“”আবু সুফিয়ান : ক্যামেরার আলোয় দেখা সেই রাজনীতিক, সময়ের স্রোতে এক দীর্ঘ অভিযাত্রা””

0
31

“২০১৭ সালের ‘চট্টগ্রাম সংলাপ’ থেকে রাজপথ, নির্বাচন ও মানুষের অধিকারের কথামালা—এক সাংবাদিকের স্মৃতির পাতায় আবু সুফিয়ানের রাজনৈতিক পথচলা-
মো. কামাল উদ্দিনঃ
সময় বড় অদ্ভুত এক আয়না। সেখানে অতীতের মুখগুলো কখনো ঝাপসা হয়ে যায়, আবার কখনো একটি পুরোনো ছবি, একটি কথোপকথন কিংবা একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানের স্মৃতি হঠাৎ করেই বহু বছর আগের দিনগুলোকে চোখের সামনে জীবন্ত করে তোলে।
আজ তেমনই এক স্মৃতির দরজা খুলে বসেছি।
স্মৃতির পাতায় ফিরে যাচ্ছে ২০১৭ সাল। বাংলা টেলিভিশনের পর্দায় তখন আমার উপস্থাপনায় প্রচারিত হতো আলোচিত টকশো ‘চট্টগ্রাম সংলাপ’। চট্টগ্রামের রাজনীতি, অর্থনীতি, নাগরিক সংকট, উন্নয়ন, গণতন্ত্র এবং জাতীয় রাজনীতির নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সরাসরি কথা বলতেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, জনপ্রতিনিধি, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
সেই অনুষ্ঠানের একটি পরিচিত মুখ ছিলেন আবু সুফিয়ান।
আজ এত বছর পর যখন সেই সময়ের কথা মনে পড়ে, তখন শুধু একজন অতিথির কথা মনে পড়ে না; মনে পড়ে একজন রাজনৈতিক কর্মীর দীর্ঘ পথচলার একটি সময়কে। মনে পড়ে ক্যামেরার সামনে বসে থাকা একজন শান্ত, ধীরস্থির ও যুক্তিনির্ভর রাজনীতিককে। মনে পড়ে তাঁর রাজনৈতিক স্বপ্ন, ক্ষোভ, প্রত্যাশা, দলের প্রতি আনুগত্য এবং চট্টগ্রামের মানুষের বিভিন্ন দাবি নিয়ে তাঁর খোলামেলা কথাবার্তাকে।
২০১৭ সালের সেই দিনগুলো
তখন দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল উত্তেজনাপূর্ণ। সামনে ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দেশের রাজনীতিতে নির্বাচন, গণতন্ত্র, বিরোধী দলের রাজনৈতিক অধিকার, সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নানা আলোচনা চলছিল।
‘চট্টগ্রাম সংলাপ’-এর আলোচনাতেও স্বাভাবিকভাবেই এসব বিষয় উঠে আসত।
আবু সুফিয়ান তখন বিএনপির একজন সক্রিয় ও পরিচিত নেতা। তাঁর বক্তব্যে ছিল তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা। তিনি রাজনৈতিক পরিবেশ, গণতন্ত্রের চর্চা, বিরোধী দলের অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচন নিয়ে তাঁর রাজনৈতিক বিশ্লেষণ তুলে ধরতেন।
আমার প্রশ্ন ছিল সরাসরি। তাঁর উত্তরও ছিল স্পষ্ট।
টেলিভিশন টকশোতে একজন উপস্থাপকের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো প্রশ্নের জায়গায় কোনো আপস না করা। আর একজন রাজনীতিকের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েও নিজের বক্তব্য পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা।
সেই জায়গায় আবু সুফিয়ান ছিলেন স্বচ্ছন্দ।
রাজনীতির পথে ছাত্রদল থেকে বিএনপির নেতৃত্বে
একজন রাজনৈতিক নেতাকে বুঝতে হলে তাঁর বর্তমান পদ দিয়ে বিচার করলে চলে না। তাঁকে বুঝতে হলে ফিরে যেতে হয় তাঁর শুরুর দিনগুলোর কাছে।
আবু সুফিয়ানের রাজনৈতিক পথচলার সূচনা ছাত্রদলের রাজনীতির মধ্য দিয়ে। ছাত্ররাজনীতির মাঠ থেকে ধীরে ধীরে মূলধারার বিএনপির রাজনীতিতে তাঁর উত্থান। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে তাঁকে আন্দোলন, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড এবং নানা রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
রাজনীতি কখনোই কেবল বক্তৃতার মঞ্চ নয়। রাজনীতি মানে কখনো রাজপথ, কখনো মামলা, কখনো কর্মীদের পাশে দাঁড়ানো, কখনো সংগঠন ধরে রাখা, আবার কখনো প্রতিকূল সময়েও নিজের রাজনৈতিক অবস্থান অটুট রাখা।
এই দীর্ঘ পথ পেরিয়েই তিনি বিএনপির একজন পরিণত নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
একসময় তিনি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়কের দায়িত্বও পালন করেন। ফলে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুধু একটি নির্বাচনী এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং বৃহত্তর দক্ষিণ চট্টগ্রামের দলীয় সংগঠন ও রাজনীতির সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল।
২০১৮—একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অধ্যায়
২০১৭ সালের সেই টকশোর পরের বছরই আসে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়—২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
চট্টগ্রাম বোয়ালখালী আসন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নেন আবু সুফিয়ান। তাঁর প্রতিপক্ষ ছিলেন তৎকালীন সংসদ সদস্য মঈনউদ্দীন খান বাদল।
নির্বাচনের ফলাফল রাজনীতির একটি অধ্যায় মাত্র; কিন্তু নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তও অনেক সময় একজন নেতার রাজনৈতিক সাহস ও প্রত্যয়ের পরিচয় বহন করে।
সেই নির্বাচনে আবু সুফিয়ানের প্রচারণা, মানুষের কাছে যাওয়া, কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক বক্তব্য—সবকিছুই তাঁকে বৃহত্তর পরিসরে পরিচিত করে তোলে।
কালুরঘাট সেতু—একটি সেতুর চেয়েও বড় দাবি
চট্টগ্রামের রাজনীতির সঙ্গে যাঁরা দীর্ঘদিন যুক্ত, তাঁরা জানেন—কালুরঘাট সেতু শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্পের নাম নয়। এটি বোয়ালখালী, পটিয়া, দক্ষিণ চট্টগ্রাম এবং বৃহত্তর চট্টগ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ও দুর্ভোগের প্রতীক।
পুরোনো কালুরঘাট সেতুর ওপর নির্ভর করে বছরের পর বছর মানুষের চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রা চলেছে। সেতুটির দুর্বলতা ও যোগাযোগ সংকট দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের কাছে দীর্ঘদিনের কষ্টের কারণ হয়ে আছে।
এই সেতু নির্মাণের দাবি নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনও হয়েছে বহুবার।
আবু সুফিয়ানও এই দাবিকে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর কাছে কালুরঘাট সেতু ছিল শুধু বোয়ালখালীর মানুষের দাবি নয়; এটি ছিল দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
জলাবদ্ধতার নগরী চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামের আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণা—জলাবদ্ধতা।
বৃষ্টি নামলেই নগরের বহু এলাকা পানির নিচে চলে যাওয়া, রাস্তায় যানজট, ব্যবসা-বাণিজ্যে ক্ষতি, শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ এবং সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের ভোগান্তি—এসব নিয়ে বছরের পর বছর আলোচনা হয়েছে।
‘চট্টগ্রাম সংলাপ’-এর আলোচনাতেও নগরের জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নাগরিক সেবা এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে কথা হয়েছে।
আবু সুফিয়ান তখন চট্টগ্রাম মহানগরের নাগরিক দুর্ভোগ নিয়েও তাঁর মতামত তুলে ধরতেন। তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যে বোয়ালখালীর পাশাপাশি বৃহত্তর চট্টগ্রামের উন্নয়ন ও নাগরিক অধিকারও জায়গা পেত।
একজন শান্ত স্বভাবের রাজনীতিক
রাজনীতিতে উত্তাপ থাকে। বক্তব্যে উত্তেজনা থাকে। প্রতিপক্ষকে আক্রমণের প্রবণতাও থাকে।
কিন্তু আবু সুফিয়ানের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের যে দিকটি আমার কাছে বরাবর আলাদা করে চোখে পড়েছে, সেটি হলো তাঁর ঠান্ডা মেজাজ।
টকশোর আলোচনায় কঠিন প্রশ্ন করলেও তিনি সাধারণত উত্তেজিত না হয়ে যুক্তি দিয়ে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করতেন। রাজনৈতিক বিরোধিতাকে তিনি রাজনৈতিক যুক্তির জায়গা থেকেই ব্যাখ্যা করতেন।
আমার সাংবাদিকতা জীবনে অনেক রাজনীতিকের সঙ্গে কথা বলেছি। কেউ কেউ খুব আক্রমণাত্মক, কেউ আবেগপ্রবণ, কেউ অত্যন্ত হিসাবি। কিন্তু আবু সুফিয়ানের মধ্যে আমি যে বৈশিষ্ট্যটি বেশি লক্ষ্য করেছি, তা হলো—তিনি অনেকটা নীরবে নিজের কথা বলতেন।
তাঁর রাজনীতিতে কর্মীবান্ধব একটি প্রবণতাও ছিল।
রাজনীতির বড় পরিচয় শুধু নেতা হওয়া নয়; কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন, সংকটের সময়ে তাঁদের পাশে থাকা যায় কি না, সেটিও একজন নেতার প্রকৃত পরীক্ষা।
জিয়াউর রহমানের আদর্শ থেকে খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব
আবু সুফিয়ানের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে বিএনপি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পৃক্ততা রয়েছে। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য রেখেও তিনি রাজনৈতিক পথচলা অব্যাহত রেখেছেন।
রাজনীতিতে সময়ের সঙ্গে অনেক হিসাব বদলায়। কিন্তু একজন কর্মীর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আনুগত্য এবং সংগঠনের জন্য তাঁর ভূমিকা কখনোই উপেক্ষা করার মতো বিষয় নয়।
তারেক রহমানকে ঘিরে তখনকার আলোচনা
আরেকটি বিষয় আজ বিশেষভাবে মনে পড়ে।
সেই সময়ের টকশোগুলোতে বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, দলের সাংগঠনিক শক্তি এবং তারেক রহমানের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা নিয়েও আলোচনা হতো। আবু সুফিয়ানও এসব বিষয়ে তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেছিলেন।
তখন হয়তো অনেক কথাই ছিল রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনুমান ও বিশ্লেষণ। কিন্তু সময়ের স্রোত এগিয়ে যায়। রাজনীতির চরিত্র বদলায়। নেতৃত্বের অবস্থানও বদলায়।
আজ পেছন ফিরে তাকালে সেই পুরোনো আলোচনাগুলো তাই নতুন অর্থ নিয়ে সামনে আসে।
২০২৪—রাজনীতির আরেকটি বাঁক
সময় কখনো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না।
যে মানুষটি একসময় বোয়ালখালীর আসন থেকে নির্বাচন করেছিলেন, যিনি দক্ষিণ চট্টগ্রামের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিলেন, পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে আসে আরেকটি বড় পরিবর্তন।
২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম কোতোয়ালি আসন থেকে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আবু সুফিয়ান—আপনার স্মৃতিতে সংরক্ষিত এই রাজনৈতিক যাত্রার এটি একটি উল্লেখযোগ্য বাঁক।
একজন রাজনৈতিক কর্মীর জীবনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হওয়া নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। কিন্তু আমার কাছে এর চেয়েও বড় হলো তাঁর সেই পথচলা, যা তাঁকে সেই জায়গায় নিয়ে এসেছে।
কারণ রাজনীতির বৃক্ষের ফল আমরা দেখি; কিন্তু তার শিকড়ের গভীরতা সবসময় দেখি না।
রাজনীতির মানুষকে তাঁর অতীত দিয়েও বিচার করতে হয়
আজকের দিনে রাজনৈতিক নেতা বা জনপ্রতিনিধিদের মূল্যায়ন করতে গিয়ে আমরা অনেক সময় শুধু বর্তমান পদটি দেখি।
কে এমপি, কে মন্ত্রী, কে দলের কোন পদে আছেন—এসব দিয়েই যেন রাজনৈতিক পরিচয়ের হিসাব শেষ হয়ে যায়।
কিন্তু একজন নেতার প্রকৃত পরিচয় তৈরি হয় তাঁর অতীতের সংগ্রাম দিয়ে।
কতদিন রাজপথে ছিলেন?
কতবার কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন?
কত প্রতিকূলতা অতিক্রম করেছেন?
দলের জন্য কতটা সময় দিয়েছেন?
মানুষের দাবি নিয়ে কতবার কথা বলেছেন?
ক্ষমতার বাইরে থেকেও মানুষের জন্য কতটা কাজ করেছেন?
এসব প্রশ্নের উত্তরেই একজন রাজনীতিকের প্রকৃত মূল্যায়ন নিহিত।
এই জায়গা থেকেই আমি মনে করি, রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ত্যাগ স্বীকার করা, রাজপথে ভূমিকা রাখা এবং সংগঠনকে শক্তিশালী করতে কাজ করা নেতাদের যথাযথ সম্মান দেওয়া দরকার।
সেই স্টুডিওর আলো আজও নিভে যায়নি
কখনো কখনো সাংবাদিকতার পুরোনো দিনগুলো মনে পড়ে।
স্টুডিওর আলো জ্বলছে। ক্যামেরা চলছে। সামনে অতিথি। কানে প্রযোজকের নির্দেশনা। হাতে প্রশ্নের তালিকা। আর ক্যামেরার ওপাশে অপেক্ষা করছে দর্শক।
আমি প্রশ্ন করছি—
দেশ কোথায় যাচ্ছে?
নির্বাচন কেমন হবে?
বিএনপির ভবিষ্যৎ কী?
চট্টগ্রামের মানুষের সমস্যা কীভাবে সমাধান হবে?
কালুরঘাট সেতু কবে হবে?
জলাবদ্ধতা থেকে নগরবাসী মুক্তি পাবে কীভাবে?
রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী?
আর আবু সুফিয়ান তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে উত্তর দিচ্ছেন।
সেই সময় আমরা কেউই জানতাম না, কয়েক বছর পর ইতিহাস আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে।
আজ এত বছর পর দাঁড়িয়ে মনে হয়, টেলিভিশনের সেই অনুষ্ঠানগুলো ছিল শুধু টকশো নয়; সেগুলো ছিল সময়ের সাক্ষ্য।
সাংবাদিকের স্মৃতিতে রাজনীতিক
একজন সাংবাদিকের কাছে মানুষ কখনো শুধু সংবাদ হয় না। কিছু মানুষ হয়ে ওঠেন স্মৃতির অংশ।
আবু সুফিয়ানও আমার সাংবাদিকতা জীবনের তেমনই একজন পরিচিত রাজনৈতিক মুখ।
তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় রাজনৈতিক সম্পর্কের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে পেশাগত যোগাযোগ ও দীর্ঘদিনের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে। বাংলা টেলিভিশনের ‘চট্টগ্রাম সংলাপ’-এ একাধিকবার তাঁর সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করার সুযোগ হয়েছে।
আজ যখন পুরোনো সেই অনুষ্ঠানগুলোর কথা মনে করি, তখন মনে হয়—একজন মানুষকে বুঝতে হলে শুধু তাঁর আজকের অবস্থান দেখলে হবে না; দেখতে হবে তাঁর গতকালের পথও।
কারণ আজকের নেতা একদিনের তৈরি নন।
তার পেছনে থাকে ছাত্ররাজনীতির দিন, সংগঠনের দিন, রাজপথের দিন, আন্দোলনের দিন, নির্বাচনের দিন, পরাজয়ের দিন, অপেক্ষার দিন এবং স্বপ্ন দেখার দিন।
সময়ের কাছে মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়
রাজনীতির মঞ্চে জয়-পরাজয় থাকবে। ক্ষমতার পালাবদল হবে। সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক সমীকরণও বদলাবে।
কিন্তু একজন মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় শেষ পর্যন্ত থেকে যায় তাঁর কর্মে, তাঁর আচরণে এবং মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের মধ্যে।
২০১৭ সালের সেই আবু সুফিয়ানকে আজও আমার মনে পড়ে—একজন শান্ত, ধীরস্থির, রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও কর্মীবান্ধব মানুষ হিসেবে।
সেই মানুষটির রাজনৈতিক যাত্রা আজ আরও দীর্ঘ হয়েছে। সময় তাঁকে নতুন পরিচয় দিয়েছে, নতুন দায়িত্ব দিয়েছে, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে।
কিন্তু আমার স্মৃতির অ্যালবামে তিনি আজও সেই মানুষটি
যিনি একদিন বাংলা টেলিভিশনের স্টুডিওতে বসে চট্টগ্রামের রাজনীতি, মানুষের অধিকার, কালুরঘাট সেতু, নগরের জলাবদ্ধতা, নির্বাচন এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছিলেন।
ক্যামেরা তখন তাঁকে ধারণ করেছিল কয়েকটি অনুষ্ঠানের জন্য।
কিন্তু সময় তাঁকে ধারণ করেছে একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক গল্পের ভেতর।
আর আজ, বহু বছর পর, সাংবাদিকতার স্মৃতির পাতা উল্টাতে গিয়ে আমি শুধু একজন রাজনীতিককে দেখি না দেখি একটি সময়কে, একটি রাজনৈতিক প্রজন্মকে এবং রাজনীতির মাঠে দীর্ঘদিন পথ চলা একজন কর্মীর বিবর্তনকে।
সেই ২০১৭ সালের ‘চট্টগ্রাম সংলাপ’ তাই আমার কাছে আজও শুধুই একটি পুরোনো টকশোর স্মৃতি নয়। এটি সময়ের সাক্ষ্য, রাজনীতির দলিল এবং একজন মানুষের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রার এক টুকরো জীবন্ত ইতিহাস।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here