নারী কথা থেকে ইতিহাসের পাতায়- চট্টগ্রামের প্রথম নারী জেলা প্রশাসক থেকে ঢাকার প্রথম নারী জেলা প্রশাসক—ফরিদা খানমকে অভিনন্দন-

0
31

-মো. কামাল উদ্দিনঃ
ইতিহাস কখনো শুধু তারিখ, পদবি কিংবা দায়িত্বের তালিকা দিয়ে লেখা হয় না। ইতিহাস তৈরি হয় মানুষের কর্মে, সাহসে, নিষ্ঠায় এবং মানুষের জন্য কিছু করার অদম্য ইচ্ছায়। আর সেই ইতিহাসে যখন কোনো নারীর পদচিহ্ন যুক্ত হয়, তখন তার তাৎপর্য আরও গভীর হয়ে ওঠে।
ফরিদা খানম—একটি নাম, একটি প্রশাসনিক পরিচয়, আবার একই সঙ্গে বাংলাদেশের নারী নেতৃত্বের অগ্রযাত্রার একটি উজ্জ্বল অধ্যায়।
গত ২০২৫ সালের এই দিনে, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকের দায়িত্বে ছিলেন ফরিদা খানম। চট্টগ্রামের দীর্ঘ ১২৮ বছরের প্রশাসনিক ইতিহাসে প্রথম নারী জেলা প্রশাসক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণ ছিল নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। সেই সময় একজন লেখক ও সাংবাদিক হিসেবে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবং নারীর জীবন, সংগ্রাম ও সাফল্য নিয়ে লেখা আমার প্রিয় গ্রন্থ ‘নারী কথা’ তাঁর হাতে তুলে দেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার।
ছবিটি সেই দিনের। হাতে ‘নারী কথা’, সামনে একজন ইতিহাসসৃষ্টিকারী নারী প্রশাসক—আজ এক বছর পর ছবিটির দিকে তাকালে মনে হয়, সময় যেন সেদিনের সেই মুহূর্তটিকে আরও বড় একটি অর্থ দিয়ে দিয়েছে।
কারণ, চট্টগ্রামের সেই ইতিহাস পেরিয়ে আজ ফরিদা খানম ঢাকা জেলার জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আর এখানেও তিনি ঢাকার ইতিহাসে প্রথম নারী জেলা প্রশাসক হিসেবে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছেন।
অর্থাৎ, একজন নারী প্রশাসকের পথচলায় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা—দুটি গুরুত্বপূর্ণ জেলার প্রশাসনিক ইতিহাসেই তিনি ‘প্রথম’ হয়ে রইলেন।
এটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি বাংলাদেশের নারী সমাজের জন্যও এক অনুপ্রেরণার গল্প।
একজন নারী, যিনি পদকে নয়—কাজকে বড় করেছেন
জেলা প্রশাসকের পদ নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাঠ প্রশাসনিক দায়িত্ব। একটি জেলার প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, উন্নয়ন, জনসেবা, দুর্যোগ মোকাবিলা, সরকারি কার্যক্রম বাস্তবায়ন এবং সাধারণ মানুষের নানা প্রত্যাশার সঙ্গে এই দায়িত্ব ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
আর ঢাকা—দেশের রাজধানীর প্রশাসনিক বাস্তবতা আরও ব্যাপক, জটিল ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ।
এই বিশাল দায়িত্বের কেন্দ্রে একজন নারী হিসেবে ফরিদা খানমের দায়িত্ব পালন তাই নিছক একটি পদায়ন নয়; এটি সক্ষমতা, দক্ষতা, নেতৃত্ব এবং মানবিকতার এক বড় পরীক্ষা।
ইতোমধ্যে তাঁর কর্মধারায় যে বিষয়টি বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, তা হলো—প্রশাসনকে মানুষের কাছে নেওয়ার চেষ্টা।
সরকারের উন্নয়ন, জনকল্যাণ ও বিভিন্ন কার্যক্রমের সুফল যেন সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, সে লক্ষ্যে তাঁর সক্রিয়তা একজন জেলা প্রশাসকের দায়িত্বকে কেবল দাপ্তরিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ রাখেনি; বরং মানুষের সঙ্গে প্রশাসনের দূরত্ব কমানোর একটি প্রয়াস হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে।
একজন জেলা প্রশাসকের সাফল্য শুধু কতটি সভা হলো, কতটি ফাইল নিষ্পত্তি হলো কিংবা কতটি সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলো—তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। মানুষের মুখে স্বস্তির হাসি, অসহায়ের পাশে প্রশাসনের উপস্থিতি এবং নাগরিকের মনে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা তৈরি করতে পারাও একজন সফল প্রশাসকের বড় অর্জন।
এই জায়গাটিতেই ফরিদা খানমকে আমি একজন মানবিক জেলা প্রশাসক হিসেবে দেখতে চাই।
চট্টগ্রামে তাঁর পথচলা—একটি স্মরণীয় অধ্যায়
চট্টগ্রাম শুধু একটি জেলা নয়; এটি ইতিহাস, ঐতিহ্য, অর্থনীতি, বন্দর, পাহাড়, সমুদ্র ও অসংখ্য মানুষের স্বপ্নের শহর।
এই চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ফরিদা খানম যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন, তা বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কারণ, তাঁর আগে ১২৮ বছরের প্রশাসনিক ইতিহাসে কোনো নারী এই জেলার জেলা প্রশাসকের দায়িত্বে আসেননি।
তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের সময় থেকেই একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি তাঁর কর্মতৎপরতা পর্যবেক্ষণ করেছি। তাঁর বিভিন্ন কার্যক্রম, উদ্যোগ ও প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখা প্রকাশ করেছি।
দৈনিক ভোরের আওয়াজ, ইংরেজি ব্যানার পত্রিকা, চট্রল চিত্র, সময়ের আলোসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে ধারাবাহিকভাবে লিখেছি। কখনো বিশেষ প্রতিবেদন, কখনো বিশেষ সংখ্যা, কখনো সম্পাদকীয় ভাবনার অংশ হিসেবে তাঁর কর্মযাত্রাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
আমার কাছে সেটি ছিল শুধু একজন সরকারি কর্মকর্তাকে নিয়ে লেখা নয়; বরং একজন নারী কীভাবে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্বকে নিজের যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতার মাধ্যমে ধারণ করছেন—সেই গল্পটি তুলে ধরার চেষ্টা।
‘নারী কথা’—একটি বই, একটি বিশ্বাস
এই জায়গাতেই এসে ‘নারী কথা’ বইটির প্রসঙ্গটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
২০১০ সালে প্রকাশিত আমার বই ‘নারী কথা’ আমার লেখকজীবনের অন্যতম প্রিয় সৃষ্টি। আমার প্রকাশিত প্রায় ত্রিশটি বইয়ের মধ্যে এই বইটির প্রতি আমার আলাদা এক আবেগ ও গর্ব রয়েছে।
কারণ, এটি শুধু নারীদের নিয়ে লেখা কোনো সাধারণ গ্রন্থ নয়। এখানে রয়েছে নারীর জীবনসংগ্রাম, স্বপ্ন, ব্যর্থতা, সাফল্য, বেদনা, আত্মমর্যাদা ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।
বইটিতে দশজন নারীর জীবনের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরার পাশাপাশি রয়েছে অসংখ্য নারীর সাক্ষাৎকার। প্রত্যেকটি জীবনের ভেতরে রয়েছে আলাদা গল্প, আলাদা সংগ্রাম এবং আলাদা এক পৃথিবী।
এর মধ্যে বিশেষভাবে স্মরণীয় সৌদি আরবের বিদ্রোহী রাজকন্যা সুরাইয়ার সাক্ষাৎকার।
২০০৪ সালে কাতারের শেরাটন হোটেলে আমি সরাসরি তাঁর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলাম। সেই সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে সৌদি আরবের নারীদের জীবন, সীমাবদ্ধতা, সংগ্রাম এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার অনেক অজানা দিক তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
অর্থাৎ ‘নারী কথা’ লিখতে গিয়ে আমি শুধু নারীর কথা লিখিনি; আমি লিখেছি নারীর অস্তিত্ব, আত্মমর্যাদা, সংগ্রাম এবং সম্ভাবনার কথা।
২০১২ সালে কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব লেখক সম্মেলনে ‘নারী কথা’ উপস্থাপিত হওয়ার সুযোগ পায়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লেখকদের মাঝে বইটি প্রশংসিত হওয়া আমার লেখকজীবনের একটি স্মরণীয় অর্জন।
আর সেই ‘নারী কথা’ পৌঁছেছিল এক ইতিহাসসৃষ্টিকারী নারীর হাতে
তাই ২০২৫ সালের সেই দিনটি আমার কাছে বিশেষ ছিল।
চট্টগ্রামের প্রথম নারী জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের হাতে যখন ‘নারী কথা’র শেষ কপিটি তুলে দিয়েছিলাম, তখন আমার মনে হয়েছিল—বইটির নাম আর বইটি গ্রহণকারী মানুষটির মধ্যে যেন এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছে।
একদিকে আমার লেখা—নারীর সংগ্রাম, স্বপ্ন ও সাফল্যের গল্প।
অন্যদিকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন নারী—যিনি নিজেই তখন ইতিহাসের অংশ।
‘নারী কথা’র শেষ কপি যেন পৌঁছে গেল এমন একজন নারীর হাতে, যিনি নিজের কর্মজীবন দিয়েই প্রমাণ করছেন নারীর সক্ষমতার কোনো সীমারেখা নেই।
তিনি বইটি আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন। একজন লেখক হিসেবে সেই মুহূর্ত আমার জন্য ছিল গভীর আনন্দের, গর্বের এবং কৃতজ্ঞতার।
এক বছর পর ছবিটির অর্থ আরও গভীর
আজ, এক বছর পর যখন সেই ছবিটির দিকে ফিরে তাকাই, তখন মনে হয়—সেদিন আসলে শুধু একটি বই উপহার দেওয়া হয়নি; সময়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল একটি প্রতীকী মুহূর্ত।
তখন তিনি ছিলেন চট্টগ্রামের প্রথম নারী জেলা প্রশাসক।
আজ তিনি ঢাকার প্রথম নারী জেলা প্রশাসক।
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা—দুই জেলার প্রশাসনিক ইতিহাসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে গেছে।
আর এই কারণেই আজ ‘নারী কথা’ বইয়ের সেই ছবিটি আমার কাছে আরও বেশি মূল্যবান।
একজন লেখক হিসেবে আমি নারীর গল্প লিখেছি; আর আমার চোখের সামনে একজন নারী নিজের কর্মজীবন দিয়ে লিখে চলেছেন নিজের গল্প।
ফরিদা খানম—একটি অনুপ্রেরণার নাম
আমার সঙ্গে তাঁর পরিচয় শুধু একজন জেলা প্রশাসক ও একজন সাংবাদিকের পেশাগত সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর কর্মময় পথচলার নানা দিক নিয়ে আমি বহুবার লিখেছি, তাঁকে নিয়ে সংবাদ করেছি, বিশেষ সংখ্যায় বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশ করেছি।
তাঁর কর্মজীবনের বিভিন্ন অধ্যায়কে গণমাধ্যমে তুলে ধরতে গিয়ে আমার বারবার মনে হয়েছে—বাংলাদেশের প্রশাসনে নারী নেতৃত্ব এখন আর ব্যতিক্রম নয়; বরং যোগ্যতা, মেধা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে নারীরা নেতৃত্বের সর্বোচ্চ পর্যায়েও নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছেন।
ফরিদা খানম সেই অগ্রযাত্রারই একজন দৃশ্যমান প্রতিনিধি।
তাঁর সাহিত্যপ্রেমের কথাও শুনেছি। আমার অনেক লেখক বন্ধুর সঙ্গে তাঁর সাহিত্যিক যোগাযোগ ও সৌহার্দ্য রয়েছে। একজন প্রশাসকের মধ্যে যখন সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা থাকে, তখন তাঁর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি আরও সমৃদ্ধ হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
আমি বিশ্বাস করি, একজন ভালো প্রশাসক কেবল আইন ও বিধি দিয়ে মানুষকে দেখেন না; তিনি মানুষের জীবনকে বুঝতে চেষ্টা করেন। আর সাহিত্য সেই মানুষকে বোঝার অন্যতম বড় জানালা।
শুভকামনা—ইতিহাসের পথ আরও দীর্ঘ হোক
আজ ঢাকার জেলা প্রশাসক হিসেবে ফরিদা খানম যে দায়িত্ব পালন করছেন, তা নিঃসন্দেহে কঠিন, বিস্তৃত ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ।
তাঁর এই দায়িত্বকালে রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড আরও কার্যকরভাবে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাক—এই প্রত্যাশা করি।
মানুষ যেন প্রশাসনের দরজায় এসে শুধু নিয়মের দেয়াল না দেখে, বরং একজন মানবিক রাষ্ট্রকর্মীর সহমর্মিতার হাতও খুঁজে পায়—এই হোক তাঁর প্রশাসনিক দর্শনের সবচেয়ে উজ্জ্বল পরিচয়।
চট্টগ্রামের ১২৮ বছরের ইতিহাসে প্রথম নারী জেলা প্রশাসক হিসেবে যে পথ তিনি শুরু করেছিলেন, ঢাকায় এসে সেই পথ যেন আরও বিস্তৃত হয়েছে।
চট্টগ্রামের প্রথম নারী জেলা প্রশাসক—ঢাকারও প্রথম নারী জেলা প্রশাসক।
এটি শুধু দুটি পদবির ইতিহাস নয়; এটি একজন নারীর যোগ্যতা, সাহস, মেধা, কর্মনিষ্ঠা ও নেতৃত্বের প্রতি সময়ের স্বীকৃতি।
আর সেই ইতিহাসের একটি ছোট্ট স্মারক হয়ে থাকবে ‘নারী কথা’র সেই শেষ কপিটি।
আজ তাই গত বছরের সেই ছবির দিকে তাকিয়ে নতুন করে বলি-
ফরিদা খানম, আপনাকে অভিনন্দন।
চট্টগ্রামের ইতিহাসে আপনার ‘প্রথম’ পরিচয় আজ ঢাকার ইতিহাসেও নতুন অর্থ পেয়েছে। আপনার প্রশাসনিক পথচলা আরও সাফল্যমণ্ডিত হোক, মানুষের আস্থা ও ভালোবাসায় আরও সমৃদ্ধ হোক।
আর একজন লেখক হিসেবে আমার একান্ত আনন্দ এই যে
আমি একদিন ‘নারী কথা’ লিখেছিলাম নারীদের সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প বলতে; আজ সেই ‘নারী কথা’র একটি অধ্যায় যেন বাস্তবের মাটিতে নিজেই লিখে চলেছেন ফরিদা খানম।
ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠুক—মানবিকতায়, কর্মে, সততায় এবং মানুষের জন্য কাজ করার অনন্য দৃষ্টান্তে।
‘নারী কথা’ থেকে ইতিহাসের পাতায়—ফরিদা খানমের এই যাত্রা হোক আরও দীর্ঘ, আরও দীপ্তিময়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here