খরচের হিসাব বাড়ছে, ছোট হচ্ছে বাজারের তালিকা

By admin
5 Min Read

পরিসংখ্যানের অঙ্কে দেশের মূল্যস্ফীতি কমেছে; কিন্তু বাজারে নেই স্বস্তি। বরং বছরের ব্যবধানে প্রয়োজনীয় অনেক নিত্যপণ্যের পেছনে বেড়েছে ভোক্তার খরচ। ফলে বাজার খরচের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষ। সাশ্রয়ী হতে পরিবারের খাবারের তালিকা দিন দিন ছোট হচ্ছে তাদের। বাদ পড়ছে মাছ, মাংস, ডিম, দুধের মতো পুষ্টিকর খাবার। এর মধ্যে নতুন করে বাড়ছে আটা, ভোজ্যতেল, চিনি ও দুধের দামও, যা তাদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। গতকাল ছুটির দিনে সাপ্তাহিক বাজার করতে রাজধানীর মিরপুর-১২ এলাকার আলুব্দী বাজারে এসেছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী মো. এনামুল হক। তিনি জানান, অনেক কাটছাঁট করে বাজারের তালিকা তৈরি করেও পণ্যের দাম মেলাতে পারছেন না। এনামুল বলেন, ‘বেশি দামের কারণে গুঁড়া দুধ, তরল দুধ, গরুর মাংস, মাছ ও তুলনামূলক দামি সবজি তালিকা থেকে বাদ দিয়েছি। পেঁয়াজ, চিনি, মসলা, আটা, মুরগি ও ডিমের পরিমাণও কমিয়েছেন। তবে সয়াবিন তেল ও চিংড়ি প্রয়োজন হওয়ায় বাদ দিতে পারিনি। এরপরও বাজারে এসে হিসাব মেলেনি। তাই বাধ্য হয়ে তালিকা থেকে আরও কয়েকটি পণ্য বাদ দিতে হয়েছে।’ আক্ষেপ করে এনামুল জানান, বছর যায়, পণ্যের দাম বাড়ে। বাজারে অনেক কাটছাঁট করেও খরচ সামলাতে পারছেন না। আর কত পণ্য বাদ দেবেন? বাড়িতে ছোট দুই সন্তান থাকলেও তাদের জন্য আলাদা করে দুধ, ডিম, ভালো মাছ-মাংস কেনার সামর্থ্য হচ্ছে না।এনামুলের চেয়ে আরও চাপে আছেন কদমতলী এলাকার অটোরিকশাচালক মো. হাবিবুর রহমান। আয়ের সামান্য টাকায় মাছ-মাংস দূরে থাক দরকারি পণ্যগুলো কিনে খেতেও বেগ পেতে হচ্ছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘খোলা সয়াবিনের দাম আরও বাড়তাছে। ডিমও এখন কেনা কমাইছি। সবজির কিনতেই পকেট খালি। বাজারে কয়েক আইটেম কিনতেই ৫০০ টাকা নাই হইয়া যায়। ক্যামনে কী চলুম।’ নিত্যপণ্যের দামে চিড়েচ্যাপ্টা হাবিবুর ও এনামুলের মতো চাপে আছেন অসংখ্য সীমিত ও নিম্ন আয়ের মানুষ। অথচ, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাব বলছে, মূল্যস্ফীতির হার নিম্নমুখী রয়েছে। গত জুলাই মাসে দেশে মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে। জুনে যা ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ ছিল। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতিও ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ থেকে কমে কমে হয়েছে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ।মূল্যস্ফীতির এ পরিসংখ্যানে স্বস্তির বার্তা থাকলেও বাস্তবে খাবারের পেছনে ভোক্তাদের খরচের চাপ কমেনি। দ্রব্যমূল্যের খরচ সামাল দিতে খেই হারিয়ে ফেলছে বেশিরভাগ মানুষ। চাল, ডাল, পেঁয়াজ ও আদাসহ কয়েক প্রকার মসলা ছাড়া বছরের ব্যবধানে সব পণ্যের দামই বেড়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৬০ শতাংশের বেশি পরিবার আয়ের অন্তত অর্ধেক খাবারের পেছনে ব্যয় করে। নিম্নআয়ের মানুষের ক্ষেত্রে খাবারের পেছনে ব্যয়ের চাপ আরও বেশি। খাদ্যের দাম বাড়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য মৌলিক চাহিদায় ব্যয় কমাতে হচ্ছে। বাজারে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ভোজ্যতেলের দাম। এক বছরে বোতলজাত সয়াবিন তেলের লিটার ১৮৮ থেকে বেড়ে ১৯৯ টাকা হয়েছে। খোলা সয়াবিন ১৬৫ থেকে ১৯২ টাকা এবং পাম তেল ১৫০ থেকে ১৬৫ টাকা হয়েছে। এ ছাড়া গরু ও মুরগির মাংস, ডিম, দুধ ও মাছের দামও বেড়েছে। পাঙ্গাশ ও তেলাপিয়ার কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ছোট চিংড়ির দাম গত বছরের ৬০০ টাকা থেকে বেড়ে এখন ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা হয়েছে। সম্প্রতি আটা ও চিনির দামও কেজিতে ৫ টাকা করে বেড়েছে। টিসিবির তথ্যেও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার চিত্র উঠে এসেছে। এক বছরে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ৫ দশমিক ২৯ শতাংশ, খোলা সয়াবিন ১২ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং পাম তেল ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে গরুর মাংস, ব্রয়লার মুরগি, ডিম ও গুঁড়া দুধের দামও বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল্যস্ফীতি কমলেও বাজারে স্বস্তি ফিরছে না। বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, সরবরাহ ব্যবস্থার নানা স্তরের মধ্যস্বত্বভোগী ও দুর্বল নজরদারির কারণে ভোক্তাদের ওপর চাপ থাকছে। কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, চালসহ শস্যের দাম স্থিতিশীল থাকায় খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার কমেছে। তবে স্বস্তির জন্য খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও কমিয়ে ২ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে আনতে হবে। উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করার ওপরও জোর দেন তিনি। বাজার বিশ্লেষক গোলাম রহমান বলেন, পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি আমদানিনির্ভর পণ্যে প্রতিযোগিতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে চাঁদাবাজি ও অতিরিক্ত পরিবহন খরচ বন্ধ করা জরুরি। ক্যাবের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, মূল্যস্ফীতি কমার পরিসংখ্যানের সঙ্গে বাজারের বাস্তব চিত্র মিলছে না। প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল না হলে কাগজে-কলমে মূল্যস্ফীতি কমলেও মানুষের বাজারের তালিকা আরও ছোট হবে, আর খরচের হিসাব বড় হতে থাকবে।

Share This Article
Leave a Comment