চট্টগ্রামের বিতর্কিত জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম : অনিয়ম, অভিযোগ ও বদলির অন্তরালের সত্য

By admin
6 Min Read

মো.কামাল উদ্দিনঃ
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন ও বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই নগরী শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র নয়, এটি সমগ্র দেশের অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন। আর সেই নগরের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ জেলা প্রশাসক (ডিসি)—যিনি সরকারের প্রতিনিধি হয়ে জনগণের অধিকার ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম দায়িত্ব পালনের সময় যা করেছেন, তা প্রশাসনের ভাবমূর্তি শুধু কলঙ্কিতই করেনি, বরং জনমনে গভীর ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি করেছে। সংবাদপত্রের রিপোর্ট, নাগরিক সমাজের অভিযোগ এবং বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়া বলছে—তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি সম্পত্তিকে ব্যক্তিগত সম্পদে রূপান্তরিত করেছেন।  চট্টগ্রামের ১২৮ বছরের প্রশাসনিক ইতিহাসে এই প্রথম একজন নারী জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নিলেও, একইসঙ্গে এত অল্প সময়ে এরচেয়ে ভয়াবহ অনিয়মের রেকর্ড আর কারও নেই।সরকারি খাস জমি বন্দোবস্তে ভয়াবহ অনিয়ম-দৈনিক যুগান্তরসহ একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চট্টগ্রাম নগরীর প্রাণকেন্দ্রে প্রায় ৫০ একর সরকারি খাস জমি স্থানীয় প্রভাবশালী ভূমিদস্যুদের হাতে তুলে দেন ফরিদা খানম। আইন অনুযায়ী এসব জমি ইজারা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে নানা কৌশলে দখলদারদের পক্ষে সিদ্ধান্ত দেন। এতে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারায়। শুধু তাই নয়, ২০০০ সালে ভূমি অফিসের তদন্ত রিপোর্টে যে জমিগুলো পুনরুদ্ধারের সুপারিশ করা হয়েছিল, সেগুলোও পরবর্তীতে চট্টগ্রামের হিলভিউ আবাসিক এলাকায় ৩০০-রও বেশি বহুতল ভবন নির্মাণে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ, সরকারি খাস জমি ব্যক্তিগত মালিকানায় নথিভুক্ত করে একটি দস্যুচক্রের পকেট ভারী করা হয়। বালুমহাল ও ইটভাটায় কোটি টাকার অনিয়ম-চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বালুমহাল ও ইটভাটা ইজারার ক্ষেত্রে ভয়াবহ অনিয়ম হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী নিলামের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব আয় হওয়ার কথা থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, ফরিদা খানম সরাসরি টাকা গ্রহণ করে প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে সুবিধা দিয়েছেন। কোটি কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না হয়ে বেসরকারি পকেটে প্রবাহিত হয়েছে। চিড়িয়াখানার তহবিল আত্মসাৎ-চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার তহবিল কেবল পশুপাখির রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন কাজে ব্যবহার হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, এই অর্থ ব্যয় করা হয়েছে—প্রশাসন ক্যাডারদের পিকনিক, পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান, বিজ্ঞাপন প্রকাশ, এমনকি ডিসি পার্কের রং করার কাজেও। ফলশ্রুতিতে চিড়িয়াখানার উন্নয়ন থমকে যায়, জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং নগরবাসীর ক্ষোভ বাড়ে।পরীর পাহাড় কেলেঙ্কারি-এক বছর আগে জেলা প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযানে পরীর পাহাড় দখলমুক্ত করা হয়েছিল। জনগণ ভেবেছিল এটি হবে একটি ঐতিহাসিক অর্জন। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই অভিযোগ ওঠে, প্রায় ২৩ শতক জমি গোপনে দুটি প্রভাবশালী পক্ষকে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, এটি ছিল “সরকারি উচ্ছেদ নাটক”—যেখানে শেষ পর্যন্ত জনগণের সম্পদ আবারও গোষ্ঠীস্বার্থে ভাগ করে দেওয়া হলো। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব দখলের অভিযোগ-চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও ফরিদা খানমের নাম জড়িয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, প্রেসক্লাবের অভ্যন্তরীণ দখল ও প্রভাব বিস্তারে তিনি ভূমিকা রেখেছেন। সাংবাদিক সমাজ যেটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ফলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক চর্চা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সংবাদপত্রে প্রতিফলন-দৈনিক যুগান্তর শিরোনাম দেয়— “চট্টগ্রামের বিতর্কিত ডিসি ফরিদাকে বদলি”— যেখানে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয় সরকারি জমি দখল, চিড়িয়াখানার অর্থ আত্মসাৎ ও অন্যান্য অনিয়মের কথা।আজকের পত্রিকা (Ajker Patrika) জানায়, জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম নিজ ক্ষমতার বাইরে গিয়ে সরকারি খাস জমি বন্দোবস্ত দিয়েছেন। এতে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ভঙ্গ হয়েছে এবং সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদেশিদের কাছে জমি বিক্রির অভিযোগ- স্বাধীনতার পর থেকে কোনো সরকার আনোয়ারার কেইপিজেড এলাকায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে জমি রেজিস্ট্রি দেয়নি। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ফরিদা খানম ভূমিদস্যুদের সঙ্গে যোগসাজশ করে বিদেশিদের কাছে দেশের ভূখণ্ড বিক্রির ব্যবস্থা করেছেন। সচেতন মহল বলছে—এটি শুধু অনিয়ম নয়, বরং জাতীয় স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড।সহযোগীদের ভূমিকা-শুধু একজন জেলা প্রশাসক নন, এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন প্রশাসনের আরও অনেকে। জেলা নাজির জামাল উদ্দিন,বিভিন্ন এসি ল্যান্ড,,কিছু টিএনও, এদের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া সরকারি সম্পত্তি এভাবে বেহাত করা সম্ভব হতো না। তাই ফরিদা খানমকে বদলি করলেই দায় শেষ হয় না—বরং তাঁর সহযোগী চক্রকেও আইনের আওতায় আনা জরুরি। জনমতের প্রতিক্রিয়া-চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ ও নাগরিক সমাজের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার ঝড় বইছে—জনগণের সম্পদ জনগণের জন্য নয়, বরং প্রভাবশালীদের জন্য ব্যবহার হচ্ছে,জেলা প্রশাসকের পদ মর্যাদার আড়ালে চলছে দুর্নীতি ও লুটপাট,সরকারের দুর্নীতি বিরোধী বক্তব্য বাস্তবে প্রশ্নবিদ্ধ। অনেকেই বলেছেন, শুধু বদলি নয়, বরং নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতের কোনো প্রশাসকও একইভাবে সরকারি সম্পদকে ব্যক্তিগত সম্পদে রূপান্তর করার সাহস পাবে। বদলি ও দায়মুক্তির প্রশ্ন-অবশেষে ফরিদা খানমকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু জনমনে প্রশ্ন রয়ে গেছে—বদলি করলেই কি দায়মুক্তি পাওয়া যায়? হাজার কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি লুটপাটের দায়ভার কে নেবে? প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থাকা এই কর্মকর্তারা কি সত্যিই জবাবদিহির মুখোমুখি হবেন? চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কেন্দ্র। এখানে অনিয়ম মানে শুধু একটি শহরের ক্ষতি নয়, বরং পুরো দেশের অর্থনীতির ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যাওয়া। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সরকারকে এখনই স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে— দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার,জনগণের সম্পদ আত্মসাৎ, কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। বদলি কোনো সমাধান নয়; প্রয়োজন সুষ্ঠু তদন্ত, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। চট্টগ্রামের মানুষ আজ একটি উত্তর চায়—সরকারি সম্পদ রক্ষার দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তা যদি নিজেই লুটের অংশীদার হয়ে যান, তবে ন্যায়বিচার কোথায়? আর কতদিন প্রশাসনের নামে নাটক চলবে?

Share This Article
Leave a Comment