
-মোহাম্মদ মহসিনঃ
ধর্মীয় আবেগের সঙ্গে মানবিকতার মেলবন্ধন—মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাদর্শ, শান্তি, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার বার্তা ছড়িয়ে দিতে চট্টগ্রামের উত্তর চান্দগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত হলো পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বেলা ২টায় উত্তর চান্দগাঁওয়ের সাকি মেম্বার ঘাটা এলাকায় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের পাশাপাশি উঠে আসে মানবতার প্রতি দায়বদ্ধতার অঙ্গীকার। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, সমাজকর্মী, সাংবাদিক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি পরিণত হয় এক মানবিক মিলনমেলায়।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন মো. কামাল উদ্দিন, যুগ্ম সম্পাদক দৈনিক ভোরের আওয়াজ, ডেপুটি এডিটর দি টুরিস্ট ও টেলিভিশন উপস্থাপক।
সভাপতিত্ব ও সার্বিক পরিচালনা করেন মো. সেলিম উল্লাহ চৌধুরী, প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি—Green Adorn এবং প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি—সফিউর রহমান চৌধুরী ট্রাস্ট।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি হামিদ হোসাইন, সিনিয়র সহসভাপতি লায়ন জিল্লুর রহমান শাকিল, মোহাম্মদ নুরুল হুদা চৌধুরী, দেলোয়ার হোসেনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তি, সমাজসেবক, সাংবাদিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
আনুষ্ঠানিকতার বাইরে মানবতার শিক্ষা
আলোচনায় বক্তারা বলেন, ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) কেবল একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়; মহানবী (সা.)-এর জীবন, কর্ম ও আদর্শ থেকে মানবিকতা, ন্যায়, সাম্য, সহমর্মিতা ও শান্তির শিক্ষা গ্রহণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে সমাজ থেকে হিংসা, বিদ্বেষ, বৈষম্য ও অন্যায় দূর করে মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব বলে মত দেন বক্তারা।
তাঁরা বলেন, ধর্মের শিক্ষা মানুষের জীবনে তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা মানুষের কল্যাণে প্রতিফলিত হয়। ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেওয়া, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো, বিপদগ্রস্তকে সহযোগিতা করা, মানুষের অধিকার রক্ষা করা এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই মহানবী (সা.)-এর আদর্শ বাস্তব জীবনে ধারণ করা সম্ভব।
সেলিম উল্লাহ চৌধুরী: মিলাদ হোক মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রেরণা
সভাপতির বক্তব্যে সেলিম উল্লাহ চৌধুরী ধর্মীয় আয়োজনকে মানবিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, মহানবী (সা.) মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সহমর্মিতা, ক্ষমা ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা দিয়েছেন। তাই মিলাদুন্নবীর মতো আয়োজন শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজের মানুষের কল্যাণে কাজ করার অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করা উচিত।
তিনি Green Adorn এবং সফিউর রহমান চৌধুরী ট্রাস্টের মানবিক কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরে বলেন, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে থাকার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। সমাজের বিত্তবান ও সক্ষম ব্যক্তিদেরও মানবিক কাজে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
কামাল উদ্দিন: মহানবী (সা.) ছিলেন মানবতার আলোকবর্তিকা
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মো. কামাল উদ্দিন বলেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন মানবতার জন্য এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। তিনি মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শিখিয়েছেন এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ধর্মের সৌন্দর্য শুধু আনুষ্ঠানিকতায় নয়; মানুষের প্রতি ভালোবাসা, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো, অন্যের অধিকার রক্ষা এবং সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার মধ্যেই ধর্মের প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশ পায়।
কামাল উদ্দিন বলেন, মহানবী (সা.)-এর আদর্শকে শুধু ওয়াজ, আলোচনা কিংবা মিলাদ মাহফিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। তাঁর শিক্ষা আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রতিফলিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আজকের পৃথিবীতে বিভাজন, হিংসা, অসহিষ্ণুতা ও অবিশ্বাস যখন মানুষের সম্পর্ককে দুর্বল করছে, তখন মহানবী (সা.)-এর সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, ক্ষমা, সহনশীলতা ও মানবিকতার শিক্ষা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।
সেলিম উল্লাহ চৌধুরীর উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ধর্মীয় চেতনার সঙ্গে মানবিক কর্মকাণ্ডের সংযোগ ঘটিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এ উদ্যোগ সমাজের জন্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হতে পারে।
হামিদ হোসাইন: মানবিক সমাজ গঠনে আদর্শের চর্চা চাই
বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি হামিদ হোসাইন বলেন, মহানবী (সা.)-এর জীবন থেকে ন্যায়, ইনসাফ, মানবিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে।
তিনি বলেন, সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষের মধ্যে বিভেদ নয়, ঐক্য ও সম্প্রীতি বাড়াতে হবে। ধর্মীয় মূল্যবোধকে মানুষের কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলেই একটি মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে।
লায়ন জিল্লুর রহমান শাকিল: মানবসেবাই হোক ঈদে মিলাদুন্নবীর অঙ্গীকার
বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের সিনিয়র সহসভাপতি লায়ন জিল্লুর রহমান শাকিল বলেন, মহানবী (সা.)-এর জীবন মানবসেবার এক অনন্য শিক্ষা। ধর্মীয় অনুভূতিকে মানবকল্যাণে কাজে লাগাতে হবে।
তিনি বলেন, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বিপদে মানুষের সহযোগী হওয়া এবং সমাজে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখতে হবে।
দেলোয়ার হোসেন: ভালোবাসা প্রকাশ পাক কর্মে
দেলোয়ার হোসেন বলেন, মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা শুধু মুখের কথায় প্রকাশ করলেই হবে না; সেই ভালোবাসা মানুষের সঙ্গে আচরণে ও মানবসেবায় প্রকাশ করতে হবে।
তিনি বলেন, হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করে ক্ষমা, সহমর্মিতা ও ভালোবাসার চর্চা বাড়াতে পারলে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
পরে তিনিই বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করেন।
নুরুল হুদা চৌধুরী: মানুষের মর্যাদা রক্ষাই মহান শিক্ষা
মোহাম্মদ নুরুল হুদা চৌধুরী বলেন, মহানবী (সা.) মানুষের মর্যাদা, অধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রতি যে গুরুত্ব দিয়েছেন, তা আজও আমাদের জন্য অনুকরণীয়।
তিনি বলেন, ধর্মীয় অনুষ্ঠান মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করার জন্য নয়; বরং ভালোবাসা, ঐক্য, সম্প্রীতি ও মানবিকতার বন্ধন আরও দৃঢ় করার মাধ্যম হওয়া উচিত।
নারী নেতৃত্ব ও মানবিক সমাজের প্রত্যাশা
অনুষ্ঠানে নারীর অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের গুরুত্বও উঠে আসে। বক্তারা বলেন, পরিবার থেকে সমাজ—সর্বত্র মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় নারীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নারীর নেতৃত্বে শিক্ষা, মানবসেবা, সামাজিক সচেতনতা ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কল্যাণে আরও বেশি উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ থেকে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার শিক্ষা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।
ধর্মীয় আয়োজন থেকে সামাজিক অঙ্গীকার
অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিরা বলেন, ধর্মীয় আয়োজন তখনই আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে, যখন তা মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা সৃষ্টি করে এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল করে তোলে।
তাঁদের মতে, মহানবী (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের প্রতি সম্মান, সহমর্মিতা ও ভালোবাসার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। সমাজের অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই হতে পারে এ ধরনের আয়োজনের অন্যতম বাস্তব ফলাফল।
বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত
আলোচনা সভা শেষে দেশ, জাতি, সমাজ, মুসলিম উম্মাহ এবং সমগ্র মানবজাতির শান্তি ও কল্যাণ কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
মোনাজাতে দেশ ও জাতির শান্তি-সমৃদ্ধি, মানুষের নিরাপত্তা, অসহায় ও বিপন্ন মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘব এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করে জীবন পরিচালনার তাওফিক কামনা করা হয়।
ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, ভালোবাসা ও মানবিকতার বার্তা নিয়ে শেষ হয় উত্তর চান্দগাঁওয়ের এ আয়োজন।
শেষ কথা
মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা শুধু হৃদয়ে ধারণ করার বিষয় নয়—সেই ভালোবাসা মানুষের প্রতি আচরণে, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানোর সাহসে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের পক্ষে অবস্থানে এবং মানবকল্যাণের কাজে প্রতিফলিত হওয়াই হোক ঈদে মিলাদুন্নবীর প্রকৃত শিক্ষা।