
দূরের দেশ কাছের মানুষঃ
“মরুর রাজকন্যা মাহিরা মরুর বুকে এক অলৌকিক বিকেলের শুরু-মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যেগুলোকে শুধু ঘটনা বললে ভুল হবে। সেগুলো যেন জীবনের দীর্ঘ পথচলার মাঝে হঠাৎ জ্বলে ওঠা কোনো নক্ষত্র। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও সেই মুহূর্তের আলো নিভে যায় না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। দুবাই সফরের বহু স্মৃতির মধ্যে এমনই এক অধ্যায়ের নাম মাহিরা। সেদিন আমি জানতাম না, মরুর দেশে একটি বিকেল আমার হৃদয়ের ইতিহাসে এমনভাবে জায়গা করে নেবে যে, বহু বছর পরেও তার কথা লিখতে বসলে কলম থেমে থাকবে না। দুবাইয়ের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা দূরে, আরব আমিরাতের অন্যতম সুন্দর প্রদেশ রাস আল খাইমাহ। পাহাড়, মরুভূমি, সমুদ্র আর ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। আধুনিকতার ঝলকানির মাঝেও সেখানে টিকে আছে আরব সভ্যতার রাজকীয় গাম্ভীর্য। একজন আরব শুভাকাঙ্ক্ষীর আন্তরিক আমন্ত্রণে সেদিন সেখানে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। গাড়ি যখন মরুভূমির দীর্ঘ রাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছিল, দুই পাশে সোনালি বালুর ঢেউ সূর্যের আলোয় যেন গলিত সোনার মতো ঝলমল করছিল। দূরে উঁচু খেজুরগাছ, কোথাও কোথাও পাহাড়ের রেখা, আর নীল আকাশের নিচে এক গভীর নীরবতা। সেই নীরবতার মধ্যেই মনে হচ্ছিল, আমি যেন ইতিহাসের কোনো দরজা অতিক্রম করে আরব্য রজনীর এক বিস্ময়কর জগতে প্রবেশ করছি। গন্তব্যে পৌঁছানোর পর বিশাল লোহার নকশা করা দরজা ধীরে ধীরে খুলে গেল। সামনে রাজকীয় স্থাপত্যে নির্মিত এক প্রাসাদ। সাদা মার্বেলের দেয়াল, সোনালি অলংকরণ, সুদৃশ্য খিলান, আর চারদিকে ফুলে ভরা বাগান। ফোয়ারার পানির শব্দ যেন সুর তুলে অতিথিদের স্বাগত জানাচ্ছিল। আমি বিস্ময়ে চারদিকে তাকিয়ে ছিলাম। ঠিক তখনই তিনি এলেন। প্রথম দর্শনে মনে হলো, কোনো চিত্রশিল্পী যেন শত রঙ মিশিয়ে এক অপূর্ব প্রতিকৃতি এঁকেছেন। তার পরনে ঐতিহ্যবাহী সোনালি আরবি পোশাক। মাথায় সূক্ষ্ম কারুকাজ করা ওড়না, কপালে নরম আলো, গলায় প্রাচীন অলংকার, চোখে অদ্ভুত প্রশান্তি। তার হাসি ছিল এমন, যেন মরুভূমির দীর্ঘ তৃষ্ণার পর প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা। তিনি এগিয়ে এসে ইংরেজিতে বললেন, “Welcome. We are honoured to have you here.” কণ্ঠস্বর শুনেই বুঝলাম, তিনি শুধু সুন্দরী নন; তার ব্যক্তিত্বেও আছে এক অসাধারণ মাধুর্য। তার নাম—মাহিরা। পরিচয়ের প্রথম কয়েক মিনিটেই বুঝলাম, ইংরেজি ভাষায় তিনি অত্যন্ত সাবলীল। কথাবার্তায় শিক্ষিত, সংস্কৃতিমনা এবং আত্মবিশ্বাসী। তিনি জানালেন, আরবি গজল, ফারসি সঙ্গীত এবং ঐতিহ্যবাহী নৃত্য তার নেশা। রাজপরিবারের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তিনি নিয়মিত অংশ নেন। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। কিছু মানুষের সৌন্দর্য চোখে ধরা পড়ে, আবার কিছু মানুষের সৌন্দর্য ধরা পড়ে তাদের কথায়। মাহিরার মধ্যে এই দুই সৌন্দর্যের বিরল মিলন ছিল। প্রাসাদের বিশাল বাগানে আমরা হাঁটছিলাম। বাতাসে গোলাপের সুগন্ধ। খেজুরগাছের পাতায় হালকা শব্দ। সাদা মার্বেলের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, সময় যেন ধীরে ধীরে থেমে যাচ্ছে। তিনি জানতে চাইলেন বাংলাদেশের কথা। আমি বললাম পদ্মা, মেঘনা, যমুনার কথা। বললাম রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দের কথা। বললাম চট্টগ্রামের পাহাড়, কর্ণফুলী নদী, মানুষের আতিথেয়তা আর সংগ্রামের ইতিহাস। তিনি গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। মাঝেমধ্যে প্রশ্ন করছিলেন। তার চোখে আমি কৌতূহল দেখেছি, অহংকার নয়। একসময় তিনি বললেন, “আমি একদিন বাংলাদেশ দেখতে চাই।” আমি মৃদু হেসে বললাম, “বাংলাদেশের মানুষ অতিথিকে হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করে। আপনি এলে আপনাকে আমাদের দেশের সৌন্দর্য দেখাতে চাই।” তিনি হাসলেন। সেই হাসি ছিল আন্তরিকতার ভাষা। হঠাৎ উপলব্ধি করলাম, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো ধনসম্পদ নয়, রাজকীয় বংশও নয়—বরং মানুষের হৃদয়। সন্ধ্যা নামছিল। আকাশে প্রথম তারা উঠেছে। প্রাসাদের আলো একে একে জ্বলে উঠছে। মাহিরা বললেন, “আজ রাতে আমাদের একটি সাংস্কৃতিক আসর আছে। আপনি থাকবেন।” তার কণ্ঠে অনুরোধ ছিল, আদেশ নয়। আমি সম্মতি দিলাম। সেই মুহূর্তে জানতাম না, সেই রাত আমার স্মৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে থাকবে। কিছু পরিচয় সময় দিয়ে মাপা যায় না। কিছু মানুষের সঙ্গে প্রথম দেখাতেই মনে হয়, যেন বহু জন্মের পরিচয়। মাহিরার সঙ্গে আমার অনুভূতিটা ছিল ঠিক তেমন। সেদিন মরুর বাতাসে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল— “পৃথিবীর সব সুন্দর দৃশ্য চোখে দেখা যায় না; কিছু সৌন্দর্য শুধু হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হয়।” আর সেই হৃদয়ের পাতায় মাহিরা নামের এক মানুষের জন্য নীরবে লেখা শুরু হয়েছিল এক দীর্ঘ বন্ধুত্বের গল্প—যার শেষ কোথায়, তা তখনও আমি জানতাম না। রাজপ্রাসাদের সুর, মরুর চাঁদ আর এক অনির্বচনীয় বন্ধুত্ব সন্ধ্যা তখন ধীরে ধীরে মরুভূমির বুক জুড়ে নেমে এসেছে। পশ্চিম আকাশের রক্তিম আলো মুছে গিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে নীলাভ অন্ধকার। কিন্তু রাজপ্রাসাদের ভেতরে যেন আরেকটি পৃথিবী। শত শত ঝাড়বাতির আলোয় মার্বেলের প্রাসাদটি মনে হচ্ছিল আকাশ থেকে নেমে আসা কোনো আলোকময় রাজ্য। প্রাসাদের প্রধান প্রাঙ্গণে একে একে অতিথিরা আসছিলেন। আরবের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে অভিজাত ব্যক্তিরা, রাজপরিবারের সদস্যরা, শিল্পী, সংস্কৃতিপ্রেমী এবং সম্মানিত অতিথিদের পদচারণায় পরিবেশটি আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল। কোথাও কোনো কৃত্রিমতা ছিল না; ছিল আভিজাত্যের সঙ্গে মিশে থাকা সৌজন্যের এক নিখুঁত রূপ। মাহিরা তখনও আসেননি। আমি চারদিকে তাকিয়ে প্রাসাদের দেয়ালে ঝুলে থাকা ক্যালিগ্রাফি, পুরোনো আরবি শিল্পকর্ম এবং সুদৃশ্য কারুকাজ দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল, প্রতিটি দেয়াল যেন শত বছরের ইতিহাস নিজের বুকে ধারণ করে আছে। হঠাৎ চারদিকে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। আমি তাকিয়ে দেখলাম—ধীর পায়ে এগিয়ে আসছেন মাহিরা। সোনালি আলোর নিচে তার উপস্থিতি ছিল অপার্থিব। ঐতিহ্যবাহী আরবি পোশাকের সঙ্গে প্রাচীন অলংকার, কপালে সূক্ষ্ম নকশার আবরণ, গলায় রত্নখচিত হার, আর মুখে সেই পরিচিত মৃদু হাসি। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, সৌন্দর্য যদি কোনো ভাষা হতো, তবে তার নামই হতো মাহিরা। তিনি মঞ্চে উঠে দাঁড়ালেন। কয়েক মুহূর্ত পর শুরু হলো তার পরিবেশনা। প্রথমে তিনি আরবি ভাষায় একটি গজল গাইলেন। আমি প্রতিটি শব্দের অর্থ বুঝিনি, কিন্তু অনুভব করেছি প্রতিটি সুরের কম্পন। সেই কণ্ঠে ছিল মরুর গভীর নিঃসঙ্গতা, আবার ছিল ভালোবাসার কোমল আহ্বান। মনে হচ্ছিল, দূর মরুভূমির বালুকাবেলায় বহু শতাব্দী আগে কোনো বেদুইন প্রেমিক যে গান গেয়েছিল, সেই সুরই যেন আজ আবার ফিরে এসেছে। এরপর তিনি ফারসি ভাষায় একটি সঙ্গীত পরিবেশন করলেন। সুরের ওঠানামায় কখনও বিষাদের ছায়া, কখনও আনন্দের উচ্ছ্বাস। উপস্থিত অতিথিরা মুগ্ধ হয়ে শুনছিলেন। আমি তখন শিল্পীকে নয়, একজন মানুষকে দেখছিলাম—যিনি তার শিল্প দিয়ে হৃদয়ের ভাষা প্রকাশ করতে জানেন। অনুষ্ঠান শেষে তিনি সবার সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করলেন। এরপর আমার দিকে এগিয়ে এসে বললেন, — “আপনি নিশ্চয়ই ক্লান্ত? চলুন, একটু বাগানে যাই।” আমরা আবার সেই বিশাল বাগানের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। রাতের বাতাসে গোলাপের সুগন্ধ আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। দূরে ফোয়ারার জল চিকচিক করছে। আকাশজুড়ে অসংখ্য তারা। মরুর রাতের সৌন্দর্য সত্যিই অনন্য। মাহিরা বললেন, “জানেন, ছোটবেলা থেকেই আমি ভ্রমণ ভালোবাসি। নতুন মানুষ, নতুন সংস্কৃতি, নতুন ভাষা—এসব আমাকে খুব টানে।” আমি বললাম, “ভ্রমণ মানুষকে শুধু নতুন দেশ দেখায় না, নতুন মানুষও চিনতে শেখায়।” তিনি মৃদু হেসে সম্মতি জানালেন। কথা বলতে বলতে তিনি জানতে চাইলেন আমার লেখালেখির কথা, সাংবাদিকতা, গবেষণা এবং টেলিভিশনে কাজের অভিজ্ঞতা। আমি বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং মানুষের সংগ্রামের নানা গল্প বললাম। তিনি মন দিয়ে শুনলেন। মাঝে মাঝে এমন প্রশ্ন করছিলেন, যা বোঝাচ্ছিল তিনি শুধু ভদ্রতার খাতিরে নয়, সত্যিই জানতে আগ্রহী। একসময় তিনি বললেন, “একদিন তুরস্কে এলে আমি আপনাকে আমার প্রিয় শহরগুলো ঘুরিয়ে দেখাতে চাই। শুধু পর্যটকদের দেখা জায়গা নয়, আমাদের হৃদয়ের কাছের জায়গাগুলোও।” সেই আমন্ত্রণে কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। ছিল বন্ধুত্বের সহজ, উষ্ণ স্পর্শ। আমি হেসে বললাম, “তাহলে আপনাকেও একদিন বাংলাদেশে আসতে হবে। পাহাড়, নদী, সমুদ্র আর মানুষের ভালোবাসা—সব দেখাব।” তিনি বললেন, “ইনশাআল্লাহ, একদিন নিশ্চয়ই।” রাত আরও গভীর হচ্ছিল। বিদায়ের সময় এগিয়ে এলো। প্রাসাদের প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, “দূরত্ব বন্ধুত্বকে ছোট করে না। সত্যিকারের বন্ধুত্ব হৃদয়ে থাকে।” আমি উত্তর দিলাম, “কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয় কয়েক ঘণ্টার, কিন্তু মনে হয় যেন বহু বছরের।” তিনি শুধু হাসলেন। সেই হাসির মধ্যে ছিল আন্তরিকতা, সম্মান এবং এক নিঃশব্দ শুভকামনা। গাড়ি যখন প্রাসাদ ছেড়ে ধীরে ধীরে দূরে চলে যাচ্ছিল, আমি জানালার কাচ দিয়ে শেষবারের মতো আলোকিত প্রাসাদের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মনে হচ্ছিল, পিছনে ফেলে যাচ্ছি শুধু একটি রাজপ্রাসাদ নয়—একটি সুন্দর স্মৃতি, এক মানবিক সম্পর্ক, এক শিল্পীসত্তা এবং এক অনন্য বন্ধুত্ব। আজও যখন মরুভূমির কথা মনে পড়ে, তখন শুধু বালুর ঢেউ নয়, মনে পড়ে সেই সন্ধ্যা, সেই বাগান, সেই সুরেলা কণ্ঠ, সেই আন্তরিক আলাপ। জীবনের পথে অসংখ্য মানুষের সঙ্গে দেখা হয়। অধিকাংশই সময়ের স্রোতে হারিয়ে যায়। কিন্তু কিছু মানুষ থেকে যান স্মৃতির স্থায়ী ঠিকানায়। তারা দূরে থাকেন, তবু হৃদয়ের খুব কাছে। মাহিরা আমার কাছে তেমনই এক মানুষ—যার পরিচয় সময়ে সংক্ষিপ্ত হলেও অনুভূতিতে দীর্ঘ; যার সৌন্দর্যের চেয়ে বড় ছিল তার বিনয়, যার রাজকীয় পরিচয়ের চেয়ে মূল্যবান ছিল তার মানবিকতা। হয়তো আবার কোনোদিন দেখা হবে, হয়তো হবে না। কিন্তু কিছু গল্পের সৌন্দর্য মিলনে নয়, স্মৃতিতে। আর সেই স্মৃতির পাতায় রাস আল খাইমাহর সেই সন্ধ্যা আজও অমলিন হয়ে আছে—একটি নীরব, নির্মল এবং সম্মানপূর্ণ বন্ধুত্বের প্রতীক হয়ে।