‘মহান’-এর মিথ ভেঙে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করানো এক অসাধারণ কবিতা কবি অলিন্দ যাযাবর (রাজিব দাশ): একজন পুলিশ কর্মকর্তা, একজন চিন্তাশীল কবি, একজন সাহসী বিবেকের কণ্ঠস্বর-

By admin
6 Min Read

 -মো.কামাল উদ্দিনঃ  মানুষের ইতিহাসে ‘মহান’ এবং ‘শ্রেষ্ঠ’ শব্দ দুটি যতটা সম্মান ও শ্রদ্ধার প্রতীক, ততটাই কখনও কখনও অন্ধ বিশ্বাস, ব্যক্তিপূজা ও আবেগেরও প্রতিফলন। যুগে যুগে আমরা অনেককে মহান বলে অভিহিত করেছি, অনেকের জন্য উচ্ছ্বাসে কণ্ঠ মিলিয়েছি, আবার সময়ের নির্মম বাস্তবতায় সেই বিশ্বাসের ভিত্তিও নড়ে যেতে দেখেছি। তাই মহানত্ব কোনো চিরস্থায়ী উপাধি নয়; এটি সময়, কর্ম, সততা এবং মানবিকতার নিরন্তর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার বিষয়। এই গভীর জীবনবোধ ও দার্শনিক উপলব্ধিকেই শক্তিশালী কাব্যভাষায় প্রকাশ করেছেন কবি অলিন্দ যাযাবর (রাজিব দাশ) তাঁর ‘মহান কিংবা শ্রেষ্ঠ বলে কিছু নেই’ কবিতায়। কবিতাটি প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানায়, অন্ধ অনুসরণের বিপরীতে বিবেকের আলো জ্বালায় এবং পাঠককে শেখায়—মানুষকে অলৌকিক উচ্চতায় নয়, তার কর্ম, চরিত্র ও মানবিকতার আলোয় মূল্যায়ন করতে। একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা হয়েও রাজিব দাশ যে সংবেদনশীলতা, দার্শনিক গভীরতা এবং সত্য উচ্চারণের সাহস নিয়ে এই কবিতা রচনা করেছেন, তা নিঃসন্দেহে সমকালীন বাংলা কবিতায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন। –মহান কিংবা শ্রেষ্ঠ বলে কিছু নেই/অলিন্দ যাযাবর।
মহান কিংবা শ্রেষ্ঠ বলে যাদের জন্য এক সময় চিৎকার করে গলা ফাটিয়েছি তারা বা তাদের কেউ মহান ছিলেন না। পৃথিবীতে মহান বলে কিছু নেই  নেই মহামানব মহান ধর্ম আপেক্ষিকতার মগডালে বসে হেসে চলেছে নানান রকমের সংজ্ঞা অপ-ধর্ম অধর্ম। পি এইচ মানে এক ফোঁটা জল পানযোগ্য করতে না পেরেও নিজের বিশালতা প্রমাণিত মূর্খ সমুদ্রকে তিরস্কার করেছি। বিনম্র বদনে সমুদ্র বলেছেন বৎস! আমার সৃষ্টিই জগতের কল্যাণে যদি আমার না থাকত নোনা জল কান্না সমুদ্র নামে কেউ চিনত না। যখনই যাকে যা কিছু ভেবেছি দেখেছি পেয়েছি সবই ছিল তার বৈপরীত্য; সবারই মূখ্য ভূমিকা উদ্দেশ্য ছিল বিশালতার ঔদ্ধত্যে ভেসে থাকা  সমুদ্র জলে পি এইচ মান পরীক্ষায় ন্যূনতম জিপিএ প্রাপ্ত হুজুগে শ্রেষ্ঠত্ব মূল্যায়নের মতো। পৃথিবী সংসারে মহান কিংবা শ্রেষ্ঠত্ব বলে কারোর কিছু নেই। — ০১ জুলাই ২০২৬ খ্রিঃ সাহিত্য কখনো ক্ষমতার প্রশস্তিগান নয়, কখনো ব্যক্তিপূজার মঞ্চও নয়। প্রকৃত সাহিত্য মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তোলে, প্রশ্ন করতে শেখায়, প্রচলিত বিশ্বাসকে নতুন করে বিচার করতে বাধ্য করে। সেই অর্থে কবি অলিন্দ যাযাবর (রাজিব দাশ)-এর রচিত ‘মহান কিংবা শ্রেষ্ঠ বলে কিছু নেই’ কবিতাটি নিঃসন্দেহে সমকালীন বাংলা কবিতায় একটি ব্যতিক্রমী সংযোজন। এটি কেবল একটি কবিতা নয়; এটি আত্মসমালোচনার ভাষা, বোধের ভাষা এবং অন্ধ অনুসরণের বিরুদ্ধে এক সাহসী প্রতিবাদ। আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে মানুষ খুব সহজেই কাউকে ‘মহান’, ‘শ্রেষ্ঠ’ কিংবা ‘মহামানব’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে ফেলে। আবেগ, দলীয় আনুগত্য কিংবা ব্যক্তিগত মোহের কারণে অনেক সময় আমরা মানুষের সীমাবদ্ধতাকে ভুলে যাই। কিন্তু সময়ই শেষ পর্যন্ত প্রকৃত বিচারক। সময়ের নিরীক্ষায় অনেক মুখোশ খুলে যায়, অনেক অলংকার ম্লান হয়ে যায়। কবি রাজিব দাশ তাঁর কবিতায় সেই কঠিন সত্যটিই অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে উচ্চারণ করেছেন। এই কবিতার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর নির্ভীকতা। কবি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে আক্রমণ করেননি; বরং তিনি মানুষের মানসিক প্রবণতাকেই প্রশ্ন করেছেন। কেন আমরা অন্ধভাবে কাউকে পূজা করি? কেন যুক্তির পরিবর্তে আবেগকে বড় করে দেখি? কেন একজন মানুষকে এমন উচ্চতায় বসিয়ে দিই, যেখান থেকে তাঁর পতন আমাদের নিজেদেরই হতাশ করে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই কবিতাটি পাঠককে বারবার ভাবতে বাধ্য করে। কবিতায় সমুদ্র, নোনা জল ও পিএইচ মানের যে রূপক ব্যবহার করা হয়েছে, তা নিছক কাব্যিক অলংকার নয়; বরং গভীর দর্শনের প্রতীক। বাহ্যিক পরিমাপ দিয়ে সব সত্য ধরা যায় না। সমুদ্রের নোনা জলই তার অস্তিত্বের বৈশিষ্ট্য। তেমনি মানুষও তার গুণ ও সীমাবদ্ধতা মিলিয়েই সম্পূর্ণ। এই উপলব্ধি কবিতাটিকে একটি দার্শনিক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। কবি অলিন্দ যাযাবরের ভাষা সহজ, কিন্তু ভাবের গভীরতা বিস্ময়কর। তাঁর কবিতায় শব্দের চাকচিক্যের চেয়ে চিন্তার দীপ্তি বেশি। তিনি পাঠকের অনুভূতিকে স্পর্শ করার পাশাপাশি বিবেককে আলোড়িত করেন। একজন সত্যিকারের কবির সবচেয়ে বড় পরিচয় এখানেই—তিনি কেবল আবেগ সৃষ্টি করেন না, চিন্তারও জন্ম দেন। রাজিব দাশের আরেকটি পরিচয় তাঁকে আরও অনন্য করে তুলেছে। তিনি একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কঠিন পেশায় থেকে প্রতিদিন তিনি মানুষের নানা চরিত্র, সমাজের বৈপরীত্য, অপরাধ, ন্যায়-অন্যায় এবং বাস্তব জীবনের অসংখ্য অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর কবিতাকে করেছে আরও বাস্তব, আরও গভীর এবং আরও মানবিক। ইউনিফর্মের কঠোরতার আড়ালে যে একজন সংবেদনশীল কবির হৃদয় বাস করে, তাঁর এই কবিতা তারই উজ্জ্বল প্রমাণ। আজকের সময়ে এমন লেখক ও কবির প্রয়োজন, যিনি জনপ্রিয় হওয়ার জন্য লেখেন না; সত্য বলার জন্য লেখেন। যিনি প্রশংসার প্রত্যাশায় কলম ধরেন না; বিবেকের তাগিদে লিখে যান। অলিন্দ যাযাবর সেই বিরল কণ্ঠগুলোর একজন, যিনি সাহস করে বলতে পারেন—শ্রেষ্ঠত্ব কোনো চিরস্থায়ী উপাধি নয়, মহানত্ব কোনো অলঙ্কার নয়; মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার সততা, মানবিকতা, বিনয় এবং কর্মে। এই কবিতা আমাদের শেখায়, মানুষকে দেবতার আসনে বসানোর আগে মানুষ হিসেবেই দেখা উচিত। কারণ দেবত্বের মোহ যত বাড়ে, ততই বিচারবোধ সংকুচিত হয়। সমাজ তখন যুক্তির পরিবর্তে আবেগের বন্দি হয়ে পড়ে। কবি সেই আবেগের শৃঙ্খল ভাঙার আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যে এমন কবিতার প্রয়োজন সবসময় ছিল, আজও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। কারণ সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায় কেবল প্রশংসার ভাষা নয়; সত্য উচ্চারণের সাহস। সেই সাহসী কণ্ঠস্বরের নাম আজ অলিন্দ যাযাবর (রাজিব দাশ)। তাঁর এই কবিতা দীর্ঘদিন পাঠকের মনে আলোচনার জন্ম দেবে, নতুন চিন্তার দুয়ার খুলে দেবে এবং মানুষকে আত্মসমালোচনার সাহস জোগাবে—এমন প্রত্যাশা করাই যায়। কবি রাজিব দাশের কলম আরও প্রখর হোক, তাঁর সাহিত্যসাধনা আরও সমৃদ্ধ হোক, তিনি বাংলা কবিতায় সত্য, যুক্তি ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হয়ে দীর্ঘদিন পথ দেখান—এই শুভকামনাই রইল।

Share This Article
Leave a Comment