“পুলিশ কমিশনারের হস্তক্ষেপে অবশেষে মামলা, তবুও অধরা প্রধান আসামি সন্ত্রাসী সুজন- ২১ দিন থানায় ঘুরেও মামলা হয়নি; ওপেন হাউস ডেতে নির্যাতিতা সুমি বেগমের কান্নার পর নড়ে প্রশাসন—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন

By admin
4 Min Read

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ  চট্টগ্রাম মহানগরের খুলশী থানাধীন টাইগারপাস রেলওয়ে কলোনিতে সংঘটিত হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, শারীরিক নির্যাতন ও শ্লীলতাহানির অভিযোগে দায়ের হওয়া একটি মামলা এখন জনমনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অভিযোগের গুরুত্বের চেয়েও বেশি আলোচনায় এসেছে—একজন নির্যাতিতা নারীকে কেন প্রায় ২১ দিন ধরে থানার দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হলো এবং কেন পুলিশ কমিশনারের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া মামলাটি রুজু হলো না। খুলশী থানার মামলা নং-২৮, তারিখ ৩০ জুন ২০২৬। মামলায় সুজনকে প্রধান অভিযুক্ত করে আটজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও ১৫ থেকে ২০ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি দণ্ডবিধির ৪২৭, ৩৭৯, ৩৫৪ ও ৫০৬ ধারায় রুজু করা হয়েছে।
মামলার বাদী সুমি বেগমের অভিযোগ, গত ৯ জুন ২০২৬ ভোররাতে পূর্বপরিকল্পিতভাবে একদল ব্যক্তি তাঁদের বাসায় প্রবেশ করে হামলা চালায়। তাঁর দাবি, হামলাকারীরা তাঁর স্বামী শাহিনুর আলম সোহেলকে খুঁজতে থাকে এবং পূর্বের একটি মামলা প্রত্যাহার করার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। স্বামীকে না পেয়ে তাঁকে ও তাঁর শাশুড়িকে মারধর করা হয়। এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে আসবাবপত্র ভাঙচুর, নগদ ৪৫ হাজার টাকা, একটি স্বর্ণের চেইন ও একটি সেলাই মেশিন নিয়ে যাওয়া হয়। একই সঙ্গে শ্লীলতাহানির অভিযোগও আনা হয়েছে। সুমি বেগমের ভাষ্য অনুযায়ী, গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে হয়। কিন্তু চিকিৎসা শেষে বিচার পাওয়ার আশায় থানায় গেলেও অভিযোগ গ্রহণে বিলম্ব করা হয়। তিনি দাবি করেন, একাধিকবার থানায় যাওয়ার পরও মামলা রেকর্ড করা হয়নি।
পরিস্থিতির মোড় ঘুরে গত ৩০ জুন অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ওপেন হাউস ডেতে। সেখানে পুলিশ কমিশনারের উপস্থিতিতে সুমি বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে তাঁর ওপর সংঘটিত ঘটনার বর্ণনা দেন এবং অভিযোগ করেন যে, দীর্ঘদিন ধরে থানায় ঘুরেও মামলা নিতে রাজি হয়নি পুলিশ। অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, বিষয়টি শুনে পুলিশ কমিশনার তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর ওই রাতেই খুলশী থানায় মামলাটি রুজু করা হয়। তবে এখানেই শেষ হয়নি বিতর্ক। বাদীপক্ষের অভিযোগ, মামলা রুজুর পরও প্রধান অভিযুক্ত সুজনকে এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি। তাদের দাবি, অভিযুক্ত প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন, অথচ দৃশ্যমান কোনো পুলিশি অভিযান বা গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়নি। এ কারণে ভুক্তভোগী পরিবার নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এই ঘটনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। যদি অভিযোগ গ্রহণের মতো পর্যাপ্ত উপাদান আগে থেকেই থেকে থাকে, তবে ২১ দিন মামলা রুজু করতে বিলম্ব হলো কেন? আবার যদি অভিযোগের ভিত্তি দুর্বল হতো, তাহলে পুলিশ কমিশনারের নির্দেশের পরই বা মামলা কেন গ্রহণ করা হলো? এসব প্রশ্নের জবাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রত্যাশা করছে সচেতন নাগরিক সমাজ। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হওয়া এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। তবে গুরুতর অভিযোগের মামলায় দ্রুত তদন্ত, প্রাসঙ্গিক সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব। এসব ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক বিলম্ব জনআস্থা ক্ষুণ্ন করতে পারে। বর্তমানে মামলাটি তদন্তাধীন। অভিযুক্তদের বক্তব্য এই প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্ত এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে। তবে নির্যাতিতা সুমি বেগমের একটাই প্রত্যাশা—প্রভাবমুক্ত, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন হোক এবং আইন তার নিজস্ব গতিতে সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হোক। চট্টগ্রামের সচেতন নাগরিকদেরও প্রত্যাশা, এই মামলাটি যেন কেবল একটি জিডি বা মামলার নথিতে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং স্বচ্ছ তদন্ত, আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচারের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিচারপ্রার্থী মানুষের শেষ আশ্রয় রাষ্ট্রের আইন—সেই আইনের প্রতি জনগণের আস্থা অটুট রাখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সকলের।

Share This Article
Leave a Comment