলে পড়ছে?
জঙ্গি নিয়োগের প্রশ্নের বাইরেও শিশুদের জন্য আরও কয়েকটি সম্ভাব্য ঝুঁকি রয়েছে। যেমন:
অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা।
মানব পাচার ও জোরপূর্বক শ্রম।
যৌন শোষণ ও নির্যাতন।
অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জোরপূর্বক ব্যবহার।
অনলাইন প্রলোভন, প্রতারণা ও ব্ল্যাকমেইল।
পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে অন্যত্র আটকে রাখা।
এগুলো সম্ভাব্য অনুসন্ধানের ক্ষেত্র; বাংলাদেশের নিখোঁজ শিশুদের মধ্যে কতজন এসব পরিস্থিতির শিকার হয়েছে, তার পৃথক নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান ছাড়া কোনো সংখ্যা উল্লেখ করা উচিত নয়।
তদন্তে দেখতে হবে, নিখোঁজ হওয়ার আগে শিশুর সঙ্গে কারা যোগাযোগ করেছিল, কোনো হুমকি বা প্রলোভনের ঘটনা ছিল কি না, পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছিল কি না, শিশুর পরিচয় বা অবস্থান গোপন করা হয়েছিল কি না এবং উদ্ধার হওয়ার পর সে কোনো জবরদস্তি বা নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছে কি না।
তবে এসব প্রশ্ন করার সময় শিশুর পরিচয় ও নিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে। কোনো শিশুকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা কিংবা তার ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করে তাকে নতুন ঝুঁকিতে ফেলা যাবে না।
6. নিখোঁজ শিশুদের অনুসন্ধানে রাষ্ট্রের কাছে ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
প্রকাশিত পরিসংখ্যানের আলোকে বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অপরাধ তদন্ত বিভাগ, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন এবং শিশু সুরক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলোর উত্তর চাওয়া প্রয়োজন।
এক. ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত নিখোঁজ হওয়া ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর মধ্যে ২ হাজার ৩৮ জনের বর্তমান অবস্থা কী?
দুই. ২০২৬ সালের ১ আগস্ট থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত নিখোঁজ শিশুদের নতুন কোনো সমন্বিত হিসাব প্রকাশ করা হয়েছে কি?
তিন. জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে নিখোঁজ হিসেবে নথিভুক্ত শিশুদের মধ্যে পরবর্তী সময়ে কতজনের সন্ধান পাওয়া গেছে? আগের ২ হাজার ৩৮ জনের মধ্যে কতজন এখনো নিখোঁজ?
চার. একই শিশুকে নিয়ে একাধিক সাধারণ ডায়েরি হয়েছে কি না, তা শনাক্ত করার ব্যবস্থা রয়েছে কি?
পাঁচ. নিখোঁজ শিশুদের মধ্যে কতজনের ক্ষেত্রে অপহরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং কতটি ঘটনায় মামলা হয়েছে?
ছয়. নিখোঁজ হওয়ার পর কত শিশুর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে? এসব ঘটনায় কতটি হত্যা মামলা হয়েছে এবং কতটির তদন্ত শেষ হয়েছে?
সাত. যেসব ঘটনায় হত্যার অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে কতটির অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে এবং কতটি মামলার বিচার চলছে?
আট. নিখোঁজ শিশুদের মধ্যে কতজন মানব পাচার, যৌন শোষণ, জোরপূর্বক শ্রম বা অন্য কোনো অপরাধের শিকার হয়েছে বলে তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেছে?
নয়. কোনো নিখোঁজ শিশুকে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ বা সহিংস উগ্রবাদে নিয়োগের চেষ্টা করা হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণিত মামলা রয়েছে কি? থাকলে তার সংখ্যা ও মামলার অবস্থা কী?
দশ. নিখোঁজ শিশুদের সন্ধানে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে কী ধরনের তথ্য বিনিময় ও সমন্বয় করা হয়?
এগারো. সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে নিখোঁজ শিশুদের আন্তজেলা বা আন্তসীমান্ত পাচারের ঝুঁকি যাচাইয়ের কোনো বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে কি?
বারো. অনলাইনে নিখোঁজের সাধারণ ডায়েরি গ্রহণের পর সংশ্লিষ্ট থানায় কত দ্রুত অনুসন্ধান শুরু হয় এবং জরুরি ঘটনার ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়?
তেরো. উদ্ধার হওয়া শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিরাপদ আশ্রয় এবং পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
চৌদ্দ. দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকা শিশুদের জন্য কি আলাদা জাতীয় অনুসন্ধান তালিকা বা নিয়মিত হালনাগাদ তথ্যভান্ডার রয়েছে?
পনেরো. নিখোঁজ শিশুর তথ্য হালনাগাদ না করা, অভিযোগ গ্রহণে বিলম্ব কিংবা অনুসন্ধানে অবহেলার অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা কী?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেলে নিখোঁজ শিশুদের প্রকৃত অবস্থা, অপরাধের ধরন এবং প্রতিরোধব্যবস্থার দুর্বলতা সম্পর্কে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য চিত্র পাওয়া সম্ভব।
7. জাতিসংঘের সতর্কতা: শিশুদের বিরুদ্ধে ছয়টি গুরুতর লঙ্ঘন
জাতিসংঘের শিশু ও সশস্ত্র সংঘাতবিষয়ক পর্যবেক্ষণব্যবস্থায় শিশুদের বিরুদ্ধে ছয়টি গুরুতর লঙ্ঘন চিহ্নিত করা হয়েছে:
8. শিশু হত্যা ও অঙ্গহানি।
9. সশস্ত্র বাহিনী বা গোষ্ঠীতে শিশু নিয়োগ ও ব্যবহার।
10. শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা।
11. স্কুল ও হাসপাতালে হামলা।
12. শিশু অপহরণ।
13. শিশুদের জন্য মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে বাধা দেওয়া।
জাতিসংঘের ১৭ জুন ২০২৬ প্রকাশিত ২০২৫ সালের সংঘাতবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বছরে শিশুদের বিরুদ্ধে ৩৮ হাজার ৫৫৮টি গুরুতর লঙ্ঘন যাচাই করা হয়েছিল এবং ২৪ হাজার ১৭৪ শিশু এসব লঙ্ঘনে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে ৬ হাজার ২৬৬ শিশুর নিহত হওয়া, ৭ হাজার ৯৫৮ শিশুর আহত বা অঙ্গহানির শিকার হওয়া এবং ৫ হাজার ১২৯ শিশুর অপহরণের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন লঙ্ঘনের শিকার শিশুদের মধ্যে একাধিক ধরনের নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনাও ছিল।
তথ্যসূত্র: জাতিসংঘ মহাসচিবের শিশু ও সশস্ত্র সংঘাতবিষয়ক প্রতিবেদন, ২০২৫ সালের তথ্য; প্রকাশিত ১৭ জুন ২০২৬।
এই পরিসংখ্যান বিশ্বব্যাপী সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে শিশুদের ঝুঁকির ভয়াবহতা তুলে ধরে। তবে এটি বাংলাদেশের নিখোঁজ শিশুদের পরিসংখ্যান নয় এবং বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে—এমন প্রমাণও নয়।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে একটি শিক্ষা স্পষ্ট: শিশুদের সুরক্ষার জন্য শুধু নিখোঁজের সংখ্যা সংগ্রহ করলেই হবে না। শিশুর সন্ধান পাওয়া, উদ্ধার, পুনর্বাসন এবং অপরাধের তদন্ত—প্রতিটি ধাপের তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে।
14. জাতীয় শিশু নিখোঁজ তথ্যভান্ডার এখন সময়ের দাবি
বাংলাদেশে নিখোঁজ শিশুদের বিষয়ে একটি সমন্বিত ও নিয়মিত হালনাগাদ তথ্যব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। সেখানে প্রতিটি শিশুর পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্য নিরাপদ রেখে অন্তত নিম্নলিখিত বিষয়গুলো অনুসরণ করা যেতে পারে:
নিখোঁজ হওয়ার তারিখ, স্থান ও ঘটনার বিবরণ।
অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্ত শুরুর সময়।
শিশুর সন্ধান পাওয়া গেছে কি না।
উদ্ধার হলে তারিখ ও বর্তমান নিরাপত্তার অবস্থা।
অপহরণ, পাচার, হত্যা বা অন্য অপরাধের অভিযোগ রয়েছে কি না।
মামলার তদন্ত ও বিচারিক অগ্রগতি।
পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলন এবং প্রয়োজনীয় পুনর্বাসনসেবা।
দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকা শিশুদের বিষয়ে নিয়মিত পর্যালোচনা।
এই তথ্যব্যবস্থা তৈরির সময় শিশুদের ছবি, পরিচয়, ঠিকানা ও ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার রোধ করতে হবে। জনসাধারণের জন্য প্রকাশিত তথ্য এবং তদন্তের প্রয়োজনে সংরক্ষিত গোপন তথ্য আলাদা রাখতে হবে।
জাতীয় তথ্যভান্ডারের উদ্দেশ্য হবে প্রতিটি শিশুর অবস্থা শনাক্ত করা, অনুসন্ধানের অগ্রগতি যাচাই করা এবং কোনো শিশু যেন নথির আড়ালে হারিয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করা।
15. সাংবাদিকতার দায়িত্ব: ভয় নয়, প্রমাণের ভিত্তিতে সত্য অনুসন্ধান
শিশু নিখোঁজের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের সময় তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, কোনো শিশুর সন্ধান না পাওয়ার তথ্যকে সরাসরি হত্যা, পাচার বা জঙ্গি নিয়োগের ঘটনা হিসেবে প্রচার করা যাবে না।
দ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here