
দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে ২০২৮ সালের মধ্যে ১০০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছিল বিগত সরকার। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও সেই পরিকল্পনায় গুরুত্ব দেয়। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তিনটি কূপ খননের একটি প্রকল্পই অনুমোদন পেয়েছে। বিপরীতে, গ্যাসের ঘাটতি পূরণে একই সময়ে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে এলএনজি আমদানি। ফলে একদিকে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি বাড়ছে, অন্যদিকে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খনন কার্যক্রম চলছে ধীরগতিতে। এতে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আমদানি ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ১০০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়ার পর এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে প্রায় আড়াই বছর। এ সময়ের মধ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ এবং সর্বশেষ বর্তমান সরকারের ক্ষমতায় আসার কারণে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ গত ২২ জুলাই চলতি অর্থবছরের প্রথম এবং বর্তমান সরকারের ষষ্ঠ একনেক সভায় ৭২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ-৫ ও বেগমগঞ্জ-৬ এবং সুনামগঞ্জের সুনেত্র-২ কূপ খনন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর একনেকের বিভিন্ন সভায় গ্যাস খাতের এ একটি প্রকল্পই অনুমোদন পেয়েছে। এ অবস্থায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ১০০টি কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৮ সালের মধ্যে বাকি ৯৭টি কূপ খনন করা বাস্তবসম্মত নয়। এর আগেও আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ৫০টি কূপ খননের একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ে সেটিও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ওই প্রকল্পের আওতায় ২০২৫ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করার লক্ষ্য ছিল। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংশোধিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩১ সালের মধ্যে মোট ১৫০টি কূপ খননের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। এতে আগের প্রকল্পের অসমাপ্ত ২০টি কূপের পাশাপাশি নতুন ১০০টি কূপ অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যাপ্ত রিগের অভাব, অর্থায়ন সংকট ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে কূপ খনন কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। ২০৩১ সালের মধ্যে ১২০টি কূপ খনন করতে হলে প্রতি বছর গড়ে ২৪ থেকে ২৫টি কূপ খনন করতে হবে। এ জন্য দেশীয় রিগের পাশাপাশি বিদেশি রিগ ভাড়া এবং আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে কাজে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পেট্রোবাংলার ১০০ কূপ খননের পরিকল্পনায় ৫৬টি কূপ বাপেক্সের অধীনে, ৯টি বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি লিমিটেডের এবং ৮টি সিলেট গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি লিমিটেডের অধীনে রয়েছে। এসব কূপ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক অতিরিক্ত ১৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। পরিকল্পনাটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৯ হাজার ৫০ কোটি টাকা। বাপেক্সের অধীনে থাকা কূপগুলোর মধ্যে রয়েছে বেগমগঞ্জ-৫, বেগমগঞ্জ-৬, সুনেত্র-২, সুবর্ণচর-১, নোয়াখালী-১, মতলব-১, সুন্দলপুর-৫, সেমুতাং-৭ ও ৮, চরলক্ষ্যা-১, মানিকগঞ্জ-১, শাহবাজপুরের বিভিন্ন কূপ, ভোলা নর্থ-৫, কাসালং-১, পটিয়া-২, সীতাপাহাড়-৩, জলদি-৪, ফেঞ্চুগঞ্জ নর্থ-১, মদন-১, ধর্মপুর-১, বেগমগঞ্জ-৭, উডিরচর-১, সন্দ্বীপের বিভিন্ন কূপ, দোয়ারাবাজার, আলিমাবাদ, ভোলা ওয়েস্ট, শেরপুর, কোম্পানীগঞ্জ, সুনেত্র ইস্ট, ঘাটাইল, বিশ্বনাথ, জামালপুর, ডাকাতিয়া, নোয়াখালী-২, সুবর্ণচর-২ ও ৩ এবং মতলব-২ ও ৩। বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি লিমিটেডের অধীনে রয়েছে তিতাস-৩২ থেকে ৩৬, বাখরাবাদ-১২, মেঘনা-২, লস্করপুর-১ ও বানিয়াচং-১। সিলেট গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি লিমিটেডের অধীনে রয়েছে বিয়ানীবাজার-৩ থেকে ৬, কৈলাসটিলা-১০, রশিদপুর-১৪ এবং দোয়ারাবাজার-১ ও ৩। এ ছাড়া বাপেক্সের অধীনে ৩১টি কূপ ওয়ার্কওভারের তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে রূপগঞ্জ-১ ও সেমুতাং-৬ কূপের কাজ সম্প্রতি শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে বাপেক্স। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে নেওয়া ১০০ কূপের পরিকল্পনার মধ্যে বেগমগঞ্জ-৫, বেগমগঞ্জ-৬ ও সুনেত্র-২ কূপের প্রকল্প সম্প্রতি একনেকের অনুমোদন পেয়েছে। তবে অনুমোদন পাওয়ার পরপরই কূপ খননের কাজ শুরু করা সম্ভব নয়। জমি অধিগ্রহণ, ভূমি উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় সেবা ও মালামাল ক্রয়, রিগ স্থানান্তরসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষ করতে প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে। ফলে কূপ খননের পর গ্যাস পাওয়ার ফলাফল পেতে দেড় থেকে দুই বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় ঘাটতি পূরণে গত ছয় মাসে উল্লেখযোগ্য হারে এলএনজি আমদানি করেছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত স্পট মার্কেট থেকে অন্তত ৩৫ কার্গো এলএনজি কেনা হয়েছে। এপ্রিল মাসে গ্রীষ্মকালীন চাহিদা মেটাতে ১১টি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এর মধ্যে মাত্র তিনটি ছিল দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায়। বাকি আটটি কার্গো স্পট মার্কেট থেকে সংগ্রহ করা হয়। এ সময়ে কাতার থেকে সরবরাহ সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ কমে যায়। ফলে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বাইরে গিয়ে বাংলাদেশকে উচ্চমূল্যে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে হয়েছে। সংকটের আগে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ৯ থেকে ১০ ডলারের মধ্যে থাকলেও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশকে ১৯ থেকে ২৪ ডলার পর্যন্ত দামে কার্গো কিনতে হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দাম ২৫ ডলারের কাছাকাছিও পৌঁছেছে। এতে প্রতিটি কার্গোর ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সরকারি হিসাবে, মার্চ-এপ্রিল সময়ে অতিরিক্ত এলএনজি আমদানির কারণে ভর্তুকি ব্যয় প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কেনা কয়েকটি কার্গোর প্রতিটির পেছনে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে। গত জুলাইয়ে মোট ১১টি এলএনজি কার্গো আমদানি করা হয়। আগস্টে আরও ৯টি কার্গো আনার উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি বাড়তি চাহিদা মেটাতে আরও পাঁচটি কার্গো সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বল্পমেয়াদে এলএনজি আমদানি গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি ব্যয়বহুল সমাধান। বর্তমানে সরকার দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তি সম্প্রসারণ, নতুন সরবরাহকারী খোঁজা, ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়ানো এবং সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে আমদানিনির্ভরতা কমাতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খননে। তা না হলে এলএনজি আমদানির সঙ্গে সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, ভর্তুকির বোঝা এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকিও বাড়তে থাকবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বদরুল ইমাম বলেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি গ্যাসকূপ খনন করা কার্যত অসম্ভব। এমনকি অর্ধেক কূপ বাস্তবায়ন করা গেলেও সেটি গ্রহণযোগ্য হবে। সরকারের উচিত গ্যাসকূপ খননের কাজ অব্যাহত রাখা এবং নেওয়া পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। পেট্রোবাংলার পরিচালক (পরিকল্পনা) আবদুল মান্নান পাটোয়ারী বলেন, ১০০ কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়ার পর বেশ কয়েকটি কূপ খনন করা হয়েছে। এর মধ্যে নতুন ও ওয়ার্কওভার কূপ রয়েছে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনটি কূপ খননের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। নতুন কূপ খননে কিছু জটিলতা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে চেষ্টা চলছে।