
চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হওয়ার তথ্য তুলে ধরে জাতীয় সংসদে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। তিনি জানান, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত নিখোঁজ হওয়া শিশুদের মধ্যে এখনো দুই হাজারের বেশি শিশুর সন্ধান মেলেনি। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে দেওয়া বক্তব্যে এ উদ্বেগ প্রকাশ করেন রুমিন ফারহানা। সংসদে রুমিন ফারহানা বলেন, চলতি বছরের সাত মাসে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হয়েছে। এর মধ্যে এখনো দুই হাজারের বেশি শিশুর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। নিখোঁজ শিশুদের পরিবার তাদের সন্তানদের ফিরে পাওয়ার দাবিতে সভা করেছে বলেও জানান তিনি। সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উপস্থিত থাকায় বিষয়টি তার দৃষ্টিতে আনেন রুমিন। তিনি বলেন, আইনগত সংজ্ঞা অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মচারী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের সমর্থন, অনুমোদন বা সম্মতিতে কাউকে বেআইনিভাবে আটক করা হলে সেটিকে গুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শিশু নিখোঁজের সব ঘটনা সরাসরি গুমের সংজ্ঞার আওতায় না পড়লেও বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন তিনি। এ সময় সংসদে বিবেচনাধীন ‘বলপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’-এর প্রসঙ্গও তুলে ধরেন রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, গত দেড় দশকে আয়নাঘর ও সাদা পোশাকধারীদের আতঙ্কে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গুমকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি এবং গোপন বন্দিশালা নিষিদ্ধ করার উদ্যোগকে নীতিগতভাবে সমর্থন করেন তিনি। তবে এমন মানবতাবিরোধী অপরাধের আইন তাড়াহুড়ো করে পাস না করার আহ্বান জানান রুমিন। তার মতে, বিলটির খসড়া আরও গভীরভাবে যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে গুমকে চলমান বা অবিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে খসড়ায় সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। এর ফলে অতীতে গুমের শিকার হয়ে এখনো নিখোঁজ থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির তামাদি ও ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। অতীতে সংঘটিত প্রতিটি গুমের বিচারের পথ আইনগতভাবে নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি। প্রমাণের দায় নিয়েও প্রশ্ন তোলেন রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, সাধারণত কোনো মামলায় প্রমাণ উপস্থাপনের দায়িত্ব প্রসিকিউশনের ওপর থাকে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় কোনো বাহিনী কাউকে তুলে নিয়ে গেলে এবং পরে সিসিটিভি ফুটেজসহ প্রমাণ না থাকলে অসহায় পরিবার কীভাবে আদালতে বিষয়টি প্রমাণ করবে—এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তার মতে, কোনো নাগরিককে সর্বশেষ যে বাহিনীর হেফাজতে দেখা গেছে, ওই ব্যক্তি তাদের হেফাজতে নেই—এটি প্রমাণের প্রাথমিক দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বাহিনীর ওপর থাকা উচিত। এ ছাড়া বিলে সামরিক ও বেসামরিক বিচারিক এখতিয়ার নিয়ে আরও স্পষ্ট ও শক্তিশালী বিধান রাখার দাবি জানান তিনি। আইনশৃঙ্খলা বা গোয়েন্দা বাহিনীর কোনো সদস্য গুমের ঘটনায় জড়িত থাকলে যাতে বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। গোপন আটককেন্দ্র নিষিদ্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না উল্লেখ করে রুমিন ফারহানা প্রস্তাব দেন, কাউকে আটকের সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টার মধ্যে জাতীয় কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডাটাবেজে তার তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা বাধ্যতামূলক করা উচিত। এতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বা আদালত দ্রুত বিষয়টি নজরে নিতে পারবে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার যাতে মাসের পর মাস প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে না হয়, সে জন্য অভিযোগ পাওয়ার ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে অনুপস্থিতির সনদ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখারও প্রস্তাব দেন তিনি। রুমিন ফারহানার বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ তাকে ধন্যবাদ জানান। নন-অবস্ট্যান্ট ক্লজ না থাকার বিষয়ে রুমিন ফারহানার বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিলে উল্লেখ রয়েছে—‘আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, এই আইনের বিধানাবলি প্রাধান্য পাইবে।’ তার মতে, এটিই নন-অবস্ট্যান্ট ক্লজ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, মানবাধিকার কমিশনসংক্রান্ত আগের অধ্যাদেশে কিছু ত্রুটি থাকায় সরকার সেটিকে প্রথম অধিবেশনেই আইনে পরিণত করেনি। বিভিন্ন অংশীজন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, সাংবাদিক, কূটনৈতিক মিশন এবং ইউএনডিপিসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা ও বিভিন্ন সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে আগের কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করে বর্তমান বিলটি আনা হয়েছে।