ডিসি ও বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে ৫.০৭ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা

0
7

দেশের বিভিন্ন জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয় ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের ছাদে স্থাপন করা হয়েছে ৫ দশমিক ০৭ মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা। এসব ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং নেট মিটারিং কার্যকর করা গেলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয়ের পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরশীলতাও কমানো সম্ভব হবে।

সরকারি ভবনে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর এ উদ্যোগ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণেও ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচির অগ্রগতিবিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত দেশের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়গুলোতে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৪ হাজার ৬৬৩ কিলোওয়াট। অন্যদিকে, পাঁচটি বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে স্থাপিত ব্যবস্থার সক্ষমতা ৪০৫ দশমিক ৫ কিলোওয়াট। সব মিলিয়ে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৫ কোটি ১৪ লাখ ৮৬ হাজার টাকা।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকারি কার্যালয়গুলোর ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হলেও নেট মিটারিংয়ের অনুমোদনসহ কয়েকটি প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি। এসব কার্যক্রম শেষ হলে উৎপাদিত বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিল সাশ্রয়ের সুযোগ বাড়বে। দিনের বেলায় কার্যালয়গুলোর বিদ্যুৎ চাহিদার একটি অংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণ করা গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপও কমবে।

ঢাকা বিভাগ: এ বিভাগের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়গুলোর মধ্যে কিশোরগঞ্জে সর্বোচ্চ ৩৬০ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া মানিকগঞ্জে ৭৭, গোপালগঞ্জে ৭৩, ফরিদপুরে ৫৯, ঢাকা ও রাজবাড়ীতে ৫০ করে, শরীয়তপুরে ২৪ এবং গাজীপুরে ১০ কিলোওয়াট সক্ষমতার ব্যবস্থা রয়েছে। এসব প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৮৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা।

খুলনা বিভাগ: খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ১৮০ কিলোওয়াট, মেহেরপুরে ৮০ কিলোওয়াট, ঝিনাইদহ ও নড়াইলে ৬০ কিলোওয়াট করে এবং বাগেরহাটে ৫০ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। জেলা পর্যায়ের এসব প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৭৪ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। এ ছাড়া খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ২০০ কিলোওয়াট সক্ষমতার ব্যবস্থা স্থাপনে ব্যয় হয়েছে ৭৮ লাখ ৯৭ হাজার টাকা।

রংপুর বিভাগ: এ বিভাগের দিনাজপুরে ১৫১, গাইবান্ধায় ১২২, ঠাকুরগাঁওয়ে ৫০, নীলফামারীতে ৪৮, কুড়িগ্রামে ৪৫, রংপুরে ২৯, পঞ্চগড়ে ২৫ এবং লালমনিরহাটে ২০ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে। জেলা পর্যায়ের প্রকল্পগুলোতে ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৮ লাখ ৫২ হাজার টাকা। বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ৭৭ দশমিক ৫ কিলোওয়াট সক্ষমতার ব্যবস্থা স্থাপনে ব্যয় হয়েছে ৩৬ লাখ ৮৭ হাজার টাকা।

রাজশাহী বিভাগ: সিরাজগঞ্জে ১৫০, নওগাঁয় ১০৫, বগুড়ায় ১০০, রাজশাহীতে ৫০, পাবনায় ৪৭ দশমিক ২৬, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩০ করে এবং জয়পুরহাটে ১৩ দশমিক ১২৫ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এসব প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৪৮ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। অন্যদিকে, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ৩৮ কিলোওয়াট সক্ষমতার ব্যবস্থা স্থাপনে ব্যয় হয়েছে ১৮ লাখ ২১ হাজার টাকা।

সিলেট বিভাগ: মৌলভীবাজারে ১৮০, সিলেটে ১০০, সুনামগঞ্জে ৯০ এবং হবিগঞ্জে ১০ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে। এ বিভাগের জেলা পর্যায়ের প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৫৪ লাখ ৮ হাজার টাকা। বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ৭০ কিলোওয়াট সক্ষমতার ব্যবস্থা স্থাপনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৭ লাখ ৩৩ হাজার টাকা।

চট্টগ্রাম বিভাগ: এ বিভাগের নোয়াখালীতে ২২৫, কক্সবাজারে ৮৫, চাঁদপুরে ৫০, ফেনীতে ৪৫, বান্দরবানে ৪১ এবং চট্টগ্রাম জেলায় ৩৯ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। জেলা পর্যায়ের এসব প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ২৮ লাখ ৯৪ হাজার টাকা।

বরিশাল বিভাগ: বরগুনায় ৬০ এবং পিরোজপুর, পটুয়াখালী ও ঝালকাঠিতে ৫০ কিলোওয়াট করে সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে। এসব প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছে ৪১ লাখ ২১ হাজার টাকা। বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ২০ কিলোওয়াট সক্ষমতার ব্যবস্থা স্থাপনে ব্যয় হয়েছে ৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা।

ময়মনসিংহ বিভাগ: এ বিভাগের জামালপুর ও নেত্রকোনায় ১০০ কিলোওয়াট করে, শেরপুরে ৬০ এবং ময়মনসিংহ জেলায় ৫০ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। তবে এ বিভাগের প্রকল্পগুলোর ব্যয়ের তথ্য পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদনে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সক্ষমতা ও ব্যয়ের তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় ভাড়া ভবনে পরিচালিত হওয়ায় সেখানে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।

এ ছাড়া ঢাকা বিভাগের টাঙ্গাইল, মাদারীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জে দরপত্র আহ্বান করা হলেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা যায়নি। খুলনা বিভাগের চুয়াডাঙ্গায় বরাদ্দের তুলনায় দরপত্রের প্রস্তাবিত মূল্য বেশি হওয়ায় কাজ এগোয়নি। বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠিতে বরাদ্দ থাকলেও অর্থ ব্যয় করা হয়নি।

অন্যদিকে, বরিশাল বিভাগের বরিশাল ও ভোলা এবং চট্টগ্রাম বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, খাগড়াছড়ি, লক্ষ্মীপুর ও রাঙামাটিতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সক্ষমতাসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।

সরকার নিজস্ব অর্থায়নে ক্যাপেক্স মডেলে এসব সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করেছে। এর ফলে সরকারি কার্যালয়গুলো দিনের বেলায় নিজেদের বিদ্যুৎ চাহিদার একটি অংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণ করতে পারছে। এতে জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

নেট মিটারিং চালু হলে প্রয়োজনের অতিরিক্ত উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে বিল সমন্বয় করা সম্ভব। তবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়গুলোর নেট মিটারিংয়ের আবেদন এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) শরীয়তপুর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ২৪ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। তবে নেট মিটারিংয়ের আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়ায় অতিরিক্ত বিদ্যুতের বিপরীতে বিল সমন্বয় এখনো শুরু হয়নি।

ওজোপাডিকোর তথ্য অনুযায়ী, শরীয়তপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রতি মাসে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৫ হাজার ইউনিট। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালুর পর থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৮০০ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। এতে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নেওয়ার প্রয়োজন কমছে এবং কার্যালয়টির বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় হচ্ছে।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) লিড অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম বলেন, জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে স্থাপিত ৫ মেগাওয়াটের বেশি সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা জাতীয় পর্যায়ে বড় ধরনের অবদান না রাখলেও এর কার্যকর ব্যবহার অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি ভবনে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।

তিনি বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্রসারে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ পর্যায়ে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে নেট মিটারিং সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা কমাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন ও নেট মিটারিং সংযোগের কার্যক্রম সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায় বলেন, সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের কর্মসূচির আওতায় মেহেরপুরে ইতোমধ্যে ৮০ কিলোওয়াট সক্ষমতার ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর বিদ্যুতের চাহিদাজনিত চাপ কমাতে সহায়তা করবে। বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মোকাবিলা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। এ ক্ষেত্রে সরকারি ভবনের ছাদ ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-২০৩০’ গ্রহণ করা হয়েছে। এ কৌশলপত্রে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে ১০ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।

টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা ১ হাজার ৯৩৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা ১ হাজার ৬৪২ মেগাওয়াট, যা দেশের মোট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ।

সরকারি কার্যালয়ের ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার, নেট মিটারিং দ্রুত কার্যকর করা এবং নতুন স্থাপনা সম্প্রসারণের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আরও অগ্রগতি সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here