“শিল্পের স্পন্দন ফিরুক—এস আলমের প্রত্যাবর্তনে চট্টগ্রামের পুনর্জাগরণের ডাক-

By admin
5 Min Read

-মো.কামাল উদ্দিনঃ
চট্টগ্রাম—একটি নাম, যার সাথে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের অর্থনীতির শ্বাস-প্রশ্বাস। এটি কেবল একটি বন্দরনগরী নয়; এটি দেশের শিল্প, বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের কেন্দ্রবিন্দু। এই শহরের প্রতিটি সকাল শুরু হয় শ্রমিকের পদচারণায়, প্রতিটি সন্ধ্যা শেষ হয় উৎপাদনের হিসাব-নিকাশে। এই শহর জানে—শিল্প মানেই জীবন, আর শিল্পের স্থবিরতা মানেই অর্থনীতির রক্তক্ষরণ। এই বাস্তবতায় এস আলম গ্রুপ-কে ঘিরে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি আজ এক গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। কারণ এই শিল্পগোষ্ঠী শুধু একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়—এটি লক্ষাধিক মানুষের জীবিকার অবলম্বন, অসংখ্য পরিবারে আলো জ্বালানোর উৎস, এবং জাতীয় অর্থনীতির একটি শক্তিশালী স্তম্ভ। দীর্ঘ সময় ধরে দেশের খাদ্যপণ্য, বিদ্যুৎ উৎপাদন, ইস্পাত, টেক্সটাইল, শিপিং, ব্যাংকিং, রিয়েল এস্টেটসহ বহু খাতে এস আলম গ্রুপ তাদের কার্যক্রম বিস্তৃত করেছে। তাদের বিনিয়োগ শুধু শিল্পে সীমাবদ্ধ নয়—এটি দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, বাজার স্থিতিশীলতা এবং কর্মসংস্থানের প্রসারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান এই শিল্পগোষ্ঠীর সাথে সম্পৃক্ত—যা কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো নয়। তবুও, এই সুপ্রতিষ্ঠিত শিল্পগোষ্ঠীকে ঘিরে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা অনেকের কাছেই স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে না। বরং একটি বড় প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে—এটি কি প্রকৃত অর্থনৈতিক দুর্বলতা, নাকি পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা একটি সংকট? চট্টগ্রামের সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করে—এস আলম গ্রুপ কখনোই প্রকৃত অর্থে দেউলিয়া ছিল না। বরং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নীতিগত জটিলতা এবং কিছু প্রভাবশালী মহলের অবস্থানের কারণে একটি কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে—এমন অভিযোগ এখন সর্বত্র উচ্চারিত। বিশেষ করে সাবেক বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হোসেন মনসুর-এর ভূমিকা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন উঠেছে। যদি কোনো সিদ্ধান্ত বা নীতিগত পদক্ষেপ একটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীকে অযৌক্তিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে থাকে, তবে সেই সিদ্ধান্তের পেছনের দায় নিরূপণ করা জরুরি। রাষ্ট্রের আইনের শাসন তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নয়—সত্য ও ন্যায়বিচার প্রাধান্য পায়।
আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই—
কোনো শিল্পগোষ্ঠী যদি অনিয়ম করে, দুর্নীতিতে জড়িত থাকে, তাহলে তার বিচার অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু সেই বিচার হতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়, এবং আইনের পূর্ণ মর্যাদা রক্ষা করে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—
একটি চলমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন করে, উৎপাদন বন্ধ করে, লক্ষ লক্ষ শ্রমিককে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেওয়া—এটি কি কোনো সমস্যার সমাধান?
উত্তরটি স্পষ্ট—না।
কারণ শিল্প বন্ধ মানেই শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি নয়;
এটি শ্রমিকের ঘরে অন্ধকার,
এটি বাজারে স্থবিরতা,
এটি জাতীয় অর্থনীতিতে গভীর সংকট।
চট্টগ্রামের মানুষ এই বাস্তবতা খুব ভালো করেই বোঝে। যারা প্রতিদিন কারখানায় কাজ করে, যারা মাস শেষে বেতনের টাকায় সংসার চালায়, যারা সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখে—তাদের জীবনের সাথে এই শিল্পগোষ্ঠীর অস্তিত্ব অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
আজ সেই মানুষগুলোর চোখে প্রশ্ন—
তাদের ভবিষ্যৎ কোথায়?
তাদের কর্মসংস্থান কি ফিরে আসবে?
তাদের জীবনের স্থিতিশীলতা কি আবার নিশ্চিত হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই চট্টগ্রাম নাগরিক সমাজ আজ সোচ্চার।
তাদের দাবি স্পষ্ট—
শিল্পকে বাঁচাতে হবে,
কর্মসংস্থান রক্ষা করতে হবে,
অর্থনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।
এই প্রেক্ষাপটে এস আলম গ্রুপের পুনরায় দেশে ফিরে এসে কার্যক্রম শুরু করার উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হচ্ছে। এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের প্রত্যাবর্তন নয়—এটি একটি অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের সম্ভাবনা, একটি নতুন আস্থার সূচনা।
তবে এই প্রত্যাবর্তন হতে হবে একটি নতুন প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে—
স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা।
রাষ্ট্রের কাছেও প্রত্যাশা—
তারা একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নেবে।
একদিকে আইনের শাসন নিশ্চিত করবে,
অন্যদিকে শিল্প ও কর্মসংস্থানের ধারাবাহিকতা রক্ষা করবে।
আজ প্রয়োজন প্রতিহিংসা নয়, সমাধান;
সংঘাত নয়, সংলাপ;
ধ্বংস নয়, পুনর্গঠন।
চট্টগ্রাম আজ আর নীরব থাকতে চায় না।
এই নগরীর মানুষ দেশের স্বার্থে কথা বলতে চায়—
শিল্পের পক্ষে,
শ্রমিকের পক্ষে,
অর্থনীতির পক্ষে।
আমরা বিশ্বাস করি—
বাংলাদেশের অর্থনীতি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নয়;
এটি ১৮ কোটি মানুষের ভবিষ্যতের ভিত্তি।
তাই আসুন, আমরা একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করি—
যেখানে শিল্প ধ্বংসের নয়, টিকিয়ে রাখার কথা বলা হবে;
যেখানে নীতিগত সিদ্ধান্ত হবে জনগণের কল্যাণে;
যেখানে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাই হবে প্রধান লক্ষ্য।
এস আলমের প্রত্যাবর্তন হোক সেই নতুন অধ্যায়ের সূচনা
যেখানে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া হবে,
বর্তমানকে স্থিতিশীল করা হবে,
এবং ভবিষ্যৎকে শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করানো হবে।
চট্টগ্রামের মানুষ আজ আশাবাদী—
শিল্পের চাকা আবার ঘুরবে,
কারখানার চিমনি থেকে আবার ধোঁয়া উঠবে,
শ্রমিকের ঘরে আবার হাসি ফিরবে।
এখনই সময়—দেশের স্বার্থে, মানুষের স্বার্থে, শিল্পের স্বার্থে একসাথে দাঁড়ানোর।

Share This Article
Leave a Comment