
—মো. কামাল উদ্দিন
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
রাত ২টা ৩০ মিনিট। শহর তখন গভীর নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন। কিন্তু সেই নীরবতার বুক চিরে এক বেদনাবার্তা এসে পৌঁছাল—চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন সাংবাদিক আইয়ুব আলী। মুহূর্তেই যেন চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। যে মানুষটির জন্য আমরা জীবনভিক্ষার প্রার্থনায় হাত তুলেছিলাম, যাকে ঘিরে ছিল আশার আলো—আজ তাকে বিদায়ের দোয়া জানাতে হচ্ছে। নিয়তির এই নির্মমতায় হৃদয় যেন স্তব্ধ হয়ে যায়। ১৯৯২ সালের দিকে তার সঙ্গে আমার পরিচয়। দীর্ঘ এই তিন দশকের পথচলায় তাকে দেখেছি খুব কাছ থেকে—একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে নয় শুধু, একজন মানুষ হিসেবেও। আইয়ুব আলী ছিলেন দৃঢ়চেতা, সৎ, নির্লোভ এবং আত্মমর্যাদাবোধে উজ্জ্বল এক মানুষ। সাংবাদিকতার জগৎ কখনোই সরল নয়; এখানে ক্ষমতার চাপ আছে, প্রলোভনের হাতছানি আছে, বিভক্তির রাজনীতি আছে। কিন্তু এসবের ভিড়ে তিনি ছিলেন স্বচ্ছ এক প্রদীপ—নীরবে জ্বলেছেন, কিন্তু আপসহীন থেকেছেন। তার কণ্ঠ ছিল উচ্চ নয়, কিন্তু স্পষ্ট। তার ভাষা ছিল সংযত, কিন্তু দৃঢ়। আমার উপস্থাপনায় বাংলা টিভি-এর টকশো “চট্টগ্রাম সংলাপ”-এ তিনি তিনবার অংশ নিয়েছিলেন। প্রতিবারই তিনি আলোচনায় এনেছেন প্রজ্ঞা, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। কখনো ব্যক্তিগত আক্রমণে যাননি, কখনো উত্তেজনায় ভেসে যাননি। ক্যামেরার সামনে যেমন ছিলেন মার্জিত, ক্যামেরার বাইরেও তেমনি সহজ, আন্তরিক ও বিনয়ী। তিনি প্রমাণ করেছেন—সাংবাদিকতা মানে কেবল সংবাদ পরিবেশন নয়, এটি একটি নৈতিক অবস্থান।
আজ তার চলে যাওয়ার সময়টি আমাদের জন্য আরও বেশি বেদনাদায়ক। কারণ সাংবাদিক সমাজ এখন এক গভীর সংকটের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করছে। ঐতিহ্যের বাহক সাংবাদিক ইউনিয়নের কার্যালয়ে তালা ঝুলছে। নিয়মিতভাবে নির্বাচিত একটি কমিটি রাজপথে নেমে নিজেদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনে শামিল। সাংবাদিকদের আড্ডা, পরামর্শ ও ঐক্যের স্থান—প্রেসক্লাব—হাতছাড়া হওয়ার বেদনায় অনেকে ব্যথিত। অসংখ্য সদস্যের সদস্যপদ তথাকথিত মনগড়া সিদ্ধান্তে বাতিলের প্রহসনের শিকার হয়েছে। বিভাজন ও অবিশ্বাসের এই অস্থির সময়ে মূলধারার সাংবাদিকরা ন্যায়ের দাবিতে সোচ্চার।
এই উত্তাল সময়ের একজন সাহসী সারথি ছিলেন আইয়ুব আলী। তিনি নিরব দর্শক হয়ে থাকেননি। রাজপথে দাঁড়িয়েছেন, সভায় কথা বলেছেন, সহকর্মীদের পাশে থেকেছেন। তার বিশ্বাস ছিল—সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষা করতে হলে ঐক্য প্রয়োজন, সাহস প্রয়োজন, সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রয়োজন। তিনি আপসের পথ বেছে নেননি; বরং ন্যায়ের পথে থাকার ঝুঁকিটুকু গ্রহণ করেছেন। আজ সেই রাজপথ আছে, মিছিল আছে, স্লোগান আছে—কিন্তু আইয়ুব আলীর শান্ত অথচ দৃঢ় উপস্থিতি নেই। সভাকক্ষে হয়তো আলোচনা চলবে, বিতর্ক হবে—কিন্তু তার সংযত কণ্ঠ আর শোনা যাবে না। এই অনুপস্থিতিই আমাদের হৃদয়ে গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করে। আমরা হারালাম শুধু একজন সহকর্মীকে নয়; হারালাম এক নৈতিক শক্তিকে। হারালাম এমন একজন মানুষকে, যিনি বিভক্তির সময়ে ঐক্যের কথা বলতেন; হতাশার সময়ে আশার কথা বলতেন। তার কলম থেমে গেছে, কিন্তু তার উচ্চারণ থেমে নেই—সেটি প্রতিধ্বনিত হবে আমাদের বিবেকের ভেতর। ব্যক্তিগতভাবে তার স্মৃতি আমার কাছে আরও গভীর। বহুবার আলোচনায়, বিতর্কে, মতবিনিময়ে তাকে পেয়েছি যুক্তির পক্ষে দৃঢ় অবস্থানে। কখনো অহংকার দেখিনি, কখনো ক্ষুদ্র স্বার্থে নিজেকে জড়াতে দেখিনি। তার হাসি ছিল প্রশান্ত, তার আচরণ ছিল সম্মাননির্ভর। এমন মানুষ খুব বেশি জন্মায় না—যারা পেশাকে মর্যাদা দেয়, সহকর্মীকে সম্মান দেয় এবং নিজেকে সংযমের মধ্যে রাখে। তার মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আদর্শ অমর। আমরা যদি সত্যিই তাকে স্মরণ করতে চাই, তবে আমাদের ভেতরের বিভাজন দূর করতে হবে। সাংবাদিকতার যে নৈতিক ভিত্তি তিনি ধারণ করেছিলেন, সেটিকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে। নতুবা তার প্রতি আমাদের শোক হবে কেবল আনুষ্ঠানিক, অন্তঃসারশূন্য। মহান আল্লাহ তার সব ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন। তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। শোকসন্তপ্ত পরিবারকে দিন ধৈর্য ও শক্তি। আর আমাদের সাংবাদিক সমাজকে দিন ঐক্য, প্রজ্ঞা ও সাহস—যেন আমরা এই সংকটময় সময়ে সঠিক পথ বেছে নিতে পারি। আইয়ুব আলী, তুমি চলে গেছ অনন্তের পথে। কিন্তু তোমার সততা, তোমার সাহস, তোমার নীরব দীপ্তি আমাদের মাঝে রয়ে যাবে। নিস্তব্ধ এই শহর তোমাকে স্মরণ করবে—সত্যের এক নিবেদিত সৈনিক হিসেবে।