“কর্ণফুলী গ্যাসে সেবার নতুন প্রত্যাশা: গ্রাহক ভোগান্তি, প্রশাসনিক জটিলতা ও সমাধানের পথ খুঁজতে অংশীজনদের খোলামেলা মতবিনিময়-

By admin
7 Min Read
সেবা সহজীকরণ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ডিজিটাল রূপান্তরের দাবিতে চট্টগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ সভা; সমস্যার সমাধানে উদ্যোগের আশ্বাস ইসরাফিল খসরুর:
মো. কামাল উদ্দিন দেশের জ্বালানি খাত শুধু একটি সেবামূলক খাত নয়; এটি শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, আবাসন, কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম ভিত্তি। আর এই খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল)। চট্টগ্রাম ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের লাখো গ্রাহক এই প্রতিষ্ঠানের সেবার ওপর নির্ভরশীল। ফলে সেবার মান, প্রশাসনিক কার্যক্রমের দক্ষতা এবং গ্রাহকসন্তুষ্টি নিয়ে যে কোনো আলোচনা জনস্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত।  এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে বৃহস্পতিবার (১৮ জুন ২০২৬) সন্ধ্যা ৬টায় চট্টগ্রাম নগরীর মেহেদীবাগস্থ বাণিজ্য মন্ত্রীর বাসভবনে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার, গ্রাহক প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজনদের নিয়ে সমিতির সভাপতি নাজমুল হোসেন চৌধুরী ও একেএম অলিউল্লা হক নেতৃত্বে এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর পুত্র এবং চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির নেতা ইসরাফিল খসরু। এছাড়া কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড ঠিকাদার কল্যাণ সমিতি, চট্টগ্রামের নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন পর্যায়ের ঠিকাদার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, গ্রাহক প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা উপস্থিত ছিলেন। গ্রাহকসেবার বাস্তব চিত্র উঠে আসে আলোচনায় সভার শুরু থেকেই অংশগ্রহণকারীরা সরাসরি তাঁদের অভিজ্ঞতা, অভিযোগ, প্রত্যাশা এবং বাস্তব সমস্যাগুলো তুলে ধরেন। বক্তারা বলেন, কেজিডিসিএল-এর অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলেও কিছু ক্ষেত্রে সেবা প্রদানের গতি প্রত্যাশিত নয়। বিশেষ করে নতুন সংযোগ, মালিকানা পরিবর্তন, নাম সংশোধন, বাণিজ্যিক ও আবাসিক সংযোগসংক্রান্ত বিভিন্ন আবেদন নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়। অনেক গ্রাহক অভিযোগ করেন, একই ধরনের আবেদন একেক জোনে একেকভাবে মূল্যায়ন করা হয়। কোথাও দ্রুত কাজ সম্পন্ন হলেও কোথাও অতিরিক্ত সময় লাগে। ফলে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে। অতিরিক্ত কাগজপত্র ও প্রশাসনিক জটিলতা নিয়ে উদ্বেগ সভায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল বিভিন্ন সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কাগজপত্র জমা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, ২০১৪ সালের গেজেটের কিছু বিধান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেক সময় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ডকুমেন্ট চাওয়া হয়, যা সাধারণ মানুষের জন্য বাড়তি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে বয়স্ক নাগরিক, প্রবাসী পরিবারের সদস্য এবং স্বল্পশিক্ষিত গ্রাহকদের জন্য এসব প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে ওঠে। তাঁদের মতে, বর্তমান সময়ে জাতীয় পরিচয়পত্র, অনলাইন ভূমি রেকর্ড, ডিজিটাল কর পরিশোধ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সরকারি ডাটাবেজ বিদ্যমান থাকার পরও যদি একজন গ্রাহককে বারবার একই তথ্য জমা দিতে হয়, তাহলে সেটি আধুনিক সেবার ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট সেবার প্রত্যাশা সভায় বক্তারা বলেন, রাষ্ট্র যখন ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে, তখন জ্বালানি খাতেও প্রযুক্তিনির্ভর ও গ্রাহকবান্ধব সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাঁরা অনলাইন আবেদন, ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা, এসএমএস নোটিফিকেশন, অভিযোগ ব্যবস্থাপনা এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা চালুর দাবি জানান। বক্তাদের মতে, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে একদিকে যেমন দুর্নীতি ও অনিয়ম কমবে, অন্যদিকে গ্রাহকদের হয়রানিও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। আইডিএন নির্দেশনা বাস্তবায়নে সমন্বয়ের দাবি সভায় আলোচনায় উঠে আসে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আইডিএন (IDN) নির্দেশনার বিষয়টিও।
অংশগ্রহণকারীরা বলেন, এই নির্দেশনার মূল লক্ষ্য ছিল গ্রাহকসেবাকে আরও সহজ, দ্রুত এবং হয়রানিমুক্ত করা। কিন্তু মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু জায়গায় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁদের মতে, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সিদ্ধান্ত এবং মাঠ প্রশাসনের বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিয়মিত তদারকি, জবাবদিহিতা এবং কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা উচিত। ইসরাফিল খসরুর বক্তব্য: মানুষের আস্থা অর্জনই সবচেয়ে বড় বিষয়
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইসরাফিল খসরু বলেন, একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জনগণের আস্থা। আর সেই আস্থা অর্জনের একমাত্র উপায় হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সময়মতো সেবা প্রদান। তিনি বলেন, “মানুষ যখন কোনো সরকারি বা আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানে যায়, তখন তারা সমস্যার সমাধান চায়। সেবা গ্রহণের জন্য যেন কাউকে অযথা হয়রানির শিকার হতে না হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।” তিনি অংশগ্রহণকারীদের উত্থাপিত প্রতিটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে নোট নেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণের আশ্বাস দেন।
তিনি আরও বলেন, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে গ্রাহকসেবা উন্নয়নের বিষয়ে প্রয়োজনীয় সুপারিশ তুলে ধরা হবে। ঠিকাদারদের বক্তব্য: উন্নয়ন চাই, সংঘাত নয়
সভায় উপস্থিত ঠিকাদার প্রতিনিধিরা বলেন, ঠিকাদাররা মূলত সেবা কার্যক্রমের মাঠপর্যায়ের অংশীদার। তাই সেবার মানোন্নয়ন এবং গ্রাহক সন্তুষ্টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাঁদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাঁরা বলেন, প্রশাসন, ঠিকাদার ও গ্রাহকদের মধ্যে সমন্বিত সম্পর্ক গড়ে উঠলে অনেক সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব। অপ্রয়োজনীয় জটিলতা, ভুল বোঝাবুঝি এবং তথ্যের ঘাটতির কারণে অনেক সময় সমস্যার সৃষ্টি হয়। সমিতির আহ্বান: ধৈর্য, সহযোগিতা ও ইতিবাচক অংশগ্রহণ কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড ঠিকাদার কল্যাণ সমিতি, চট্টগ্রামের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চলমান উন্নয়ন ও সংস্কার কার্যক্রম সফল করতে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। সমিতির সভাপতি নাজমুল হোসেন চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক একেএম অলিউল্লাহ হকের নেতৃত্বে মতবিনিময়ে সমিতির নেতৃবৃন্দ বলেন, যেকোনো প্রশাসনিক সংস্কার সময়সাপেক্ষ। তাই চলমান প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা রেখে সকলকে দায়িত্বশীল ও ধৈর্যশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তাঁরা আরও বলেন, গ্যাস খাতের উন্নয়ন, সেবার মানোন্নয়ন এবং গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। আশার বার্তা দিয়ে শেষ হলো সভা
দীর্ঘ আলোচনা, মতামত বিনিময় এবং বিভিন্ন প্রস্তাব-সুপারিশের মধ্য দিয়ে সভাটি শেষ হয়। উপস্থিত অংশীজনরা মনে করেন, এমন উন্মুক্ত ও অংশগ্রহণমূলক আলোচনা কেবল সমস্যার চিত্রই তুলে ধরে না, বরং সমাধানের পথও তৈরি করে।
তাঁদের মতে, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির সেবা আরও জনবান্ধব, স্বচ্ছ, আধুনিক এবং জবাবদিহিমূলক করতে হলে গ্রাহক, প্রশাসন, ঠিকাদার ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। চট্টগ্রামের জ্বালানি খাতে সুশাসন ও উন্নত গ্রাহকসেবার প্রত্যাশায় আয়োজিত এই মতবিনিময় সভাকে উপস্থিত অনেকে একটি ইতিবাচক ও সময়োপযোগী উদ্যোগ হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা ভবিষ্যতে সেবার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
Share This Article
Leave a Comment