বীর কন্যা প্রীতিলতা: অগ্নিযুগের এক দীপ্ত নক্ষত্র

By admin
4 Min Read

মো. কামাল উদ্দিন
৫ মে—বাংলার ইতিহাসে এক নীরব কিন্তু গভীর আবেগের দিন। এই দিনে জন্ম নিয়েছিলেন এমন এক কিশোরী, যিনি সময়ের সীমানা পেরিয়ে হয়ে উঠেছেন উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের এক অমর প্রতীক। তিনি বীর কন্যা Pritilata Waddedar—যাঁর নাম উচ্চারণ করলেই আজও জেগে ওঠে সাহস, আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্র। বাংলার বিপ্লবী ইতিহাসে নারী নেতৃত্বের উপস্থিতি যখন ছিল সীমিত ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ, তখনই প্রীতিলতা হয়ে ওঠেন সেই আলোকবর্তিকা, যিনি প্রমাণ করেছিলেন—দেশপ্রেম লিঙ্গ, বয়স কিংবা সামাজিক সীমাবদ্ধতার বাইরে এক অনন্য শক্তি। অগ্নিযুগের চট্টগ্রাম ও এক বিপ্লবী কিশোরী
চট্টগ্রামের পাহাড়তলী, ধলঘাট—এই ভূমিই গড়ে তুলেছিল এক বিপ্লবী মানসিকতার আবহ। মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে যখন গড়ে উঠছিল ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলন, তখনই সেই আন্দোলনের ভেতরে ধীরে ধীরে দৃঢ় অবস্থান তৈরি করেন প্রীতিলতা।
তিনি ছিলেন শিক্ষিত, সংবেদনশীল এবং একই সঙ্গে দৃঢ়চেতা। সমাজের প্রচলিত নারীচিত্রকে অতিক্রম করে তিনি প্রবেশ করেন এক কঠিন সংগ্রামী বাস্তবতায়। সেখানে আবেগ নয়, ছিল সিদ্ধান্তের কঠোরতা; ভয় নয়, ছিল দায়িত্ববোধের অটল বিশ্বাস।
ধলঘাটের সেই সংকটময় মুহূর্ত ধলঘাটের এক গোপন আশ্রয়ে মাস্টারদা সূর্য সেন ও বিপ্লবী নির্মল সেনের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হঠাৎ ব্রিটিশ বাহিনীর ঘেরাও পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে বিপ্লবীরা চরম সংকটে পড়ে যান।
কিন্তু সেই মুহূর্তে প্রীতিলতার উপস্থিত বুদ্ধি, ধৈর্য এবং সাহসিকতা পুরো পরিস্থিতিকে পাল্টে দেয়। তিনি কেবল একজন সহযাত্রী নন, বরং একজন সক্রিয় বিপ্লবী হিসেবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা দেখান, যা তাঁর নেতৃত্বগুণের প্রথম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
পাহাড়তলী ইউরোপীয়ান ক্লাব অভিযান ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর—বাংলার বিপ্লবী ইতিহাসের এক অগ্নিগর্ভ রাত। মাস্টারদার নেতৃত্বে পরিকল্পিত হয় চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণ। এই অভিযানে প্রীতিলতা শুধু অংশগ্রহণই করেননি, বরং নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ইতিহাসে তিনি হয়ে ওঠেন প্রথম বাঙালি নারী শহীদ, যিনি সশস্ত্র বিপ্লবী অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেই অভিযানের সময় বিপ্লবীরা একটি ইস্তেহার বিতরণ করেন, যেখানে উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ এবং স্বাধীনতার দাবি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, জনগণ আর নিপীড়নের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকবে না—বরং প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। এই বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক ঘোষণা নয়, বরং ছিল এক জাতির আত্মমর্যাদার জাগরণ। মাস্টারদা ও প্রীতিলতার সম্পর্ক: আদর্শ ও দায়িত্বের বন্ধন প্রীতিলতার ডায়েরিতে যে আবেগ ও দ্বন্দ্বের চিত্র পাওয়া যায়, তা এক অনন্য মানবিক দলিল। তিনি নিজেকে “অনুবর্তী কর্মী” হিসেবেই ভাবতে চাইতেন, কিন্তু মাস্টারদা সূর্য সেন তাঁর ভেতরের সম্ভাবনাকে চিনতে পেরেছিলেন। মাস্টারদার সেই দৃঢ় উচ্চারণ—“এই দায়িত্ব তুমি ছাড়া আর কেউ পালন করতে পারবে না”—শুধু একটি নির্দেশ নয়, বরং ছিল একজন বিপ্লবীর উপর আরেক বিপ্লবীর অগাধ বিশ্বাস। এই সম্পর্ক ছিল শ্রদ্ধা, আদর্শ ও দায়িত্বের এক অসাধারণ বন্ধন। আত্মত্যাগের মুহূর্ত ও ইতিহাসের অমরতা অভিযানের এক পর্যায়ে প্রীতিলতা মারাত্মকভাবে আহত হন এবং শত্রুর হাতে ধরা না পড়ার দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সেই সিদ্ধান্ত ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন, কিন্তু সবচেয়ে গৌরবময় মুহূর্ত। তিনি শারীরিকভাবে হারিয়ে যান, কিন্তু আদর্শিকভাবে হয়ে ওঠেন চিরজাগ্রত। তাঁর আত্মত্যাগ বাংলার বিপ্লবী ইতিহাসে নারী শক্তির এক নতুন সংজ্ঞা তৈরি করে। প্রীতিলতার প্রাসঙ্গিকতা আজ আজকের দিনে দাঁড়িয়ে প্রীতিলতা কেবল ইতিহাসের চরিত্র নন, বরং একটি চেতনা। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়— অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকা অপরাধের অংশ হয়ে ওঠে
দেশপ্রেম কেবল আবেগ নয়, দায়িত্ব নারী কেবল সহযাত্রী নয়, নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুও হতে পারে বর্তমান সমাজে যখন মূল্যবোধ, সাহস এবং নৈতিক অবস্থান বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন প্রীতিলতার জীবন হয়ে ওঠে এক অনিবার্য অনুপ্রেরণা। শেষ কথা
আজ তাঁর জন্মদিনে আমরা শুধু একজন বিপ্লবী নারীকে স্মরণ করি না, স্মরণ করি এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গকে—যিনি অন্ধকার সময়ে আলো জ্বালিয়ে গেছেন। বীর কন্যা Pritilata Waddedar আমাদের ইতিহাসের গর্ব, আমাদের আত্মমর্যাদার প্রতীক।
তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা— তিনি আছেন, থাকবেন চিরকাল বাংলার সাহস, চেতনা ও মুক্তির প্রতিচ্ছবি হয়ে।

Share This Article
Leave a Comment