মো. কামাল উদ্দিন
ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনের কোলাহল পেরিয়ে তুরাগ নদীর তীরে এসে দাঁড়ালে মনে হয়, সময় যেন এখানে এসে কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছে। চারপাশে মানুষের ছুটে চলা, নগরায়ণের বিস্তার, আধুনিক স্থাপনার উত্থান আর জীবনের প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝেও নদী তার নিজস্ব ভাষায় বয়ে চলেছে। কখনো শান্ত, কখনো চঞ্চল, কখনো স্মৃতিময়, আবার কখনো মানুষের অবহেলা ও নিষ্ঠুরতার নীরব সাক্ষী হয়ে।
গত ১৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় ঢাকার ওপারে সিলিকন সিটি পরিদর্শনে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে পৌঁছানোর পথে তুরাগ নদী পার হতে হলো। নদী পার হওয়ার সেই যাত্রা ছিল আমার দিনের কর্মব্যস্ততার একটি অংশ। কিন্তু কখনো কখনো জীবনের সাধারণ কোনো মুহূর্তই অসাধারণ হয়ে ওঠে, যদি মানুষ একটু থেমে চারপাশের পৃথিবীকে অনুভব করতে পারে।
সিলিকন সিটি পরিদর্শন শেষে তুরাগের তীরে কিছুটা সময় কাটালাম। তখন দিনের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছিল। পশ্চিম আকাশে অস্তগামী সূর্য তার শেষ সোনালি আভা ছড়িয়ে দিচ্ছিল। নদীর বুকে সূর্যের প্রতিচ্ছবি যেন তরল সোনার রেখা হয়ে ঢেউয়ের সঙ্গে দুলছিল। দূরের সবুজ বৃক্ষরাজি, নদীর বিস্তৃত জলরাশি, গোধূলির কোমল আলো আর চারপাশের নিস্তব্ধতা মিলে তৈরি করেছিল এক মায়াবী পরিবেশ।
সেই দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো, পৃথিবীর সব সৌন্দর্যকে শব্দে প্রকাশ করা যায় না। কিছু সৌন্দর্য শুধু অনুভব করতে হয়, হৃদয়ের গভীরে ধারণ করতে হয়। কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলোকে ধরে রাখার জন্য কোনো আয়োজনের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন হয় শুধু একটি সংবেদনশীল মন।
তাই তুরাগের তীরে দাঁড়িয়ে একটি ছবি তুলে রাখলাম। ছবিটি আমার কাছে নিছক একটি আলোকচিত্র নয়। এটি ১৩ অক্টোবরের একটি সন্ধ্যার স্মারক, কর্মব্যস্ত জীবনের মাঝখানে প্রকৃতির সান্নিধ্যে কাটানো কিছু মুহূর্তের দলিল এবং একজন লেখকের অন্তর্গত অনুভূতির প্রতিচ্ছবি।
ছবিতে আমি দাঁড়িয়ে আছি নদীর পাড়ে। পেছনে বয়ে চলেছে তুরাগ, ওপরে বিস্তৃত আকাশ, আর দূরে ডুবে যাচ্ছে সূর্য। দৃশ্যটি দেখতে সাধারণ মনে হলেও এর মধ্যে লুকিয়ে আছে জীবনের এক গভীর দর্শন। মানুষ আসে, মানুষ চলে যায়, সময় তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলে; অথচ প্রকৃতি নীরবে যুগের পর যুগ ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে।
তুরাগ নদী: ইতিহাস, জনপদ ও সভ্যতার এক প্রবহমান অধ্যায়
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এ দেশের ভূপ্রকৃতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, কৃষি, যোগাযোগব্যবস্থা ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে নদীর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। নদী এ দেশের মানুষের কাছে কেবল পানির উৎস নয়; নদী জীবিকার অবলম্বন, যাতায়াতের পথ, জনপদ গড়ে ওঠার ভিত্তি এবং সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতির এক চিরন্তন অনুষঙ্গ।
ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর মধ্যে তুরাগ একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী। এর উৎপত্তি বংশী নদী থেকে। গাজীপুর অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে তুরাগ ঢাকার উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে এবং মিরপুরের কাছে বুড়িগঙ্গার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে এই নদী বৃহত্তর ঢাকা অঞ্চলের নৌযোগাযোগ, পানি নিষ্কাশন, পরিবেশ ও জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
নদীর ইতিহাস মানে শুধু তার উৎপত্তি ও প্রবাহপথের ইতিহাস নয়। নদীর দুই তীরে গড়ে ওঠা মানুষের জীবন, জীবিকা, ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক সম্পর্ক এবং সাংস্কৃতিক বিকাশের ইতিহাসও নদীর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
একসময় নদীপথ ছিল বাংলাদেশের যোগাযোগব্যবস্থার অন্যতম প্রধান অবলম্বন। নৌকা, পালতোলা নৌযান ও বিভিন্ন ধরনের জলযানের মাধ্যমে মানুষ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করত। কৃষিপণ্য, নির্মাণসামগ্রী এবং ব্যবসায়িক পণ্য পরিবহনে নদীর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। নদীর তীর ঘিরে গড়ে উঠত হাটবাজার, জনবসতি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
তুরাগও বৃহত্তর ঢাকা অঞ্চলের সেই নদীনির্ভর জীবনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর জলধারা বহু মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। কারও কাছে নদী জীবিকার পথ, কারও কাছে যাতায়াতের মাধ্যম, কারও কাছে জীবনের স্মৃতি, আবার কারও কাছে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগের স্থান।
ইতিহাসের দিকে তাকালে উপলব্ধি করা যায়, নদী কখনো নিছক ভৌগোলিক সীমানা নয়। নদী মানুষের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি করে, জনপদকে যুক্ত করে, অর্থনীতিকে সচল রাখে এবং সভ্যতার বিকাশে ভূমিকা পালন করে।
তুরাগের তীরেও সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে মানুষের জীবন। বদলেছে বসতি, যোগাযোগব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নগরায়ণের ধরন। আধুনিক ঢাকা যত বিস্তৃত হয়েছে, তুরাগের চারপাশও তত বেশি নগরজীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের ভেতরে একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসে: উন্নয়নের যাত্রায় আমরা আমাদের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যকে কতটা সুরক্ষিত রাখতে পেরেছি?
সিলিকন সিটির সম্ভাবনা ও আধুনিক নগরায়ণের নতুন দিগন্ত
সিলিকন সিটি পরিদর্শনে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আমাকে আধুনিক নগরায়ণ ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে ভাবিয়েছে।
একটি আধুনিক নগর শুধু ভবন, সড়ক, অবকাঠামো কিংবা বাণিজ্যিক স্থাপনার সমষ্টি নয়। একটি নগরের প্রকৃত পরিচয় তৈরি হয় তার পরিকল্পনা, নাগরিক সুবিধা, পরিবেশগত ভারসাম্য, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান দিয়ে।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে প্রযুক্তি ও আধুনিকতার বিকাশ ঘটবে, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, তরুণ প্রজন্ম নিজেদের মেধা ও যোগ্যতা বিকাশের ক্ষেত্র পাবে এবং নগরজীবন আরও পরিকল্পিত ও মানবিক হয়ে উঠবে।
কিন্তু আধুনিকতার অর্থ কখনো প্রকৃতিকে বিসর্জন দেওয়া হতে পারে না। উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্ক হতে হবে সহযোগিতার, সংঘাতের নয়। নতুন নগর গড়ে উঠবে, শিল্প ও প্রযুক্তির প্রসার ঘটবে, মানুষের জীবন হবে আরও গতিশীল; একই সঙ্গে নদী, খাল, জলাভূমি, সবুজ অঞ্চল এবং প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্যও সংরক্ষিত থাকবে।
আমার বিশ্বাস, প্রকৃত উন্নয়ন সেই উন্নয়ন, যা বর্তমান প্রজন্মকে সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যায়।
সিলিকন সিটির মতো আধুনিক স্থাপনা পরিদর্শনের পর তুরাগ নদীর তীরে দাঁড়িয়ে এই ভাবনাটি আরও গভীরভাবে অনুভব করেছি। একদিকে আধুনিক নগরায়ণের সম্ভাবনা, অন্যদিকে নদীর চিরন্তন প্রবাহ। একটি আমাদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখায়, অন্যটি আমাদের অতীতের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।
এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই উন্নয়ন হবে সত্যিকার অর্থে টেকসই ও মানবকল্যাণমুখী।
তুরাগের সৌন্দর্য ও পরিবেশের নীরব আর্তনাদ
নদীর তীরে দাঁড়িয়ে অস্তগামী সূর্যের সৌন্দর্য উপভোগ করার সময় প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা যেমন অনুভব করেছি, তেমনি তুরাগের ভবিষ্যৎ নিয়েও মনে প্রশ্ন জেগেছে।
তুরাগ নদী আজ পরিবেশগত নানা সংকটের মুখোমুখি। গবেষণায় নদীটির পানিদূষণ, শিল্পবর্জ্য ও গৃহস্থালি বর্জ্যের প্রবাহ, নদীর তীর দখল, পলি জমা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয় উঠে এসেছে। এসব সমস্যা নদীর পানির গুণগত মান, জলজ প্রাণীর আবাসস্থল এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
একটি নদী যখন দূষিত হয়, তখন শুধু তার পানি নষ্ট হয় না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি বিস্তৃত পরিবেশব্যবস্থা। মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জীবন বিপন্ন হয়, নদীকেন্দ্রিক মানুষের জীবিকা সংকুচিত হয় এবং মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
নদীর তীর দখল করে স্থাপনা নির্মাণ, অপরিশোধিত বর্জ্য ফেলা কিংবা স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা, নাগরিক দায়িত্ব, পরিবেশ আইন বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতা।
আমি মনে করি, নদী রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, নাগরিক সমাজ, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, নগর পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশকর্মী এবং সাধারণ মানুষেরও রয়েছে। তবে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ, দখল ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য শোধন এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা যদি নদীকে শুধু জমির সীমানা কিংবা বাণিজ্যিক সম্ভাবনার দৃষ্টিতে দেখি, তাহলে তার প্রকৃত মূল্য অনুধাবন করতে ব্যর্থ হব। নদীর রয়েছে পরিবেশগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব। এই বহুমাত্রিক মূল্যকে স্বীকৃতি দিয়েই নদী ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
তুরাগের তীরে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়েছে, নদী যেন নীরবে আমাদের কাছে একটি প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে: যে নদী একসময় মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে, সেই নদীর জীবন রক্ষায় আমরা আজ কতটা দায়িত্বশীল?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু কথায় নয়, কাজে দিতে হবে।
নদী, মানুষ ও স্মৃতির অদৃশ্য বন্ধন
মানুষের জীবনে নদীর সঙ্গে সম্পর্ক অনেক সময় অনুভূতির এমন এক স্তরে পৌঁছে যায়, যেখানে যুক্তির চেয়ে স্মৃতি বড় হয়ে ওঠে।
কেউ নদীর তীরে কাটানো শৈশবকে মনে করে, কেউ হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনের স্মৃতি খুঁজে পায়, কেউ জীবনের ক্লান্তি ভুলতে নদীর কাছে আসে। আবার কেউ নদীর দিকে তাকিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবে।
আমার কাছে নদীর তীরে দাঁড়ানো মানে কেবল প্রকৃতি দেখা নয়। এটি জীবনের চলমান যাত্রার দিকে ফিরে তাকানোর একটি উপলক্ষ।
সাংবাদিকতা আমাকে মানুষের জীবন, সমাজের পরিবর্তন এবং সময়ের নানা ঘটনা পর্যবেক্ষণ করতে শিখিয়েছে। লেখালেখি আমাকে সেই অভিজ্ঞতাকে অনুভূতির ভাষায় প্রকাশ করার সুযোগ দিয়েছে। গবেষণার চর্চা শিখিয়েছে কোনো বিষয়কে শুধু বাহ্যিক দৃষ্টিতে না দেখে তার পেছনের ইতিহাস, বাস্তবতা ও তাৎপর্য অনুধাবন করতে।
তাই নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আমি শুধু সূর্যাস্ত দেখিনি; দেখেছি সময়ের এক প্রতীকী ছবি। সূর্য অস্ত যায়, কিন্তু তার আলো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। নদীর জল বয়ে যায়, কিন্তু তার পথের স্মৃতি থেকে যায়। মানুষ জীবনের একটি অধ্যায় অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যায়, অথচ সেই পথচলার অভিজ্ঞতা তার চিন্তা ও চেতনায় স্থায়ী ছাপ রেখে যায়।
আমাদের জীবনও তো একটি নদীর মতো। কখনো শান্ত, কখনো উত্তাল, কখনো স্রোতের অনুকূলে, কখনো প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে এগিয়ে চলা। কোথাও আনন্দ, কোথাও বেদনা, কোথাও প্রাপ্তি, কোথাও অপূর্ণতা। তবু থেমে থাকার সুযোগ নেই। সময়ের স্রোতে আমাদেরও এগিয়ে যেতে হয়।
নদী আমাকে সেই চলমানতার কথাই মনে করিয়ে দেয়।
একজন সাংবাদিক, লেখক ও গবেষকের দৃষ্টিতে তুরাগের সন্ধ্যা
সাংবাদিকতার দায়িত্ব আমাকে সত্য অনুসন্ধান করতে শিখিয়েছে। সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন, মানুষের প্রত্যাশা, জনস্বার্থ এবং নাগরিক সমস্যার দিকে দৃষ্টি রাখা একজন সাংবাদিকের দায়িত্বের অংশ। অন্যদিকে লেখালেখি আমাকে অনুভূতির গভীরে প্রবেশ করতে শেখায়। আর গবেষণা শেখায় তথ্য, ইতিহাস ও বাস্তবতার আলোকে কোনো বিষয়কে বিচার করতে।
তুরাগ নদীর তীরে কাটানো এই সন্ধ্যা আমার কাছে এই তিনটি অভিজ্ঞতারই একটি সম্মিলিত উপলক্ষ।
একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি নদীর বর্তমান অবস্থা, তার পরিবেশগত সংকট এবং নদীকেন্দ্রিক মানুষের জীবন নিয়ে ভাবি। একজন লেখক হিসেবে অস্তগামী সূর্যের আলো, নদীর ঢেউ ও গোধূলির সৌন্দর্যের মধ্যে জীবনের কাব্য খুঁজে পাই। একজন গবেষক হিসেবে নদীর অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে সম্পর্ক অনুসন্ধানের প্রয়োজন অনুভব করি।
আমি বিশ্বাস করি, লেখালেখির উদ্দেশ্য শুধু সৌন্দর্যের বর্ণনা দেওয়া নয়; সৌন্দর্যের পাশাপাশি বাস্তবতার কথাও তুলে ধরা। প্রকৃতির প্রশংসা করতে হলে তার সংকটের কথাও বলতে হবে। উন্নয়নের সম্ভাবনা তুলে ধরতে হলে পরিবেশের ওপর তার প্রভাব নিয়েও আলোচনা করতে হবে।
সেই অর্থে তুরাগের তীরে তোলা আমার এই ছবিটি একটি ব্যক্তিগত স্মৃতির পাশাপাশি একটি বৃহত্তর উপলব্ধিরও প্রতীক। এখানে রয়েছে প্রকৃতির প্রতি মুগ্ধতা, নগরায়ণের প্রতি কৌতূহল এবং নদীকে বাঁচিয়ে রাখার সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা।
আমি চাই, আমার লেখার শব্দগুলো পাঠকের মনে শুধু ভালো লাগা সৃষ্টি না করুক; বরং নতুন করে ভাবতে শেখাক। কারণ যে লেখা মানুষের হৃদয় স্পর্শ করে, সেই লেখা যদি মানুষের বিবেককেও জাগ্রত করতে পারে, তবেই তার সার্থকতা পূর্ণতা পায়।
গোধূলির আলোয় জীবনের দর্শন
সন্ধ্যা মানুষের মনে এক বিশেষ ধরনের অনুভূতি জাগায়। দিনের ব্যস্ততা যখন ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়, তখন মন অনেক সময় নিজের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করে। দিনের অর্জন, অসমাপ্ত কাজ, জীবনের অভিজ্ঞতা এবং আগামী দিনের প্রত্যাশা একে একে ভাবনায় ফিরে আসে।
তুরাগের তীরে দাঁড়িয়ে আমারও মনে হয়েছে, জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু বড় কোনো অর্জন কিংবা ব্যস্ততার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক সময় একটি শান্ত বিকেল, নদীর ধারে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা, অস্তগামী সূর্যের দিকে তাকানো কিংবা একটি স্মৃতি ধরে রাখার মধ্যেও গভীর আনন্দ লুকিয়ে থাকে।
আমরা প্রতিদিন কত মানুষের সঙ্গে দেখা করি, কত পথ পাড়ি দিই, কত কাজ সম্পন্ন করি। কিন্তু সেই সব অভিজ্ঞতার মধ্যে কোন মুহূর্তটি আমাদের হৃদয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে, তা আগে থেকে বলা যায় না।
কোনো একটি দৃশ্য, কোনো একটি বিকেল, কোনো একটি কথোপকথন কিংবা প্রকৃতির সঙ্গে কাটানো কয়েকটি মুহূর্তই কখনো কখনো জীবনের মূল্যবান স্মৃতিতে পরিণত হয়।
১৩ অক্টোবরের তুরাগের সন্ধ্যা আমার কাছে তেমনই একটি স্মৃতি।
অস্তগামী সূর্য আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে, প্রতিটি দিনেরই একটি সমাপ্তি আছে। কিন্তু সমাপ্তি মানেই সবকিছুর অবসান নয়। দিনের শেষে রাত আসে, রাত পেরিয়ে নতুন সকাল আসে। জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ও তেমনি নতুন অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির দরজা খুলে দেয়।
তাই সময়কে মূল্য দিতে হবে, প্রকৃতিকে ভালোবাসতে হবে, মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে এবং নিজের অভিজ্ঞতাকে অর্থবহ কাজে রূপান্তরিত করতে হবে।
একটি ছবির মূল্য কখনো তার বাহ্যিক সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ছবির সঙ্গে যখন সময়, স্থান, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার সম্পর্ক তৈরি হয়, তখন সেটি হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত ইতিহাসের একটি অংশ।
তুরাগের তীরে তোলা আমার ছবিটিও সেই অর্থে একটি স্মৃতিচিহ্ন। ছবিটি যখনই দেখব, মনে পড়বে ১৩ অক্টোবরের সেই সন্ধ্যা, সিলিকন সিটি পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা, নদী পার হওয়ার মুহূর্ত এবং গোধূলির আলোয় দাঁড়িয়ে জন্ম নেওয়া নানা ভাবনা।
নদী বাঁচুক, প্রকৃতি বাঁচুক, সুন্দর হোক আগামীর বাংলাদেশ
বাংলাদেশের নদীগুলো আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ, ঐতিহ্য এবং জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নদীকে রক্ষা করা মানে দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করা, মানুষের জীবিকা সুরক্ষিত রাখা এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য দেশ রেখে যাওয়া।
তুরাগের মতো নদীগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে পরিকল্পিত নগরায়ণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, নদীর সীমানা সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নদী রক্ষার আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং উন্নয়ন পরিকল্পনায় নদী ও জলাভূমির স্বাভাবিক অস্তিত্বকে গুরুত্ব দিতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, নদী কোনো পরিত্যক্ত সম্পদ নয়, নদী একটি জীবন্ত প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। তার প্রবাহ, পানি, তীর, জলজ প্রাণী এবং আশপাশের পরিবেশ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। এই সম্পর্কের কোনো একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো ব্যবস্থার ওপর তার প্রভাব পড়ে।
আমি এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে আধুনিক নগর গড়ে উঠবে, প্রযুক্তির প্রসার ঘটবে, মানুষের কর্মসংস্থান বাড়বে, কিন্তু নদী হারিয়ে যাবে না। যেখানে উন্নয়নের আলো জ্বলবে, অথচ প্রকৃতির সৌন্দর্য অন্ধকারে ঢাকা পড়বে না। যেখানে নতুন প্রজন্ম আধুনিকতার সুবিধা ভোগ করার পাশাপাশি নদীর তীরে দাঁড়িয়ে নির্মল বাতাস গ্রহণ করতে পারবে, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবে এবং নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক অনুভব করতে পারবে।
তুরাগের তীরে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়েছে, এই প্রত্যাশা কোনো কল্পবিলাস নয়; এটি একটি দায়িত্বশীল সমাজ গড়ে তোলার অপরিহার্য শর্ত।
নদীকে বাঁচিয়ে রাখা মানে ভবিষ্যৎকে বাঁচিয়ে রাখা।
শেষ বিকেলের শেষ কথা
১৩ অক্টোবরের সেই সন্ধ্যায় সূর্য ধীরে ধীরে দিগন্তের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছিল। নদীর বুকে ছড়িয়ে থাকা সোনালি আলোর রেখা ক্রমে ম্লান হয়ে আসছিল। দিনের আলো নিভে গেলেও আমার মনে জন্ম নিচ্ছিল নতুন কিছু উপলব্ধি।
আমি অনুভব করলাম, জীবনের সৌন্দর্যকে আবিষ্কার করতে হলে শুধু সামনে এগিয়ে চললেই হয় না; মাঝে মাঝে থামতে হয়, পেছনে তাকাতে হয়, প্রকৃতির সঙ্গে কথা বলতে হয় এবং নিজের ভেতরের অনুভূতিগুলোকে শোনার সময় দিতে হয়।
তুরাগের তীরে দাঁড়িয়ে তোলা ছবিটি তাই আমার কাছে একটি সন্ধ্যার স্মৃতি, একজন পথচলতি মানুষের অনুভব, একজন সাংবাদিকের পর্যবেক্ষণ, একজন লেখকের আত্মকথন এবং একজন গবেষকের অনুসন্ধিৎসু মনের প্রতিফলন।
নদী তার নিজস্ব গতিতে বয়ে চলবে। সময় এগিয়ে যাবে। বদলে যাবে নগর, বদলে যাবে মানুষের জীবনযাত্রা। কিন্তু প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সত্য ও সুন্দরের সন্ধান যদি আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকে, তবে জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতাই হয়ে উঠতে পারে নতুন উপলব্ধির উৎস।
তুরাগের তীরে সেই গোধূলিবেলায় আমার মনে হয়েছিল, নদী শুধু সাগরের দিকে ছুটে চলে না, নদী মানুষের মনেও একটি পথ তৈরি করে। সেই পথে ভেসে আসে স্মৃতি, জেগে ওঠে অনুভূতি, জন্ম নেয় নতুন চিন্তা। আর একজন লেখক সেই অনুভূতিগুলোকে শব্দে ধারণ করে সময়ের কাছে রেখে যেতে চান নিজের সামান্য কিছু স্বাক্ষর।
তুরাগের বুকে অস্তগামী সূর্যের আলো হয়তো মিলিয়ে গেছে, কিন্তু সেই সন্ধ্যার স্মৃতি আমার হৃদয়ে থেকে যাবে। যত দিন এই ছবির দিকে তাকাব, তত দিন মনে পড়বে নদীর তীরে কাটানো সেই মুহূর্তগুলোর কথা। মনে পড়বে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য, জীবনের চলমানতা এবং নদীকে ভালোবাসার গভীর দায়িত্বের কথা।
নদী বেঁচে থাকুক তার আপন প্রবাহে, প্রকৃতি ফিরে পাক তার হারানো সৌন্দর্য, আর আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ উন্নয়ন ও পরিবেশের সহাবস্থানে হয়ে উঠুক আগামী প্রজন্মের জন্য আরও সুন্দর, আরও মানবিক, আরও বাসযোগ্য এক জনপদ।
এই প্রত্যাশা নিয়েই তুরাগের তীরে কাটানো সন্ধ্যার স্মৃতিকে হৃদয়ে ধারণ করে সামনে এগিয়ে চলেছি।

