
-মো.কামাল উদ্দিনঃ
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব হলো মানুষের জানমাল রক্ষা করা, অপরাধ দমন করা এবং রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ করা। কিন্তু সেই আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে যদি পুলিশের ওপরই প্রকাশ্যে হামলা হয়, সরকারি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়, পুলিশ সদস্য আহত হন এবং একটি সন্ত্রাসী চক্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান প্রতিহত করার সাহস দেখায়—তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে একটি কঠিন প্রশ্ন— “পুলিশই যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?” চট্টগ্রাম নগরের খুলশী এলাকায় পুলিশের অভিযানে হামলা, পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর এবং দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের আহত হওয়ার ঘটনায় সেই প্রশ্নই এখন নগরবাসীর মুখে মুখে। ঘটনার পর পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগাকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল। পুলিশের দাবি, ওই অভিযানের সময় বগার অনুসারীরা পুলিশের পথরোধ করে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে এবং একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা চালায়। এতে খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবদুর রহিমসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন এবং ওসির সরকারি গাড়িও ভাঙচুরের শিকার হয়। আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে পুলিশের ওপর হামলা পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানের সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশের গতিরোধ করতে রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। একপর্যায়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল, বোতল ও বিস্ফোরকসদৃশ বস্তু নিক্ষেপের অভিযোগ ওঠে। হামলায় পুলিশের সরকারি গাড়ির ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে হয়। পুলিশের দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ব্যবহার করা হয়। এদিকে অভিযানের মূল লক্ষ্য ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়। পুলিশের দাবি, হামলার সুযোগে তিনি একটি গোপন পথ দিয়ে পালিয়ে যান। ওসি আবদুর রহিমের ভূমিকা নিয়ে প্রশংসা ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো—আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল অবস্থান নেওয়া খুলশী থানার ওসি মোহাম্মদ আবদুর রহিমের ভূমিকা। একজন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যখন অপরাধীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে নিজেই হামলার শিকার হন, তখন বিষয়টি শুধু একজন পুলিশ কর্মকর্তার ওপর হামলা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের সক্ষমতা এবং মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মনোবলের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। অপরাধ দমনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের যদি অপরাধীচক্রের হামলার মুখে পড়তে হয় এবং তাদের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তাহলে ভবিষ্যতে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ভয় ও অনীহা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই সাহসী পুলিশ কর্মকর্তাদের মনোবল বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের আইনসম্মত দায়িত্ব পালনে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। মামলা নিয়ে প্রথমে প্রশ্ন, পরে আইনি পদক্ষেপ ঘটনার পরপরই জনমনে প্রশ্ন উঠেছিল—পুলিশের ওপর প্রকাশ্য হামলা, সরকারি গাড়ি ভাঙচুর এবং দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগের পরও কেন দ্রুত মামলা ও গ্রেপ্তার হচ্ছে না? পরবর্তীতে অবশ্য পুলিশের ওপর হামলা ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা, তার ভাই রকি হোসেন পিচ্চিসহ ২৭১ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন মামলা হয়েছে কি না—সেটি নয়; বরং প্রশ্ন হলো, মামলার পর আইন তার নিজস্ব গতিতে কতটা কার্যকরভাবে এগোয়। কারা সরাসরি হামলায় জড়িত ছিল, কারা পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করেছে, কারা আইন প্রয়োগে বাধা দিয়েছে এবং কারা ঘটনাস্থলে উসকানি বা সহযোগিতা করেছে—নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রত্যেকের ভূমিকা চিহ্নিত করা প্রয়োজন। ‘২৭১ আসামি’—কিন্তু তদন্ত হতে হবে নির্ভুল একটি মামলায় বিপুলসংখ্যক আসামি থাকলেই বিচার নিশ্চিত হয় না। বরং তদন্তের মান, ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, ঘটনাস্থলের আলামত এবং অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত জড়িতদের শনাক্ত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ আইনের শাসনের অর্থ শুধু অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর হওয়া নয়; নিরপরাধের অধিকার রক্ষা করাও আইনের শাসনেরই অংশ। পুলিশের ওপর হামলা কেন ভয়ংকর বার্তা? পুলিশ রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি মনে করে যে তারা সংঘবদ্ধ হয়ে পুলিশের অভিযান ঠেকাতে পারবে, পুলিশকে আক্রমণ করতে পারবে কিংবা সরকারি সম্পদ ভাঙচুর করেও প্রভাব খাটাতে পারবে—তাহলে সেটি সমাজে ভয়ংকর বার্তা তৈরি করে। আজ পুলিশের ওপর হামলা, কাল হতে পারে সাধারণ নাগরিকের ওপর। আজ সরকারি গাড়ি ভাঙচুর, কাল হতে পারে সাধারণ মানুষের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিংবা বসতবাড়িতে হামলা। আজ আইন প্রয়োগে বাধা, কাল হয়তো কেউ থানায় অভিযোগ করতেও ভয় পাবে। সুতরাং খুলশীর ঘটনাকে শুধু একটি স্থানীয় সংঘর্ষ হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে জড়িত বৃহত্তর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অপরাধীচক্রের প্রভাব এবং পুলিশের কার্যকর সক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্ন একজন সাধারণ নাগরিক যখন বিপদে পড়েন, তখন তার প্রথম আশ্রয় পুলিশ। চুরি হলে পুলিশ, ছিনতাই হলে পুলিশ, হামলা হলে পুলিশ, সন্ত্রাসের শিকার হলে পুলিশ—শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের আইনগত সহায়তার জন্য মানুষ পুলিশের কাছেই যায়। কিন্তু সেই পুলিশ যদি অপরাধীচক্রের হাতে আক্রান্ত হয় এবং অপরাধীরা প্রকাশ্যে আইন প্রয়োগে বাধা দেওয়ার সাহস পায়, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই নগরবাসীর প্রশ্ন অত্যন্ত যৌক্তিক— “পুলিশের ওপর হামলার বিচার যদি দ্রুত ও দৃশ্যমানভাবে না হয়, তাহলে একজন সাধারণ নাগরিক কীভাবে বিশ্বাস করবে যে রাষ্ট্র তাকে নিরাপত্তা দিতে সক্ষম?” অপরাধী যত শক্তিশালী হোক, আইনের ঊর্ধ্বে নয় বাংলাদেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইনের মূলনীতি হলো—আইনের চোখে সবাই সমান। কেউ রাজনৈতিক পরিচয়ে, অর্থের প্রভাবে, সামাজিক অবস্থানে কিংবা স্থানীয় আধিপত্যের কারণে আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না।
তবে একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তিকে কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করাও সমীচীন নয়। তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই অপরাধের দায় নির্ধারিত হবে। এই ভারসাম্যই একটি গণতান্ত্রিক ও আইনের শাসনভিত্তিক রাষ্ট্রের শক্তি। সরকারের কাছে নগরবাসীর প্রত্যাশা খুলশীর ঘটনায় নগরবাসীর প্রত্যাশা এখন কয়েকটি বিষয়ে— প্রথমত, পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পুলিশের সরকারি গাড়ি ভাঙচুর ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতির জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
তৃতীয়ত, অভিযানে আহত ওসি আবদুর রহিমসহ পুলিশ সদস্যদের যথাযথ চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, ভবিষ্যতে কোনো অপরাধীচক্র যেন পুলিশের বৈধ অভিযান প্রতিহত করার সাহস না পায়, সে বিষয়ে কঠোর বার্তা দিতে হবে।
পঞ্চমত, একই সঙ্গে অভিযানের নামে কোনো নিরপরাধ নাগরিক যেন হয়রানি বা অন্যায়ের শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
শেষ কথা—পুলিশের মনোবল ভাঙলে ভাঙবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা
অপরাধ দমনে পুলিশকে দায়িত্ব পালন করতেই হবে। আর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একজন পুলিশ কর্মকর্তা যদি হামলার শিকার হন, তাহলে তাকে একা ফেলে রাখলে চলবে না। ওসি আবদুর রহিমের মতো মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা যখন অপরাধীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন, তখন তাদের আইনসম্মত দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক সহায়তা থাকা জরুরি। কারণ পুলিশের মনোবল শুধু পুলিশের বিষয় নয়—এটি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। খুলশীর ঘটনা তাই আবারও মনে করিয়ে দিল— আইনের হাত দুর্বল হলে অপরাধীর সাহস বাড়ে। আর অপরাধীর সাহস বাড়লে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কমে। তাই এখন সময় এসেছে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়ার— “পুলিশের ওপর হামলা হোক কিংবা সাধারণ মানুষের ওপর—অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক, আইনের মুখোমুখি তাকে হতেই হবে।” আর সেই আইনের প্রয়োগ হতে হবে দ্রুত, নিরপেক্ষ, প্রমাণভিত্তিক ও দৃশ্যমান। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু খুলশীর নয়—
“পুলিশ যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়