“মানবতার মিনার নির্মাণে এক মহৎ যাত্রা: আলহাজ্ব রোকেয়া–সামশুল ইসলাম এতিমখানা ও নুরানী মাদ্রাসার স্বপ্ন ও সম্ভাবনা”

By admin
5 Min Read

-মো.কামাল উদ্দিন
চট্টগ্রামের মাটি বহু যুগ ধরেই মানবতা, সহমর্মিতা ও সমাজসেবার উজ্জ্বল উদাহরণ সৃষ্টি করে আসছে। সেই ধারাবাহিকতার আরেকটি অনন্য সংযোজন হলো “আলহাজ্ব রোকেয়া–সামশুল ইসলাম এতিমখানা ও নুরানী মাদ্রাসা”-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন। ২৫ এপ্রিল ২০২৬, এক সাধারণ দিনের ভেতরেই অসাধারণ এক মানবিক উদ্যোগের সূচনা হলো—যেখানে ইট-পাথরের কাঠামোর চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ, ভালোবাসা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ার অঙ্গীকার। বিকালের নরম আলোয় যখন অনুষ্ঠানস্থলে মানুষের সমাগম বাড়ছিল, তখন স্পষ্ট হয়ে উঠছিল—এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং একটি স্বপ্নের জন্মমুহূর্ত। এতিম ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়, শিক্ষার আলো এবং নৈতিকতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা জীবনের প্রতিশ্রুতি—এই তিনটি স্তম্ভকে কেন্দ্র করেই দাঁড়াতে যাচ্ছে এই প্রতিষ্ঠান। এই মহৎ উদ্যোগের অন্যতম প্রেরণাদাতা ও অনুষ্ঠানের সভাপতি মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান তাঁর বক্তব্যে যে দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তিনি শুধু একটি প্রতিষ্ঠান গড়ার কথা বলেননি; তিনি বলেছেন একটি মানবিক সমাজ নির্মাণের কথা। তাঁর কথায় স্পষ্ট হয়েছে—এতিমদের জন্য আশ্রয় গড়া মানে কেবল মাথা গোঁজার ঠাঁই দেওয়া নয়, বরং তাদেরকে আদর্শ, নৈতিকতা ও আত্মমর্যাদাবোধে গড়ে তোলা। এমন চিন্তা ও উদ্যোগ সত্যিই অনুপ্রেরণার, এবং বলা যায়—মাহফুজুর রহমানের মতো মানুষের হাত ধরেই সমাজে প্রকৃত পরিবর্তনের সূচনা সম্ভব। তবে এই আয়োজনের প্রাণকেন্দ্রে যে ব্যক্তিত্বটি বিশেষভাবে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন, তিনি হলেন বিশিষ্ট শিল্পপতি, সমাজসেবক ও শিক্ষানুরাগী আলহাজ্ব আবুল বশর আবু। তাঁর বক্তব্যে যেমন ছিল আন্তরিকতা, তেমনি ছিল গভীর দায়বদ্ধতার প্রতিফলন। তিনি এতিম শিশুদের মুখে হাসি ফোটানোর যে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন, তা কেবল কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—বরং তাঁর জীবনের দর্শনেরই প্রতিফলন। সমাজের অবহেলিত শিশুদের প্রতি তাঁর এই মমত্ববোধ এবং তাদের জন্য শিক্ষার পথ সুগম করার প্রতিশ্রুতি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। আবুল বশর আবু যে বিষয়টি অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন, তা হলো—এতিমদের কল্যাণে কাজ করা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি এক মহান ইবাদত। এই উপলব্ধি থেকেই তাঁর মতো মানুষরা সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তিনি যে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন, তা এই প্রকল্পকে বাস্তবায়নের পথে এক শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে বলেই মনে হয়। তাঁর নেতৃত্ব, অভিজ্ঞতা ও উদারতা এই উদ্যোগকে আরও গতিশীল করবে—এমন প্রত্যাশা অমূলক নয়। এই আয়োজনকে ঘিরে স্থানীয় সমাজের যে ব্যাপক অংশগ্রহণ দেখা গেছে, তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ—আলেম-ওলামা, শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক, তরুণ প্রজন্ম—সবাই যেন এক সুতোয় গাঁথা হয়ে উপস্থিত হয়েছেন এই মহৎ কাজে শরিক হতে। এটি প্রমাণ করে, মানবিক উদ্যোগ কখনো একার নয়; এটি সম্মিলিত প্রয়াসের ফল। অনুষ্ঠানে অন্যান্য অতিথিদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে এক অভিন্ন সুর—সমাজের অবহেলিত শিশুদের জন্য এমন উদ্যোগ সময়ের দাবি। তাদের বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে সহযোগিতার মানসিকতা এবং এই প্রতিষ্ঠানকে সফল করার অঙ্গীকার। এটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। এই এতিমখানা ও নুরানী মাদ্রাসার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা যে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত, সেটিও আয়োজকদের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট। এখানে শুধু ধর্মীয় শিক্ষাই নয়, বরং আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি আবাসন, নৈতিক শিক্ষা এবং সামাজিক মূল্যবোধ চর্চার সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। অর্থাৎ, এটি হবে এমন একটি কেন্দ্র, যেখানে শিশুরা শুধু পড়াশোনা করবে না, বরং মানুষ হয়ে উঠবে—একজন সচেতন, দায়িত্বশীল ও মানবিক মানুষ। আমাদের সমাজে এতিম ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সংখ্যা কম নয়। তাদের অনেকেই শিক্ষা ও আশ্রয়ের অভাবে অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হয়। এই বাস্তবতায় “আলহাজ্ব রোকেয়া–সামশুল ইসলাম এতিমখানা ও নুরানী মাদ্রাসা” একটি আলোকবর্তিকা হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। এখান থেকে গড়ে উঠতে পারে এমন এক প্রজন্ম, যারা শুধু নিজেদের ভাগ্যই বদলাবে না, বরং সমাজেরও ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে। অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে দোয়া ও মোনাজাতের মধ্য দিয়ে যে আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, তা উপস্থিত সবার হৃদয় স্পর্শ করেছে। সেখানে উচ্চারিত প্রতিটি প্রার্থনায় ছিল এই প্রতিষ্ঠানের সফলতা, স্থায়িত্ব এবং এর সঙ্গে জড়িত সকল মানুষের মঙ্গল কামনা। সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, এই উদ্যোগ শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নির্মাণের সূচনা নয়—এটি একটি দর্শনের প্রতিষ্ঠা। এটি প্রমাণ করে, এখনও এই সমাজে এমন মানুষ আছেন, যারা নিজেদের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে অন্যের জন্য ভাবেন, কাজ করেন। আলহাজ্ব আবুল বশর আবুর মতো উদার ও মানবিক ব্যক্তিত্ব এবং মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানের মতো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সংগঠকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই স্বপ্ন যে একদিন বাস্তবে রূপ নেবে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বরং এই উদ্যোগই ভবিষ্যতে আরও অনেককে অনুপ্রাণিত করবে—মানবতার এই মহৎ যাত্রায় শামিল হতে।
মানবতার আলোয় নির্মিত এই আশ্রয় একদিন হয়ে উঠুক অসহায় শিশুদের নিরাপদ ঠিকানা, জ্ঞানের আলোকবর্তিকা এবং একটি মানবিক সমাজ গড়ার দৃঢ় ভিত্তি—এই প্রত্যাশাই আজ সকলের।

Share This Article
Leave a Comment