দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলেও এর সুফল জনগণের হাতে না গিয়ে সীমিত একটি গোষ্ঠীর কাছে চলে যাচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলেছেন দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা। তাঁদের মতে, ব্যাংক দুর্নীতি ও আর্থিক খাতে লুটপাটের দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় না এনে বরং প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ায় প্রায় ১৪ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছে, যা দেশের জন্য বড় ধরনের সামাজিক সংকট তৈরি করছে। শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত **চতুর্থ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন ২০২৫**–এ এসব বিষয়ে আলোচনা করেন বক্তারা। আয়োজন করে দৈনিক *বণিক বার্তা*। বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব **মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর** বলেন, ব্যবসায়ীদের প্রতি সন্দেহ নয়, বরং আস্থার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। তিনি অভিযোগ করেন—গত ১৫ বছরে যারা ব্যাংক লুট ও দুর্নীতিতে জড়িত, তাঁদের শাস্তি না হয়ে উল্টো তাঁদের প্রতিষ্ঠানে তালা ঝুলে গেছে, ফলে লাখো কর্মীর জীবন অনিশ্চয়তায় পড়েছে। তাঁর প্রশ্ন, “এই মানুষগুলো যাবে কোথায়?”
তিনি বলেন, কারখানা চালু রাখা এবং কর্মসংস্থান ধরে রাখাই হওয়া উচিত অগ্রাধিকার। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য **আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী** বলেন, অর্থনীতির সুফল যদি একটি গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, তাহলে জনগণ কখনোই এর বাস্তব সুবিধা পাবে না। অর্থনীতিকে গণতন্ত্রের অংশ করে তুলতে হবে—যেখানে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে, উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার পাবেন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিও উন্নয়নের ধারায় যুক্ত হবে। জামায়াতে ইসলামীর আমির **ডা. শফিকুর রহমান** বলেন, দেশের প্রতিটি মানুষ—ভিক্ষুক থেকে শিল্পপতি—ট্যাক্স ও অবদানের মাধ্যমে অর্থনীতিকে দাঁড় করিয়ে রাখছে। তাই অর্থনৈতিক বণ্টনেও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি আরও বলেন, লাল ফিতার দৌরাত্ম্য ও নানা দুর্বৃত্তপনা অর্থনৈতিক কাঠামোকে জটিল বানিয়েছে, যেখানে রাষ্ট্রও অনেক ক্ষেত্রে এসব দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছে। এনসিপির আহ্বায়ক **নাহিদ ইসলাম** বলেন, পূর্ববর্তী সরকার রাষ্ট্র ও অর্থনীতি পরিচালনায় বৈষম্যমূলক কাঠামো তৈরি করেছিল, যেখানে মাফিয়া শ্রেণি প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। জনগণের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা থেকেই জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের সূচনা হয় বলে তিনি মনে করেন। সুজন সম্পাদক **ড. বদিউল আলম মজুমদার** বলেন, নির্বাচন গণতন্ত্রের একমাত্র মুখ নয়, এটি শুধু পথ। কিন্তু দেশে নির্বাচন ও রাজনৈতিক অঙ্গন অস্বচ্ছ হওয়ায় গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মনোনয়ন বাণিজ্য, টাকার খেলা ও অস্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়া বন্ধ করা জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর **ড. আহসান এইচ মনসুর** জানান, দুর্বল পাঁচ ব্যাংককে একীভূত করে ৩৫ হাজার কোটি টাকা মূলধনের একটি শক্তিশালী ব্যাংক গঠন করা হচ্ছে, যার লঞ্চিং হতে পারে আগামী সপ্তাহেই। তিনি বলেন, বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত থাকলে রমজানেও কোনো দ্রব্যমূল্য সংকট হবে না। দাম নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সম্মেলনের উন্মুক্ত আলোচনায় দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। সঞ্চালনায় ছিলেন *বণিক বার্তা* সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। বক্তব্য দেন এ. কে. আজাদ, মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, অধ্যাপক এ কে এনামুল হক, সিমিন রহমান, মাসরুর আরেফিনসহ আরও অনেকে।
