চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: নানা অভিযোগ, একাধিক মামলা, পুলিশের গ্রেপ্তার অভিযান এবং নগর ভবনকে ঘিরে আলোচিত ঘটনার পর অবশেষে আদালতের নির্দেশে কারা হেফাজতে গেলেন ওয়াকিল হোসেন ওরফে ‘বগা’। সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের সম্পাদক শেখ মুহাম্মদ আরিফের করা মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করলে আদালত তাঁর জামিন নামঞ্জুর করেন। চট্টগ্রাম আদালত সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সাংবাদিক আরিফের মামলায় কী অভিযোগ?
প্রথম আলোর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রাম খবরের সম্পাদক ও প্রকাশক শেখ মুহাম্মদ আরিফ খুলশী থানায় ওয়াকিল হোসেনসহ ৩৭ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। মামলায় প্লট দখল, চাঁদাবাজি ও অপহরণের অভিযোগ আনা হয়েছে। এজাহারে আরও ১৫০ থেকে ২০০ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির কথা উল্লেখ রয়েছে।
মামলার অভিযোগে আরিফ দাবি করেছেন, তাঁকে ১১ ফেব্রুয়ারি ও ২৫ এপ্রিল অপহরণ করে ওয়াকিলের আস্তানায় নিয়ে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। এসব অভিযোগের সত্যতা আদালতে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। অভিযোগ দায়ের হওয়া মানেই কারও অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়।
কে এই ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা?
ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক। শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগে ২০২৬ সালের ৮ জুন তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। পুলিশের বক্তব্য ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, খুলশী, পাহাড়তলী ও আকবর শাহ এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক, জমি দখল, অস্ত্র ও বিস্ফোরকসংক্রান্ত অভিযোগসহ তাঁর বিরুদ্ধে অন্তত ১৭টি মামলা রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে বিভিন্ন মামলার বর্তমান অবস্থা, জামিন এবং অভিযোগের বিচারিক অগ্রগতি আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
পুলিশের অভিযানে সংঘর্ষ ও গোপন সুড়ঙ্গের ঘটনা
গত ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ভোরে খুলশীর ওয়্যারলেস এলাকায় বগাকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালায় পুলিশ। পুলিশের দাবি, এ সময় তাঁর সহযোগীরা সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ও ককটেলসদৃশ বস্তু নিক্ষেপ করে। এতে খুলশী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুর রহিমসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন এবং পুলিশের একটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অভিযান শেষে বগার বাসায় তল্লাশি চালিয়ে একটি গোপন সুড়ঙ্গের সন্ধান পাওয়ার কথা জানায় পুলিশ। পুলিশের ধারণা, ওই পথ ব্যবহার করেই তিনি পালিয়ে যান। ঘটনাটি সে সময় দেশব্যাপী সংবাদমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেয়।
নগর ভবনে অভিযান ও ওসি বদলি
গত ৭ অক্টোবর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নগর ভবনে বগাকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে পুলিশের অভিযান নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযান চলাকালে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে পুলিশের বাগ্বিতণ্ডা হয় এবং শেষ পর্যন্ত পুলিশ অভিযান শেষ না করেই ফিরে আসে বলে অভিযোগ ওঠে।
এরপর খুলশী থানার তৎকালীন ওসি আবদুর রহিমকে প্রথমে অন্যত্র বদলি এবং পরে খুলনা পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে পদায়ন করা হয় বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। তবে বদলির সঙ্গে অভিযানসংক্রান্ত ঘটনার সম্পর্ক নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তার চূড়ান্ত কারণ সম্পর্কে সরকারি আদেশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যই নির্ভরযোগ্য ভিত্তি।
বগার পরিবারের পাল্টা অভিযোগও রয়েছে
বগার বিরুদ্ধে অভিযোগের পাশাপাশি পুলিশের অভিযানের বিষয়ে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকেও অভিযোগ তোলা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর বাবা জাবেদ পুলিশের কয়েকজন সদস্যসহ অন্য ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বাড়িতে ভাঙচুর ও মূল্যবান সামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগে আদালতে মামলা করেন। আদালত অভিযোগ তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
অন্যদিকে, বগার ভাই রকি হোসেন সংবাদমাধ্যমের কাছে দাবি করেছিলেন, রাজনৈতিকভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে তাঁর ভাইয়ের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। ফলে এ ঘটনায় একদিকে অভিযোগকারীদের বক্তব্য, অন্যদিকে অভিযুক্তের পরিবারের বক্তব্য এবং পুলিশের দাবি—সবকিছুরই নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
জামিন নামঞ্জুর, এখন নজর বিচারিক প্রক্রিয়ায়
সাংবাদিক আরিফের মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণের পর বগার জামিন আবেদন নামঞ্জুর হওয়া এবং তাঁকে কারা হেফাজতে পাঠানোর ঘটনা মামলাটির পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এ আদেশের অর্থ অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত বিচার সম্পন্ন হওয়া নয়। মামলার নথি, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও আইনগত যুক্তির ভিত্তিতেই আদালত পরবর্তী সিদ্ধান্ত দেবেন।
চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নাগরিক নিরাপত্তা, সাংবাদিকের পেশাগত স্বাধীনতা এবং অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ—সবকিছুই এ ঘটনার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে জড়িত। অভিযোগকারী যেমন ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রাখেন, তেমনি অভিযুক্ত ব্যক্তিরও ন্যায়সংগত বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সাংবাদিক আরিফের মামলার তদন্ত ও বিচার কত দ্রুত এগোয়, অভিযোগগুলোর পক্ষে কী প্রমাণ উপস্থাপিত হয় এবং আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত কী আসে। চট্টগ্রামবাসীর প্রত্যাশা, কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব নয়, বরং আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতেই প্রতিটি অভিযোগের নিষ্পত্তি হবে।

