“মা, তুমি কি আর ফিরবে না? মায়ের অপেক্ষায় পাঁচ বছরের ইসরাত, পাশে দেড় বছরের রোজা মনির বুকফাটা কান্না-

0
11

পাঁচ বছরের ইসরাত আর দেড় বছরের রোজা মনি কি কোনো অপরাধ করেছিল? তাদের অপরাধ শুধু তারা এই পৃথিবীতে জন্মেছে!
মো. কামাল উদ্দিন
কিছু ঘটনা শুধু সংবাদ হয়ে আসে না, মানুষের বিবেকের দরজায় আঘাত করে। কিছু দৃশ্য শুধু চোখ ভেজায় না, বুকের ভেতর জমে থাকা মানবিকতাকে রক্তাক্ত করে। আর কিছু নিষ্পাপ মুখ এমন কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, যার উত্তর দিতে গিয়ে সভ্য সমাজের মাথা লজ্জায় নত হয়ে আসে। কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় ঘটে যাওয়া এমনই এক হৃদয়বিদারক ঘটনা আমাদের সামনে দাঁড় করিয়েছে এক নির্মম প্রশ্ন নিয়ে, যে মা সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছেন, সেই মা কীভাবে নিজের দুই শিশুকে রাস্তায় ফেলে রেখে চলে যেতে পারেন?
পাঁচ বছরের ছোট্ট ইসরাত। পাশে দেড় বছরের কোলের শিশু রোজা মনি। তাদের পৃথিবী বলতে তো এখনো মায়ের মুখ, মায়ের আঁচল, মায়ের বুকের উষ্ণতা আর আদরভরা দুটো হাত। যে বয়সে মায়ের আঙুল ধরে হাঁটতে শেখার কথা, যে বয়সে সামান্য আঘাত পেলেই মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে কান্না থামানোর কথা, সেই বয়সেই তাদের দাঁড়াতে হলো এক অচেনা পৃথিবীর সামনে। চারপাশে অচেনা মানুষ, অজানা পথ, বুকভরা ভয় আর চোখভরা জল। অথচ যাঁর হাত ধরে তারা পথ চিনতে শিখছিল, সেই মাকেই খুঁজে পাওয়া গেল না।
চিপস কিনে দেওয়ার কথা বলে দুই শিশুকে রাস্তায় নিয়ে এসেছিলেন মা। তারপর তাদের একা ফেলে চলে গেলেন।
কথাটা যত সহজে বলা যায়, এর নির্মমতা অনুভব করা তত সহজ নয়। একটু ভাবুন তো, পাঁচ বছরের ইসরাত যখন মায়ের সঙ্গে রওনা হয়েছিল, তখন কি সে একবারও ভেবেছিল, এই যাত্রার শেষে তার জন্য অপেক্ষা করছে মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার এমন এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা? ছোট্ট রোজা মনি কি বুঝতে পেরেছিল, যে মানুষটির কোলে সে নিরাপদ বোধ করে, সেই মানুষটিই তাকে রেখে চলে যাবেন? তারা কি জানত, চিপসের ছোট্ট আবদার পূরণের আশ্বাসের আড়ালে অপেক্ষা করছে এক অনিশ্চিত বিকেল?
১১ অক্টোবর দুপুরে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার দক্ষিণ বাজার এলাকায় রোজ গার্ডেন মডেল স্কুলসংলগ্ন সড়কের পাশে শিশু দুটিকে কাঁদতে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। চারপাশের মানুষের দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে ছিল তারা। পাঁচ বছরের ইসরাত জানায়, চিপস কিনে দেওয়ার কথা বলে তাদের সেখানে নিয়ে এসেছিলেন মা। এরপর তাদের একা রেখে চলে যান তিনি। অনেকটা সময় কেটে গেলেও মা আর ফিরে আসেননি।
একবার ভাবুন, সেই অপেক্ষার কথা! হয়তো ইসরাত বারবার রাস্তার দিকে তাকিয়েছে। হয়তো প্রতিটি পরিচিত অবয়বের মধ্যে মাকে খুঁজেছে। হয়তো ভেবেছে, মা একটু পরেই ফিরে আসবেন, তাকে কোলে তুলে নেবেন, ছোট বোনটিকে নিয়ে আবার বাড়ি ফিরবেন। কিন্তু অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হয়েছে, চোখের জল শুকিয়েছে, বুকের ভেতর ভয় জমেছে। মায়ের ফেরার পথ আর শেষ হয়নি।
পাঁচ বছরের একটি শিশু কি বোঝে বিচ্ছেদ কী? সে কি বোঝে পারিবারিক কলহ, সম্পর্কের ভাঙন, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জটিল হিসাব কিংবা জীবনের কঠিন সিদ্ধান্ত? সে তো শুধু বোঝে, মাকে কাছে পেলে ভয় থাকে না। মায়ের হাত ধরে থাকলে পথ হারানোর আশঙ্কা থাকে না। মায়ের কণ্ঠ শুনলে পৃথিবীটাকে নিরাপদ মনে হয়।
তাহলে সেই নিরাপত্তার জায়গাটিই যদি একদিন হঠাৎ শূন্য হয়ে যায়, একটি শিশুর মনে কী ঝড় ওঠে, তা কি আমরা অনুভব করতে পারি?
শিশু দুটি উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের নাল্লা গ্রামের মো. নাছির ও জেসমিন দম্পতির সন্তান। জানা গেছে, তাদের বাবা নাছির কুমিল্লা নগরীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালান। প্রায় চার মাস আগে নাছির ও জেসমিনের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়। এরপর জেসমিন অন্যত্র বিয়ে করেন।
পারিবারিক সম্পর্ক ভেঙে যেতে পারে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতবিরোধ হতে পারে। জীবনের পথে মানুষের সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে। কিন্তু সেই ভাঙনের দায় কেন বইবে অবুঝ শিশুরা? মা-বাবার সম্পর্কের জটিলতা কি সন্তানের শৈশব কেড়ে নেওয়ার অনুমতি দেয়? প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সিদ্ধান্তের মূল্য কেন দিতে হবে এমন দুটি শিশুকে, যারা নিজেদের জন্ম, পরিবার কিংবা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্তই নিতে পারেনি?
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, শিশু দুটির চাচির ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবারের সদস্যদের সামনে মুঠোফোনে কথা বলার সময় তাদের মা জানান, তিনি ইচ্ছা করেই শিশু দুটিকে রেখে গেছেন এবং আর ফিরিয়ে নেবেন না। অন্যদিকে, শিশুদের বাবার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
শিশু দুটির ছবি ও ভিডিও দেখে তাদের এক চাচি দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দারা শিশু দুটিকে তাঁর জিম্মায় তুলে দেন। অচেনা মানুষের ভিড়ে অন্তত একজন আত্মীয়ের পরিচিত মুখ খুঁজে পেয়েছে তারা। হয়তো সেই মুহূর্তে তাদের ভয় কিছুটা কমেছে। কিন্তু যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যে অনিশ্চয়তা তাদের জীবনের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, তার উত্তর কে দেবে?
আমরা জানি না, ইসরাতের ছোট্ট মনে কতটা কষ্ট জমেছে। আমরা জানি না, রোজা মনি মায়ের অনুপস্থিতি কীভাবে অনুভব করছে। দেড় বছরের শিশু হয়তো নিজের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না, কিন্তু তার কান্না কি অনুভূতিহীন? পাঁচ বছরের শিশু হয়তো নিজের বেদনা গুছিয়ে বলতে পারে না, কিন্তু তার চোখের জল কি আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে না?
মা, আপনার কাছে প্রশ্ন রইল, আপনার সন্তান দুটি কি আপনার জীবনের বোঝা ছিল?
যে ইসরাত এখনো পৃথিবীর কঠিন বাস্তবতা বোঝার বয়সে পৌঁছায়নি, যে রোজা মনি এখনো নিজের প্রয়োজনটুকুও ঠিকমতো বলতে পারে না, তাদের আপনি কোন অপরাধের শাস্তি দিলেন? তারা কি আপনার কাছে জন্ম নেওয়ার অনুমতি চেয়েছিল? তারা কি চেয়েছিল এমন একটি পৃথিবী, যেখানে একদিন তাদের মায়ের হাতই ছেড়ে যাবে তাদের?
এই প্রশ্নগুলো কাউকে অপমান করার জন্য নয়। কোনো মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সব কথা না জেনে তাঁর পরিস্থিতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়াও আমাদের উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু দুটি শিশুকে অসহায় অবস্থায় ফেলে যাওয়ার অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে সেই ঘটনার মানবিক ও আইনগত দিক অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ, শিশুদের নিরাপত্তা ও অধিকার কোনো ব্যক্তিগত বিরোধের ঊর্ধ্বে নয়।
একজন মা হয়তো জীবনের কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন। একজন বাবা হয়তো অর্থনৈতিক সংকট কিংবা পারিবারিক সমস্যায় বিপর্যস্ত হতে পারেন। সমাজও কখনো কখনো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়। কিন্তু পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। সন্তানকে লালনপালন করা সম্ভব না হলে আত্মীয়স্বজন, সমাজসেবা অধিদপ্তর কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়ার পথ রয়েছে। রাস্তায় ফেলে রেখে চলে যাওয়া কোনো শিশুর নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে না।
আজ ইসরাত ও রোজা মনির পাশে একজন চাচি দাঁড়িয়েছেন। স্থানীয় মানুষের মানবিক উদ্যোগে তারা তাৎক্ষণিক আশ্রয় পেয়েছে। কিন্তু শুধু আত্মীয়ের জিম্মায় তুলে দিয়েই কি আমাদের দায়িত্ব শেষ? তাদের নিরাপত্তা, যথাযথ পরিচর্যা, মানসিক সুস্থতা এবং ভবিষ্যৎ বেড়ে ওঠার পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত শিশু দুটির বর্তমান অবস্থা যাচাই করা, তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজন হলে পরিবারকে কাউন্সেলিং ও সামাজিক সহায়তার আওতায় আনা।
কারণ, শিশুদের শুধু বেঁচে থাকলেই হয় না; তাদের নিরাপদে বড় হওয়ার অধিকারও রয়েছে। তাদের প্রয়োজন খাবার, পোশাক ও আশ্রয়ের পাশাপাশি ভালোবাসা, মমতা, স্থিতিশীল পরিবেশ এবং এমন কিছু মানুষের সান্নিধ্য, যাঁদের কাছে তারা নিজেকে নিরাপদ মনে করতে পারে।
আমাদের সমাজে কত আয়োজন, কত উৎসব, কত উন্নয়নের গল্প! কিন্তু সেই সমাজেরই কোনো এক কোণে যখন পাঁচ বছরের একটি শিশু তার ছোট্ট বোনকে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে মাকে খোঁজে, তখন আমাদের সব অর্জনের সামনে দাঁড়িয়ে যায় এক গভীর মানবিক প্রশ্ন। আমরা কি সত্যিই শিশুদের জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তুলতে পেরেছি? আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র কি অসহায় শিশুর কান্না শোনার মতো যথেষ্ট সংবেদনশীল?
ইসরাত আর রোজা মনির দিকে তাকিয়ে আজ আমাদের নিজেদেরও প্রশ্ন করা উচিত। আমরা কি শুধু সংবাদটি পড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলব? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি দুঃখের কথা লিখে অন্য খবরে চলে যাব? নাকি এই দুটি শিশুর নিরাপত্তা, অধিকার ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার দাবিতে সত্যিকার অর্থে সোচ্চার হব?
মনে রাখতে হবে, আজ তারা অন্য কারও সন্তান। কিন্তু আগামীকাল এমন বিপন্নতার মুখে পড়তে পারে যে কোনো শিশু। তাই শিশুদের প্রতি অবহেলা, নির্যাতন কিংবা পরিত্যাগের ঘটনা কোনো পরিবারের একান্ত বিষয় বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রয়োজন মানবিকতা, দায়িত্বশীলতা এবং কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা।
শেষ করার আগে শুধু একবার চোখ বন্ধ করে ভাবুন, পাঁচ বছরের ইসরাত যদি আজ আপনাকে প্রশ্ন করে, “আমার মা আমাকে ফেলে গেল কেন?” আপনি কী উত্তর দেবেন?
দেড় বছরের রোজা মনি যদি কান্নার মধ্যে মায়ের কোলে ফিরতে চায়, অথচ তার সামনে মায়ের কোনো পরিচিত মুখ না থাকে, তখন তাকে কীভাবে বোঝাবেন যে পৃথিবীটা এখনো তার জন্য নিরাপদ?
হয়তো তাদের প্রশ্নের উত্তর আমাদের কারও কাছেই নেই। কিন্তু তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের আছে। তাদের ভবিষ্যৎ যেন আর কোনো অনিশ্চয়তার অন্ধকারে হারিয়ে না যায়, সে জন্য এগিয়ে আসার দায়িত্ব আমাদের আছে।
ইসরাত ও রোজা মনি কোনো করুণ সংবাদ শিরোনাম নয়। তারা দুটি জীবন্ত শিশু, দুটি নিষ্পাপ প্রাণ, দুটি পূর্ণ মানবিক অধিকারসম্পন্ন মানুষ। তাদের শৈশব কারও অভিমান, বিচ্ছেদ কিংবা দায়িত্বহীনতার বলি হতে পারে না।
আজ তাদের চোখের জল আমাদের বিবেকের কাছে আমানত হয়ে রইল। আমরা যদি সেই কান্না শুনেও নীরব থাকি, তাহলে প্রশ্ন শুধু ওই দুই শিশুর মা-বাবাকে নিয়ে থাকবে না, প্রশ্ন উঠবে আমাদের সবার মানবিকতা নিয়েও।
একটি শিশুর কান্না থামাতে সব সময় অনেক অর্থের প্রয়োজন হয় না। কখনো প্রয়োজন হয় একটি নিরাপদ আশ্রয়, একটি স্নেহময় হাত, কিছু দায়িত্বশীল মানুষের উদ্যোগ এবং এমন একটি সমাজ, যেখানে কোনো শিশুকে পরিত্যক্ত হওয়ার ভয় নিয়ে বড় হতে হয় না।
ইসরাত আর রোজা মনি যেন একদিন আর কাউকে খুঁজে না ফেরে অসহায় চোখে। তারা যেন বড় হয়ে বলতে পারে, পৃথিবীতে একদিন আমাদের খুব কষ্ট হয়েছিল, কিন্তু মানুষ আমাদের একা ফেলে রাখেনি।
কারণ, মা-বাবার সম্পর্ক ভেঙে যেতে পারে, জীবনের পথ বদলে যেতে পারে, কিন্তু একটি শিশুর প্রতি মানবিক দায়িত্ব কখনো ভেঙে যেতে পারে না।
শিশু দুটির কান্না থামুক। তাদের জীবনে ফিরে আসুক নিরাপত্তা, মমতা ও ভালোবাসা। আর আমাদের বিবেকের দরজায় এই প্রশ্নটি চিরকাল জেগে থাকুক, যে পৃথিবীতে শিশুর কান্না শোনার মতো মানুষ আছে, সেই পৃথিবীতে কোনো শিশু কেন নিজেকে এতিমের মতো অসহায় মনে করবে?
মানবিকতার কাছে আজ আমাদের সবার দায় রইল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here