নারীর আর্থিক ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বিকাশ

0
8

ঢাকার উত্তরার একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক সানিয়া আরজু। বছর শেষে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলেছেন তিনি। এ জন্য বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমে খুলেছেন ডিপিএস। গত দেড় বছর ধরে প্রতি মাসে দুই হাজার টাকা করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমা হচ্ছে তাঁর হিসাবে। চাকরি, সংসার ও অন্যান্য ব্যস্ততার মধ্যেও বাড়তি ঝামেলা ছাড়াই সঞ্চয় করতে পারছেন তিনি। শুধু নিজের জন্যই নয়, গৃহসহকারীর ভবিষ্যৎ সঞ্চয়ের কথা বিবেচনা করেও তাঁর বিকাশ অ্যাপে একটি ডিপিএস খুলে দিয়েছেন।

২০২১ সালে বিকাশ অ্যাপে ডিপিএস খোলার সুবিধা চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৭০ লাখের বেশি ডিপিএস খোলা হয়েছে। এর মধ্যে ৩০ শতাংশের বেশি নারী গ্রাহকের।

শুধু সঞ্চয় নয়, বিকাশের মতো মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারীর দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনকে সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তুলেছে। নিজের প্রয়োজন ও সুবিধা অনুযায়ী সেবা ব্যবহারের সুযোগ নারীদের মধ্যে এ ধরনের ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা বাড়াচ্ছে। সাধারণ একটি মোবাইল ফোন ও একটি নম্বর ব্যবহার করেই প্রান্তিক নারীদের মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

মোবাইল আর্থিক সেবায় নারী ও পুরুষ গ্রাহকের হিসাবসংখ্যার ব্যবধান ক্রমেই কমছে। নারীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে এ প্রবণতাকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিকাশের মতো এমএফএস সেবা নারীদের আর্থিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি নিজেদের অর্থ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাও বাড়াচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে দেশে এমএফএস হিসাবের সংখ্যা ছিল ২৫ কোটির বেশি। এর মধ্যে ১০ কোটিরও বেশি হিসাব ছিল নারী গ্রাহকদের। হিসাব খোলার ক্ষেত্রে শহরের নারীদের তুলনায় গ্রামীণ নারীদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য। এমএফএস ব্যবহারের মাধ্যমে নারীরা নিজেদের অর্থের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ পাচ্ছেন। পারিবারিক ব্যয় মেটানোর পর সঞ্চিত অর্থের একটি অংশ তাঁরা ছোট ব্যবসা কিংবা আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে বিনিয়োগ করতে পারছেন।

এরই একটি উদাহরণ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আফসানা পারভীন। পড়াশোনা শেষ করে তিনি শুরু করেন অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা। বর্তমানে অল্প কয়েকজন কর্মী নিয়ে ফেসবুক পেজের মাধ্যমে পরিচালনা করছেন নিজের অনলাইন স্টোর।

আফসানা পারভীন বলেন, মফস্বল শহরে বসেও তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রাহকদের কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারছেন। বিকাশের মতো মোবাইল আর্থিক সেবার ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা তাঁর ব্যবসাকে সহজ করেছে। পরিবারের জন্য সময় দেওয়ার পাশাপাশি উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের আয় তাঁকে আলাদা আত্মতৃপ্তি দেয়।

তাঁর ভাষায়, স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ডিজিটাল লেনদেনের ভূমিকা অনেক। উপযুক্ত সুযোগ পেলে যেকোনো পরিস্থিতি থেকেই নারীরা ঘুরে দাঁড়াতে পারেন। তাঁর মতো এমন অনেক নারীই এখন অনলাইন ব্যবসার মাধ্যমে নিজেদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন করছেন।

শুধু কর্মজীবী কিংবা উদ্যোক্তা নারী নন, গৃহিণীরাও মোবাইল আর্থিক সেবার সুবিধা পাচ্ছেন। ঢাকার গৃহিণী নাজনীন জামান জানান, বিকাশ ব্যবহারের ফলে নগদ টাকা বহন ও সংরক্ষণের দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমেছে। কেনাকাটা, বিভিন্ন বিল পরিশোধ, মোবাইল রিচার্জ কিংবা সন্তানদের টাকা পাঠানোর মতো কাজে তিনি বিকাশ অ্যাপ ব্যবহার করেন। পাশাপাশি সঞ্চয়ের সুবিধাও কাজে লাগাচ্ছেন। জরুরি প্রয়োজনে বিকাশ অ্যাপের ডিজিটাল ঋণসেবাকেও তিনি সহায়ক হিসেবে দেখেন।

এমএফএসে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ার পেছনে রয়েছে বেশ কিছু ব্যবহারবান্ধব সুবিধা। ই-কেওয়াইসি পদ্ধতিতে সহজে হিসাব খোলার সুযোগ, সরাসরি মোবাইল রিচার্জ, দেশে-বিদেশে থাকা স্বজনদের পাঠানো অর্থ দ্রুত গ্রহণ এবং সরকারি ভাতা ও পোশাকশ্রমিকদের বেতন মোবাইল ওয়ালেটে পাওয়ার সুবিধা নারীদের আর্থিক সেবার আওতায় আনতে সহায়তা করছে।

এ ছাড়া বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির বিল পরিশোধ, সন্তানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফি দেওয়া, ই-কমার্স ও এফ-কমার্সসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার লেনদেন এবং ব্যাংক হিসাব বা কার্ড থেকে এমএফএস হিসাবে অর্থ স্থানান্তরের সুবিধা নারীদের আর্থিক কার্যক্রমকে আরও সহজ করেছে। এসব সেবা নিতে ব্যাংকের শাখায় যাওয়ার প্রয়োজন কমায় সময় ও যাতায়াতের খরচও সাশ্রয় হচ্ছে। ফলে কর্মজীবী, উদ্যোক্তা ও স্বাবলম্বী নারীরা নিজেদের অর্থ ব্যবস্থাপনায় আরও বেশি স্বাধীনতা পাচ্ছেন।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ‘ইমপ্যাক্ট অব মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস ইন বাংলাদেশ—দ্য কেস অব বিকাশ’ শীর্ষক গবেষণায় মোবাইল আর্থিক সেবা ব্যবহারের সঙ্গে নারীর ক্ষমতায়নের ইতিবাচক সম্পর্ক উঠে এসেছে।

গবেষণায় নারীর চলাচলের স্বাধীনতা, পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা, আর্থিক বিষয়ে মতামত ও নিয়ন্ত্রণ, আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ, শ্রমবাজার থেকে উপার্জন এবং গয়না ও পারিবারিক সঞ্চিত অর্থের ওপর মালিকানাসহ বিভিন্ন সূচক বিবেচনা করা হয়। এসব সূচকের প্রায় সবকটিতেই বিকাশ ব্যবহারকারী নারীদের ইতিবাচক অবস্থান দেখা গেছে।

গবেষণার ফল অনুযায়ী, আর্থিক সম্পদের ওপর মালিকানার ক্ষেত্রে বিকাশ ব্যবহারকারী নারীরা এ সেবা ব্যবহার করেন না এমন নারীদের তুলনায় ২০ শতাংশ এগিয়ে রয়েছেন। চলাচলের স্বাধীনতা ও পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও তাঁদের তুলনামূলক অগ্রগতি লক্ষ করা গেছে।

এর অন্যতম কারণ হিসেবে আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে নারীদের বেশি অংশগ্রহণের বিষয়টি উঠে এসেছে। বিআইডিএসের গবেষণায় বলা হয়েছে, এমএফএস ব্যবহারের সঙ্গে নারীর আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ ৯ শতাংশীয় পয়েন্ট বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে এমএফএস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ডিজিটাল আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে এ খাত নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের যৌথ গবেষণা ‘ক্লোজিং দ্য জেন্ডার গ্যাপ: অপরচুনিটিজ ফর দ্য উইমেন’স মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল মার্কেট ইন বাংলাদেশ’-এ নারীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর বিভিন্ন সুযোগ তুলে ধরা হয়েছে। এতে এমএফএস খাতে নারী এজেন্টের সংখ্যা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে নারীরা সহজে ও স্বাচ্ছন্দ্যে আর্থিক সেবা নিতে পারেন।

গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এমএফএসের মাধ্যমে নারীদের জন্য আমানত রাখার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণসেবা সহজলভ্য করা গেলে তাঁদের আর্থিক সক্ষমতা ও ক্ষমতায়ন আরও জোরদার হতে পারে।

সব মিলিয়ে, ডিজিটাল লেনদেন, সঞ্চয়, অর্থ গ্রহণ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বাড়াচ্ছে। বিকাশের মতো মোবাইল আর্থিক সেবা নারীদের জন্য অর্থ ব্যবস্থাপনার নতুন পথ তৈরি করার পাশাপাশি তাঁদের স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার সুযোগও প্রসারিত করছে। আর এই অগ্রগতি দীর্ঘ মেয়াদে পরিবার, সমাজ ও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here