বিদেশে যাচ্ছে ট্যানারি বর্জ্য, কাঁচামাল সংকটে বন্ধের শঙ্কায় জিলেটিন শিল্প

0
8

সাভারের বিসিক ট্যানারি শিল্পনগরী থেকে কাঁচা চামড়ার বর্জ্য বিদেশে রপ্তানি হওয়ায় কাঁচামাল সংকটে পড়েছে দেশের জিলেটিন শিল্প। প্রয়োজনীয় কাঁচামাল না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, তৈরি হয়েছে রপ্তানি আদেশ বাতিলের আশঙ্কাও। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশের একমাত্র জিলেটিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ জেডডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন কোম্পানি লিমিটেডের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংশ্লিষ্টরা।

এ অবস্থায় দেশীয় শিল্পের কাঁচামাল নিশ্চিত করতে কাঁচা চামড়ার বর্জ্য বা টুকরা (র হাইড ট্রিমিংস) রপ্তানি নিষিদ্ধ করার আবেদন জানিয়েছে বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএলএলএফইএ)। সংগঠনটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে এ আবেদন করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ জেডডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন কোম্পানি লিমিটেডের আবেদনও মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কাঁচা চামড়ার বর্জ্য জিলেটিন তৈরির অন্যতম প্রধান কাঁচামাল। সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরী থেকে এসব বর্জ্য সংগ্রহ করে পরিবেশসম্মত উপায়ে পুনঃপ্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে জিলেটিন ও শিল্পে ব্যবহৃত প্রোটিন পাউডার তৈরি করা হয়। পরে এসব পণ্য বিদেশে রপ্তানি করা হয়।

বাংলাদেশ জেডডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন কোম্পানি ও ইয়ংলি বায়োটেকনোলজিসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ট্যানারি বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে এসব পণ্য উৎপাদন করছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, দেশে এ ধরনের পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রম তারাই প্রথম শুরু করেছে। তবে কাঁচামালের সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় প্রভাব পড়ছে রপ্তানি কার্যক্রমেও।

আশুলিয়ার মির্জানগরের তাকসুরে অবস্থিত বাংলাদেশ জেডডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন কোম্পানি লিমিটেড ২০২৩ সালে চীনা বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটিকে দেশের প্রথম চামড়া ও ট্যানারি বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক লু চেংফেং সম্প্রতি কাঁচামাল সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে সরকারের কাছে আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৮ অক্টোবর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি দেয় বিএফএলএলএফইএ। চিঠিতে কাঁচা চামড়ার টুকরা বিদেশে রপ্তানি নিষিদ্ধ করার অনুরোধ জানানো হয়।

প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, বছরে পাঁচ হাজার মেট্রিক টন জিলেটিন উৎপাদন করতে প্রায় ৩০ হাজার মেট্রিক টন কাঁচা চামড়ার টুকরা প্রয়োজন। অথচ সারা দেশে বছরে এ ধরনের কাঁচামাল উৎপাদিত হয় প্রায় ২০ হাজার মেট্রিক টন। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, উৎপাদিত কাঁচামালের পুরোটাই দেশীয় কারখানাগুলোর পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের কাজে প্রয়োজন।

কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, কিছু ব্যবসায়ী এসব বর্জ্য সংগ্রহ করে বিদেশে রপ্তানি করছেন। প্রতি কেজি চামড়ার টুকরা ১৩ থেকে ১৪ টাকায় বিদেশে বিক্রি করা হচ্ছে। অন্যদিকে, একই কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি জিলেটিন প্রতি কেজি প্রায় ৬১০ টাকা বা পাঁচ মার্কিন ডলারে রপ্তানি করছে দেশীয় কারখানাটি।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, কাঁচামাল সরাসরি রপ্তানির পরিবর্তে দেশে প্রক্রিয়াজাত করা হলে তুলনামূলক বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে।

ট্যানারি শিল্পে উৎপন্ন বর্জ্যের মধ্যে প্রধানত দুই ধরনের উপাদান রয়েছে, যেগুলো পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল তৈরি করা যায়।

প্রথমটি হলো কাঁচা চামড়ার টুকরা বা ‘র হাইড ট্রিমিংস’। ট্যানারিতে চামড়া কাটার সময় আকার ঠিক করতে গিয়ে যে বাড়তি অংশ বাদ পড়ে, সেগুলোই এ ধরনের বর্জ্য। এসব টুকরা থেকে ফুড গ্রেড ও ফার্মা গ্রেড জিলেটিন তৈরি করা হয়।

ওষুধশিল্পে ক্যাপসুলের খোলস তৈরিতে জিলেটিন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এ ছাড়া জেলি, মার্শম্যালো, ক্যান্ডি, দুগ্ধজাত খাবারসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্য তৈরিতেও এটি ব্যবহৃত হয়।

দ্বিতীয় ধরনের বর্জ্য হলো ‘ওয়েট ব্লু ট্রিমিংস’ ও ‘ডাস্ট’। রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় চামড়াকে নীলচে অবস্থায় রূপান্তরের পর ছাঁটাইয়ের সময় এসব টুকরা ও গুঁড়া পাওয়া যায়। এগুলো থেকে তৈরি হয় শিল্পে ব্যবহৃত প্রোটিন পাউডার, যা চামড়া মসৃণ করা, সার উৎপাদনসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়। প্রসাধনী ও আলোকচিত্র শিল্পেও এ উপাদানের ব্যবহার রয়েছে।

শিল্প মালিকদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে জিলেটিনের উল্লেখযোগ্য চাহিদা রয়েছে। ফলে দেশীয়ভাবে এসব বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে রপ্তানি আয় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক খালি ক্যাপসুলের বাজার ২০২৫ সালে ৩ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০৩০ সালে ৪ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

এত বড় বাজারের সম্ভাবনা থাকলেও বাংলাদেশ এখনো জিলেটিন ও ক্যাপসুলের খোলস আমদানির ওপর নির্ভরশীল। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের জিলেটিন এবং ১ দশমিক ৯৮ মিলিয়ন ডলারের ক্যাপসুল শেল আমদানি করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো গেলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি রপ্তানি আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সে জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।

বিএফএলএলএফইএর চেয়ারম্যান টিপু সুলতান বলেন, কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কাঁচামালের অপ্রতুলতার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে প্রায় ২৫ লাখ মার্কিন ডলারের জিলেটিন রপ্তানির আদেশ পাওয়া গেলেও সময়মতো কাঁচামাল না পেলে এসব আদেশ বাতিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, কাঁচামাল রপ্তানি বন্ধ না হলে কারখানাটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

টিপু সুলতান আরও জানান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কাঁচা ও ওয়েট-ব্লু চামড়া রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে, তবে তা প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে বিবেচনা করে দেওয়ার কথা। অন্যদিকে, চামড়ার বর্জ্য রপ্তানির বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত রয়েছে, সে সম্পর্কে তাঁদের কাছে স্পষ্ট তথ্য নেই।

কারখানা কর্তৃপক্ষ ও বিনিয়োগকারীদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে এ বিনিয়োগ বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত প্রায় দেড় হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।

জিলেটিন উৎপাদন ব্যাহত হলে এর ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য শিল্পেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। দেশীয় শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থার ক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ জেডডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক লু চেংফেং সাভারের বিসিক ট্যানারি শিল্পনগরী থেকে কাঁচা চামড়ার বর্জ্য বিদেশে রপ্তানি বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

তাঁর মতে, দেশীয় জিলেটিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশি বিনিয়োগ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় শিল্পকারখানার জন্য কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

লু চেংফেং বলেন, কাঁচা চামড়ার টুকরা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি হওয়ায় এ নিয়ে প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি হয়েছে। তবে ওয়েট-ব্লু ডাস্ট ও ট্রিমিংসের সরবরাহ এখন তাঁদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে তাঁরাই প্রথম এসব বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াজাতের কাজ শুরু করেছেন। পরিবেশের জন্যও এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে ট্যানারি বর্জ্যকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য শিল্পের কাঁচামালে রূপান্তর করা সম্ভব হচ্ছে।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, ট্যানারি বর্জ্য রপ্তানি ও দেশীয় শিল্পের কাঁচামালের চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যথাযথ নীতিগত সিদ্ধান্ত ও সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে বর্জ্যকে মূল্য সংযোজিত পণ্যে রূপান্তর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here