
টানা প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার পানি নেমে গেলেও কক্সবাজারের চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতচিহ্ন। সবচেয়ে বড় আঘাত লেগেছে স্থানীয় কৃষি খাতে। দুই উপজেলার মাঠজুড়ে এখন পচা কাদাপানির গন্ধ, মরে পড়ে আছে বিভিন্ন রকমের সবজি গাছ। ঢেঁড়শ, করলা, মিষ্টি কুমড়া, ঝিঙে, কচু, মরিচ, বেগুন, শসা, বরবটিসহ সব ধরনের ক্ষেত এখন ধ্বংসস্তূপ। কোথাও কেবল বাঁশের খালি মাচা দাঁড়িয়ে আছে, আবার কোথাও কাদায় ঢেকে আছে আবাদি জমি। অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল হারিয়ে অসংখ্য কৃষক এখন কেবলই আর্তনাদ করছেন। চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, দুই উপজেলায় ১৩ হাজার ৮৫২ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ১ হাজার ৬৬১ হেক্টর কৃষি জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমনের বীজতলা, আউশ ধান এবং গ্রীষ্মকালীন শাক-সবজির আবাদ। বন্যার পানি নেমে গেলেও অনেক জমি এখনো কাদায় ঢেকে থাকায় নতুন করে আবাদও শুরু করতে পারছেন না কৃষকরা। চকরিয়া উপজেলার বরইতলী, কৈয়াবিল, কাকারা, সুরজপুর-মানিকপু, ফাঁসিয়াখালী, চিরিংগা ও মাতামুহুরী উপজেলার সাহারবিল, পূর্ব বড়ভেওলা, বিএমচর, কোনাখালী ইউনিয়নের কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অসংখ্য কৃষকের জন্য চাষাবাদই ছিল সংসারের একমাত্র আয়ের উৎস। বুধবার সরেজমিনে দেখা যায়, মাঠজুড়ে পচা কাদা-পানির দুর্গন্ধ। অধিকাংশ সবজি ক্ষেতের গাছ মরে গেছে। কোথাও শুধু বাঁশের খালি মাচা দাঁড়িয়ে আছে। মাতামুহুরী উপজেলার বিএমচর ইউনিয়নে হাঁসমহাল এলাকায় ৫০ শতক জমিতে করলা, বেগুন ও শসা চাষ করেছিলেন কৃষক শামসুল আলম। তিনি বলেন, প্রায় ৫৫ হাজার টাকা ব্যয়ে চাষ করেছিলেন। ফলন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বন্যার পানিতে সব গাছ নষ্ট হয়ে গেছে। প্রতি সপ্তাহে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকার সবজি বিক্রি করে সংসার চলত। এখন সেই আয়ের সেই পথটাও নষ্ট হয়ে গেল। পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়নের সিকদার পাড়া এলাকার কৃষক ফরহাদুল ইসলাম বলেন, পানির নিচে সব শেষ। চোখের সামনে বীজতলা তলিয়ে পচে গেছে। পরিবার নিয়ে কি খাব তা ভেবে কূল পাচ্ছি না। সরকার যদি দ্রুত আমাদের মতো প্রান্তিক কৃষকদের বীজ, সার ও আর্থিক সহায়তা না দেয় তবে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে। চকরিয়া উপজেলার কৈয়ারবিল ইউনিয়নের খিলছাদক এলাকার কৃষক আলী আহমদ জানান, দুই একর জমিতে কচু, মরিচ, ঢেঁড়স ও বেগুনের আবাদ করেছিলেন। বেগুনের ফলন শুরু হওয়ার পরই বন্যার পানিতে সব শেষ হয়ে যায়। এখন জমিতে মৃত গাছ ছাড়া কিছুই নেই। এতে অন্তত ২ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলেও জানান তিনি। বরইতলী ইউনিয়নের গোবিন্দপুর এলাকার কৃষক মোরশেদ আলম বলেন, মা-বাবা, স্ত্রী ও চার সন্তান নিয়ে তার সংসার। জীবিকার একমাত্র অবলম্বন কৃষিকাজ। এবারে তিন বিঘা জমিতে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করেছিলেন। বন্যার আগে কিছু সবজি বিক্রি করতে পারলেও বন্যায় সব ভেসে গেছে। জমির ওপর প্রায় এক ফুট পলি জমে থাকায় নতুন করে আবাদ করাও সম্ভব হচ্ছে না। পরিবার চালাতে এখন ধার নেওয়া ছাড়া কোনো রাস্তা নেই। চকরিয়া উপজেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন পুতু বলেন, কৃষক আজ দিশেহারা। আমনের বীজতলা, আউশের ধান, শাকসবজি ও মৎস্য ঘের তলিয়ে কৃষক আজ অসহায় অবস্থায়। সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি, অবিলম্বে মাঠপর্যায়ে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে বিনামূল্যে বীজ, সার ও পর্যাপ্ত আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করা হোক। অন্যথায় অচিরেই চকরিয়াসহ পুরো অঞ্চলে খাদ্য সংকট দেখা দেবে। চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহনাজ ফেরদৌসী কালবেলাকে বলেন, দুই উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব শেষে পুনর্বাসন ও কৃষি পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হবে। আপাতত কিছু কৃষি প্রণোদনা দেওয়া হবে।