বোয়ালখালীতে বালুর অবৈধ বাণিজ্যের অভিযোগ-বৈধ বালুমহাল নেই, অথচ প্রতিদিন শত শত ট্রাক। চরণদ্বীপ, খরণদ্বীপ ও কধুরখীলে ৩০টির বেশি বালু বিক্রয়কেন্দ্রের অভিযোগ। রাজস্ব, পরিবেশ ও জনদুর্ভোগের দায় কার?

0
47

মো. কামাল উদ্দিনঃ
বালুমহাল নেই, অথচ বালুর ব্যবসা চলছে প্রকাশ্যে। নদী থেকে বৈধভাবে বালু উত্তোলনের সুযোগ নেই, অথচ প্রতিদিন রাতের আঁধারে শত শত ভারী ট্রাক বোঝাই করে বালু আসছে। চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার চরণদ্বীপ, খরণদ্বীপ ও কধুরখীল এলাকায় একের পর এক বালু বিক্রয়কেন্দ্র গড়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব এলাকায় ৩০টিরও বেশি বালু বিক্রয়কেন্দ্র সক্রিয় রয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই বিপুল পরিমাণ বালু আসছে কোথা থেকে?
কোন বালুমহাল থেকে আসছে? সেই বালুমহাল বর্তমানে বৈধভাবে ইজারা দেওয়া হয়েছে কি না? ইজারার মেয়াদ আছে কি না? বালু উত্তোলনের অনুমোদিত সীমানা ও পরিমাণ কত? আর বোয়ালখালীর প্রতিটি বিক্রয়কেন্দ্রের কাছে বালুর বৈধ উৎসের কাগজপত্রই বা কোথায়? এই প্রশ্নগুলোর স্বচ্ছ উত্তর এখন বোয়ালখালীর সাধারণ মানুষের দাবি।বালুমহাল নেই, কিন্তু বালুর ব্যবসা থেমে নেই- বালু উত্তোলন ও বিপণনের ক্ষেত্রে সরকারি আইন ও বিধিমালা রয়েছে। নদী বা নির্দিষ্ট স্থান থেকে ইচ্ছেমতো বালু উত্তোলন করে এনে যেকোনো স্থানে স্তূপ করে বিক্রি করার সুযোগ নেই। বালুমহাল ঘোষণা, ইজারা, নির্ধারিত সীমানা, সরকারি রাজস্ব এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করেই বালু উত্তোলন ও বিপণনের বৈধতা তৈরি হয়। কিন্তু বোয়ালখালীর চিত্র নিয়ে এখন যে অভিযোগ উঠেছে, তা এসব বিধিবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, সেটিই তদন্তের বিষয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চরণদ্বীপ, খরণদ্বীপ ও কধুরখীলের বিভিন্ন স্থানে বালু এনে স্তূপ করা হচ্ছে। এরপর সেখান থেকে ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহনে করে বালু বিক্রি করা হচ্ছে। যদি এসব কার্যক্রম বৈধ হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিটি কেন্দ্রের অনুমোদন, বালুর উৎস ও ইজারার কাগজপত্র থাকার কথা। আর যদি বৈধ না হয়, তাহলে এতদিন ধরে প্রকাশ্যে এই বাণিজ্য কীভাবে চলছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
রাউজানের বালুমহালের নামেই কি বোয়ালখালীতে বালু?-স্থানীয়ভাবে দাবি করা হচ্ছে, বোয়ালখালীর বিভিন্ন বালু বিক্রয়কেন্দ্রে রাউজানের নোয়াপাড়া ও বাগোয়ান এলাকার বালুমহালের নাম ব্যবহার করে বালু সরবরাহ করা হচ্ছে।
এখানেই প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক তদন্ত।
কারণ কোনো বিক্রয়কেন্দ্রের মালিক শুধু কোনো একটি বালুমহালের নাম বললেই বালুর উৎস বৈধ প্রমাণিত হয় না। সংশ্লিষ্ট বালুমহালের ইজারার কাগজ দেখতে হবে।
ইজারাদারের নাম জানতে হবে। ইজারার মেয়াদ যাচাই করতে হবে। ইজারার সীমানা যাচাই করতে হবে।
কত পরিমাণ বালু উত্তোলনের অনুমতি রয়েছে তা দেখতে হবে। বাস্তবে কত বালু উত্তোলন হচ্ছে তা নিরূপণ করতে হবে। এরপর দেখতে হবে সেই বালু কোথায় যাচ্ছে।
বোয়ালখালীর কোন কোন বিক্রয়কেন্দ্রে যাচ্ছে।
প্রতিদিন কত ট্রাক যাচ্ছে। সরকার কত টাকা রাজস্ব পাচ্ছে। এই পুরো সরবরাহব্যবস্থার হিসাব না করলে প্রকৃত চিত্র বের হবে না। ইজারা না থাকলে বালু উত্তোলন হচ্ছে কীভাবে?- স্থানীয় সূত্রের দাবি, রাউজানের নোয়াপাড়া ও বাগোয়ান এলাকার সংশ্লিষ্ট দুই বালুমহালের ইজারা বা টেন্ডার নিয়ে গত এক বছরে জটিলতা রয়েছে এবং বৈধ ইজারা না থাকলেও সেখানে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। এই তথ্যের সত্যতা জেলা প্রশাসনের নথি দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
যদি সত্যিই সংশ্লিষ্ট বালুমহালের বৈধ ইজারা না থাকে, তাহলে নদী থেকে বালু উত্তোলন করে তা শত শত ট্রাকে করে বোয়ালখালীতে এনে বিক্রি করার আইনগত ভিত্তি কী? আর যদি কোনো সরকারি অনুমোদন, খাস আদায় বা অন্য কোনো বৈধ ব্যবস্থার মাধ্যমে বালু উত্তোলনের সুযোগ থাকে, তাহলে সেই সরকারি নথি প্রকাশ করা প্রয়োজন। কারণ প্রশ্নটি খুবই সরল।
ইজারা না থাকলে বালু উত্তোলন হচ্ছে কীভাবে?
আর বৈধ ব্যবস্থা থাকলে সেই ব্যবস্থার কাগজ কোথায়?অনাপত্তিপত্র কি বালু উত্তোলনের ইজারা?-আপনার সরবরাহ করা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের নথিতে একটি নির্দিষ্ট স্থানে বালু সংরক্ষণ ও বিপণনের জন্য অনাপত্তি প্রদানের কথা উল্লেখ রয়েছে। নথিতে নির্দিষ্ট জমির দাগ, খতিয়ান, মালিকানা এবং তদন্তের ভিত্তিতে স্থানটি বালু সংরক্ষণের উপযোগী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা জরুরি। কোনো নির্দিষ্ট জমিতে বালু সংরক্ষণ বা বিপণনের বিষয়ে অনাপত্তি থাকা এবং নদী বা বালুমহাল থেকে বালু উত্তোলনের বৈধ ইজারা থাকা এক বিষয় নয়। একটি বিক্রয়কেন্দ্রে বালু রাখার অনুমতি থাকলেও সেই বালু কোথা থেকে এসেছে, সেটি বৈধভাবে উত্তোলন করা হয়েছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট বালুমহালের ইজারা বৈধ কি না, তা আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে। সুতরাং বোয়ালখালীর প্রতিটি বালু বিক্রয়কেন্দ্রের ক্ষেত্রে শুধু জমির কাগজ বা অনাপত্তি নয়, বালুর উৎসের বৈধতা যাচাই করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। -৩০টির বেশি বিক্রয়কেন্দ্রের বৈধতা কোথায়?- চরণদ্বীপ, খরণদ্বীপ ও কধুরখীল এলাকায় ৩০টিরও বেশি বালু বিক্রয়কেন্দ্র থাকার অভিযোগ সত্য হলে প্রশাসনের উচিত এসব কেন্দ্রের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা। প্রতিটি কেন্দ্রের ক্ষেত্রে যাচাই করা প্রয়োজন জমির মালিক কে, জমির দাগ ও খতিয়ান কী, বালু সংরক্ষণের অনুমতি আছে কি না, বিক্রয়ের অনুমতি আছে কি না, বালুর উৎস কোন বালুমহাল, সংশ্লিষ্ট বালুমহালের ইজারাদার কে, ইজারার মেয়াদ কতদিন, বালু পরিবহনের কাগজপত্র কী এবং সরকারি রাজস্ব পরিশোধের প্রমাণ আছে কি না।
একই সঙ্গে দেখতে হবে এসব কেন্দ্রের অবস্থান পরিবেশ, জনবসতি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাকেন্দ্র, সরকারি স্থাপনা ও সড়কের জন্য কোনো ঝুঁকি তৈরি করছে কি না।
এই তালিকা প্রকাশ করা হলে একদিকে বৈধ ব্যবসায়ীরা স্বস্তি পাবেন, অন্যদিকে অবৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও সহজ হবে।-রাতের আঁধারে ভারী ট্রাকের বহর -স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের তুলনায় রাতের বেলায় বালুবাহী ভারী ট্রাকের চলাচল বেড়ে যায়।
১০ ও ১২ চাকার ট্রাকসহ বিভিন্ন ভারী যানবাহনে করে বালু পরিবহনের অভিযোগ রয়েছে। যদি প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ভারী ট্রাক চলাচল করে থাকে, তাহলে বিষয়টি শুধু বালু ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
এটি সড়ক নিরাপত্তা, জনদুর্ভোগ, পরিবেশ, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি অবকাঠামোর স্থায়িত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। যে সড়ক স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক যাতায়াতের জন্য নির্মিত, সেই সড়কে নিয়মিত অতিরিক্ত ওজনের ভারী ট্রাক চলাচল করলে রাস্তার ওপর তার প্রভাব পড়া স্বাভাবিক। রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার সংস্কারের জন্য আবার সরকারি অর্থ ব্যয় করতে হয়।
অর্থাৎ একটি বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের সুবিধা যদি কোনো একটি পক্ষ পায়, অথচ সেই কর্মকাণ্ডের কারণে রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে জনগণের অর্থে তা সংস্কার করতে হয়, তাহলে বিষয়টি অবশ্যই জনস্বার্থের দৃষ্টিতে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। স্কুল, কলেজ ও হাসপাতালের পথেও ট্রাক- স্থানীয়দের অভিযোগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার ও চিকিৎসাকেন্দ্রমুখী সড়ক দিয়েও ভারী বালুবাহী ট্রাক চলাচল করে।
একজন অভিভাবক বলেন, “আমরা বৈধ ব্যবসা বন্ধের কথা বলছি না। কিন্তু আমাদের সন্তানরা যে রাস্তায় স্কুলে যায়, সেই রাস্তায় যদি নিয়মিত ভারী ট্রাক চলাচল করে, তাহলে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি প্রশাসনকে দেখতে হবে।” একজন রোগীর স্বজন বলেন, “অ্যাম্বুলেন্স ও রোগীবাহী গাড়িকে দ্রুত চলাচল করতে হয়। ভারী ট্রাকের কারণে যদি রাস্তা সংকুচিত বা যানজটপূর্ণ হয়, তাহলে রোগীদের দুর্ভোগ বাড়ে।” একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, “বৈধ ব্যবসায়ীরা নিয়ম মেনে ব্যবসা করতে চান। কিন্তু অবৈধ ব্যবসার কারণে বৈধ ব্যবসায়ীরাও প্রশ্নের মুখে পড়েন। প্রশাসন কাগজপত্র যাচাই করে বৈধ ও অবৈধ ব্যবসা আলাদা করুক।” পরিবেশের প্রশ্নও উপেক্ষা করা যাবে না- বালু উত্তোলনের সঙ্গে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, নদীর তীর, তীরভাঙন, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় পরিবেশের বিষয় জড়িত।
বিশেষ করে যেখানে বৈধ বালুমহাল নেই, সেখানে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ থাকলে বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন।
কোথা থেকে বালু কাটা হচ্ছে, কত গভীর পর্যন্ত কাটা হচ্ছে, নদীর তীর থেকে কত দূরে উত্তোলন করা হচ্ছে এবং উত্তোলনের ফলে নদীর গতিপথ বা তীরভাঙনের ওপর কী প্রভাব পড়ছে, তা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও প্রশাসনের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।সন্ত্রাসী প্রভাবের অভিযোগও তদন্তের দাবি রাখে- বালুমহাল ও বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন পক্ষের প্রভাব, ভয়ভীতি এবং সংঘবদ্ধ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে বলেও স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করছেন। তবে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে প্রমাণ ছাড়া সন্ত্রাসী বা অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়। অভিযোগ থাকলে পুলিশ ও প্রশাসনের তদন্ত করা উচিত। বালু বিক্রয়কেন্দ্রগুলোর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে? কোনো সংঘবদ্ধ চক্র এর সঙ্গে যুক্ত কি না?
কেউ ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে কি না?
অবৈধ অর্থ আদায়ের অভিযোগ আছে কি না?
বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে কোনো মামলা, সংঘর্ষ বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমেই বেরিয়ে আসতে পারে। প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন-সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানেই।
প্রশাসনের চোখের সামনে যদি এতগুলো বালু বিক্রয়কেন্দ্র থাকে, যদি প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ট্রাক চলাচল করে, যদি স্থানীয়রা নিয়মিত অভিযোগ করেন এবং যদি বালুর উৎসের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকে, তাহলে নিয়মিত ও সমন্বিত নজরদারি হচ্ছে কি না, সেটি জানা প্রয়োজন। কয়েকটি বিচ্ছিন্ন অভিযান সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। একটি কেন্দ্র বন্ধ হওয়ার পর যদি অন্য কেন্দ্রগুলো একইভাবে চালু থাকে, তাহলে মূল উৎসে হাত না দিলে অবৈধ বালু বাণিজ্য বন্ধ করা সম্ভব হবে না।
প্রয়োজন হলো উৎস থেকে বিক্রয়কেন্দ্র পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থার তদন্ত। জেলা প্রশাসনের কাছে ১৫টি সরাসরি প্রlশ্ন-১। বোয়ালখালী উপজেলার কর্ণফুলী নদীতে বর্তমানে বৈধভাবে ঘোষিত কোনো বালুমহাল আছে কি? ২। না থাকলে বোয়ালখালীতে বিক্রি হওয়া বালুর উৎস কী?
৩। চরণদ্বীপ, খরণদ্বীপ ও কধুরখীলে কতটি অনুমোদিত বালু বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে? ৪। ৩০টির বেশি কেন্দ্রের যে অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসন কি তার তালিকা তৈরি করেছে? ৫। প্রতিটি কেন্দ্র কোন বালুমহাল থেকে বালু সংগ্রহ করে? ৬। সংশ্লিষ্ট বালুমহালের ইজারা বর্তমানে বৈধ কি না? ৭। ইজারার মেয়াদ শেষ হয়ে থাকলে বালু উত্তোলন হচ্ছে কীভাবে? ৮। প্রতিদিন কত ট্রাক বালু বোয়ালখালীতে প্রবেশ করছে? ৯। ট্রাকগুলোর বালুর উৎস যাচাই করা হচ্ছে কি? ১০। গত এক বছরে অবৈধ বালু উত্তোলন ও বিক্রয়ের বিরুদ্ধে কতটি মামলা হয়েছে?
১১। কত টাকা জরিমানা আদায় হয়েছে? ১২। কতটি ট্রাক বা বালু উত্তোলনের যন্ত্রপাতি জব্দ করা হয়েছে?
১৩। সরকারি রাজস্বের সম্ভাব্য ক্ষতির কোনো হিসাব করা হয়েছে কি? ১৪। ভারী ট্রাক চলাচলে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের সংস্কার ব্যয় কে বহন করবে? ১৫। বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র বা সন্ত্রাসী প্রভাবের অভিযোগ থাকলে তার বিরুদ্ধে কী তদন্ত হয়েছে? বোয়ালখালী আসনের সংসদ সদস্যের দৃষ্টি আকর্ষণ-বোয়ালখালী আসনের সংসদ সদস্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এটি কোনো ব্যক্তিবিশেষের বৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে অবস্থান নয়। এটি জনস্বার্থ, সরকারি সম্পদ, সরকারি রাজস্ব, পরিবেশ এবং সড়ক নিরাপত্তার প্রশ্ন। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করে বৈধ ও অবৈধ বালু ব্যবসার একটি স্বচ্ছ তালিকা প্রকাশ, বালুর উৎস যাচাই, অবৈধ উত্তোলন বন্ধ, সরকারি রাজস্ব নিশ্চিত এবং জনগণের সড়ক রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের দাবি জানাতে পারেন। একই সঙ্গে কোনো বৈধ ব্যবসায়ী যেন হয়রানির শিকার না হন এবং অবৈধ ব্যবসা যেন কোনো প্রভাবশালী পরিচয়ের আড়ালে চলতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। জেলা প্রশাসকের সরাসরি হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি- চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কাছে দাবি, বোয়ালখালীতে শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ বিশেষ তদন্ত পরিচালনা করা হোক। জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে ভূমি প্রশাসন, পুলিশ, পরিবেশ অধিদপ্তর, সড়ক কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দপ্তরের সমন্বয়ে একটি বিশেষ টিম গঠন করা যেতে পারে। প্রথমে সব বালু বিক্রয়কেন্দ্রের তালিকা তৈরি করতে হবে। এরপর প্রতিটি কেন্দ্রের জমির কাগজ যাচাই করতে হবে। বালুর উৎস যাচাই করতে হবে। সংশ্লিষ্ট বালুমহালের ইজারা যাচাই করতে হবে। ইজারার মেয়াদ ও সীমানা যাচাই করতে হবে। বালু পরিবহনের কাগজপত্র পরীক্ষা করতে হবে। সরকারি রাজস্বের হিসাব করতে হবে। সড়কের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করতে হবে। পরিবেশগত প্রভাব যাচাই করতে হবে। এবং তদন্তে আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। বোয়ালখালীর মানুষের প্রশ্ন খুবই স্পষ্ট। বৈধ বালুমহাল কোথায়? বালু আসছে কোথা থেকে? কার অনুমতিতে আসছে? কোন ইজারার ভিত্তিতে আসছে? সরকার কত টাকা রাজস্ব পাচ্ছে? আর যদি সবকিছু বৈধই হয়, তাহলে সেই বৈধতার কাগজ প্রকাশ্যে আনতে সমস্যা কোথায়? কর্ণফুলী নদী কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। সরকারি বালুমহালও কারও ব্যক্তিগত উত্তরাধিকার নয়। জনগণের রাস্তা কোনো বালু ব্যবসার ব্যক্তিগত পরিবহনপথ নয়। আর সরকারি রাজস্ব কোনো অদৃশ্য হিসাবের বিষয় নয়। বোয়ালখালীতে বালুর ব্যবসা চলুক, কিন্তু আইনের বাইরে নয়। বৈধ ব্যবসা থাকুক, কিন্তু অবৈধ বালু নয়। বালু বিক্রি হোক, কিন্তু জনগণের রাস্তা, পরিবেশ ও জননিরাপত্তার বিনিময়ে নয়। এখন সময় এসেছে শুধু বালুর স্তূপ দেখার নয়, বালুর উৎসের কাগজপত্রও দেখার। জনগণ জানতে চায় সত্যটা কী। আর সেই সত্য উদঘাটনের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের।
“সড়ক যে পরিমাণ যানবাহন ও ওজন বহনের জন্য নির্মিত, তার চেয়ে অতিরিক্ত ওজনের ভারী ট্রাক নিয়মিত চলাচল করলে সড়কের স্থায়িত্ব কমে যেতে পারে। বিশেষ করে রাতদিন ভারী বালুবাহী ট্রাক চলাচল করলে রাস্তার পেভমেন্ট, কালভার্ট ও সেতুর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। তাই সড়কের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী যানবাহনের ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত কারিগরি পরিদর্শন জরুরি।”
“বালু উত্তোলন, পরিবহন ও বিক্রয়ের প্রতিটি ধাপের জন্য সংশ্লিষ্ট আইন ও সরকারি অনুমোদন অনুসরণ করতে হয়। কোনো স্থানে বালু বিক্রি করা হচ্ছে বলেই বালুর উৎস বৈধ হয়ে যায় না। বালুর উৎস, ইজারা, পরিবহন ও বিক্রয়ের কাগজপত্র যাচাই করা প্রশাসনের দায়িত্ব। আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
“একটি এলাকায় যদি নিয়মিত বিপুলসংখ্যক বালুবাহী ট্রাক চলাচল করে এবং একই সঙ্গে রাস্তার ক্ষতি ও জনদুর্ভোগের অভিযোগ ওঠে, তাহলে বিষয়টি শুধু ব্যবসায়িক খবর নয়, এটি জনস্বার্থের অনুসন্ধানের বিষয়। প্রশাসনের উচিত বালুর উৎস, বিক্রয়কেন্দ্রের অনুমোদন এবং সরকারি রাজস্বের হিসাব জনসমক্ষে পরিষ্কার করা।”
“ভারী ট্রাকের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল সড়কে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে স্কুল, বাজার, হাসপাতাল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ভারী যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। কোনো বালুবাহী ট্রাকের কাগজপত্র বা কার্যক্রমে আইনভঙ্গের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
“বালু উত্তোলন ও বিক্রয়কে কেন্দ্র করে যদি সরকারি রাজস্ব, পরিবেশ, সড়ক এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের প্রশ্ন ওঠে, তাহলে বিষয়টি প্রশাসনিক স্বচ্ছতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের দায়িত্ব হলো বৈধ ব্যবসার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে অবৈধ কার্যক্রমের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা। জনগণের সামনে তথ্য প্রকাশ করা হলে আস্থাও বাড়বে।”
–মো. কামাল উদ্দিনঃ সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক,
ডেপুটি এডিটর, দৈনিক দি টুরিস্ট, যুগ্ম সম্পাদক, দৈনিক ভোরের আওয়াজ,সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম সিনিয়র’স প্রেসক্লাব ও মহাসচিব, বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম (GCCF)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here