এজাহার দিতে গিয়ে বাদীর গ্রেফতার — বায়েজিদ থানায় রহস্যজনক এক ঘটনার অভিযোগ

0
245

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রামঃ
চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী থানার সাম্প্রতিক এক ঘটনায় দেখা দিয়েছে তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভের ঝড়। এলাকায় চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলে হামলার শিকার হওয়া এক ব্যবসায়ী মো. দেলোয়ার হোসেন যখন নিজেই থানায় গিয়ে ন্যায়বিচারের আশায় এজাহার দাখিল করতে চাইলেন, তখন উল্টো তাকেই পুলিশ আটক করে। ঘটনাটি এখন বন্দরনগরীজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। হামলার বিবরণ- ভুক্তভোগী দেলোয়ার হোসেন (৩৭), পিতা-মৃত আমিন শরীফ, মাতা-মৃত আনোয়ারা বেগম— চট্টগ্রাম শহরের বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন পাহাড়ীকা আবাসিক এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা। গত ১ নভেম্বর ২০২৫ ইং তারিখ রাত প্রায় ৯টার দিকে তিনি রৌফাবাদ পাহাড়িকা আবাসিক এলাকায় চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে একটি সচেতনতা মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সেই সময়, ১নং আসামী জসিম উদ্দিনের নেতৃত্বে সুলতান, সোহেল, সুমন (প্রকাশ মোবাইল চোর সুমন), বাবু (প্রকাশ ইয়াবা বাবু), ইদ্রিস (প্রকাশ হিরু), মহিউদ্দিনসহ ১০–১২ জন অস্ত্র-সস্ত্র নিয়ে অতর্কিতে তার ওপর হামলা চালায়। তারা লোহার রড, দা, কিরিচ, চাপাতি ও চায়না কুড়াল দিয়ে দেলোয়ার ও তার সঙ্গে থাকা কয়েকজনের ওপর এলোপাতারি হামলা চালায়। দেলোয়ারের দাবি, “আমি যখন মিছিলের সামনে ছিলাম, তখন ২নং ও ৪নং আসামী লোহার রড দিয়ে পিঠ ও কাঁধে আঘাত করে।

এরপর ৩নং আসামী ধারালো কিরিচ দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাত করে—যা আমার ডান পায়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে।” তিনি আরও জানান, হামলার একপর্যায়ে সন্ত্রাসীরা তার কাছ থেকে একটি স্মার্টফোন (One Plus, আনুমানিক মূল্য ৩০,০০০ টাকা) এবং নগদ ৩৫,০০০ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে যায়। হামলার পর স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি হন। পুলিশের আচরণে প্রশ্ন- চিকিৎসা গ্রহণের পর, ঘটনার সমস্ত বিবরণ, সাক্ষ্য ও চিকিৎসা পত্র সঙ্গে নিয়ে দেলোয়ার হোসেন পরদিন থানায় গিয়ে এজাহার দাখিল করতে গেলে থানার কর্মকর্তারা তার অভিযোগ গ্রহণ না করে উল্টো তাকেই গ্রেফতার করেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, “দেলোয়ার ভাই তো থানায় গিয়েছিলেন মামলা করতে, কিন্তু হঠাৎ শুনি তাকেই আটক করা হয়েছে। এটা অবিশ্বাস্য।”

স্থানীয় সূত্র জানায়, দেলোয়ারের বিরুদ্ধে বায়েজিদ থানাসহ চট্টগ্রামের অন্য কোনো থানায় কোনো মামলা নেই। তবুও, অজানা এক “রহস্যময় মামলার” আসামি দেখিয়ে পুলিশ তাকে আটক দেখায়। এ নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকে বলছেন, “যে ব্যক্তি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, তাকেই যদি আইনের আশ্রয় নিতে না দেওয়া হয়—তবে জনগণ কোথায় যাবে?” নাগরিক সমাজের প্রতিক্রিয়া- চট্টগ্রামের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, “আইনের চোখে সবাই সমান। একজন নিরপরাধ নাগরিকের এজাহার না নিয়ে বরং তাকে গ্রেফতার করা গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।”
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক একজন কাউন্সিলর নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এলাকায় কিছু প্রভাবশালী চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। যারা তাদের বিরুদ্ধে কথা বলে, তাদেরকেই ফাঁসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই ঘটনাটিও সেই কৌশলেরই অংশ।” পুলিশের অবস্থান– এ ব্যাপারে বায়েজিদ বোস্তামী থানার এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “বিষয়টি তদন্তাধীন। আমরা আইনের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছি।” তবে দেলোয়ারের বিরুদ্ধে মামলার প্রকৃতি বা গ্রেফতারের কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি তিনি। পটভূমি ও বিশ্লেষণ— রৌফাবাদ ও পাহাড়িকা আবাসিক এলাকার বাসিন্দারা জানান, সম্প্রতি এলাকায় চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও মাদক ব্যবসা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। দেলোয়ার এসব অপরাধের বিরুদ্ধে সরব হয়ে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় একটি নাগরিক মিছিলের উদ্যোগ নেন। অনেকেই মনে করছেন, এই প্রতিবাদের কারণেই তার ওপর হামলা ও পরবর্তীতে গ্রেফতার—উভয় ঘটনাই একটি পরিকল্পিত প্রতিশোধ। চট্টল চিত্রের মতামত– ন্যায়বিচারের আশায় থানার দ্বারে গিয়ে বাদী যদি নিজেই অভিযুক্ত হয়ে গ্রেফতার হন— তবে এটি শুধু এক ব্যক্তির দুঃখজনক গল্প নয়, বরং আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার নৈতিক ও মানবিক দেউলিয়ার প্রতিচ্ছবি। চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ আজ একটাই প্রশ্ন করছে — “সত্য বলার অপরাধে কি এখন গ্রেফতারই একমাত্র পুরস্কার?”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here